চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

সর্বশেষ:

স্প ট লা ই ট

নিরাপত্তার নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা যাবে না

সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন

আবসার মাহফুজ

১৩ অক্টোবর, ২০২৬ | ২:৩০ অপরাহ্ণ

সাইবার অপরাধের বিস্তার যে বাস্তব এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি কার্যকর আইন যে প্রয়োজন, তা নিয়ে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই। প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার, স্মার্টফোনের সর্বব্যাপী ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে মানুষের জীবন এখন ক্রমেই ডিজিটাল পরিসরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। ব্যাংকিং, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম, ব্যক্তিগত যোগাযোগ— সবকিছুতেই ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
 
একইসঙ্গে বাড়ছে পরিচয় চুরি, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, অনলাইন প্রতারণা, সাইবারহয়রানি, ব্ল্যাকমেল, যৌনহয়রানি, শিশুদের অনলাইন শোষণ, ভুয়াপরিচয়ে প্রতারণা, মিথ্যাতথ্যের বিস্তার এবং কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের মতো অপরাধ। বিশেষ করে এআই প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে ভুয়াছবি, ভিডিও, অডিও ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি করে মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন বিপন্ন করার ঝুঁকি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফলে একটি আধুনিক, সময়োপযোগী ও কার্যকর সাইবার আইন নিঃসন্দেহে প্রয়োজন। কিন্তু অপরাধ দমনের নামে এমন কোনো আইন করা যাবে না, যা নাগরিকের স্বাভাবিক মতপ্রকাশ, সমালোচনা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কিংবা ভিন্নমতকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করে। কারণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে স্বাধীনতা সংকুচিত করা হলে সরকার হয়তো সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, কিন্তু জনগণের আস্থা হারাবে।
 
 
প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ নিয়ে গণমাধ্যম, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের মূল জায়গাটি এখানেই। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সচিবালয়ে গণমাধ্যমের অংশীজনদের সঙ্গে সরকারের দ্বিতীয় দফা পরামর্শ সভায় এসব উদ্বেগ আরও স্পষ্ট হয়েছে। সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতারা সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় আইনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে আইন ব্যবহারের সম্ভাবনা, মোবাইল কোর্টের বিধান, কিছু অপরাধের অস্পষ্ট সংজ্ঞা, কনটেন্ট অপসারণের ক্ষমতা এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিচারিক সুরক্ষার প্রশ্ন তুলেছেন। এসব উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিক, সম্পাদক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পর্যালোচনা কমিটি গঠন এবং ১৫ দিনের মধ্যে সুপারিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। খসড়াটি পুনরায় ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়ার ঘোষণাও স্বাগত জানানোর মতো। কারণ সাইবার অপরাধের পরিবর্তনশীল চরিত্র, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার— এই তিনটি বিষয় সমন্বিতভাবে বিবেচনা করেই আইন তৈরি করতে হবে।
 
 
সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেছেন, গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে আইনটি করা হয়নি এবং কোনো সাংবাদিক যেন এর অপব্যবহারের শিকার না হন, সরকার সেটিই চায়। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ বা গ্রেপ্তারের আগে আদালতের অনুমতির প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য এবং আপিল নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা রাখার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। সরকারের এই বক্তব্য ইতিবাচক হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার কোনো সরকারের ব্যক্তিগত সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না। আজকের সরকার সাংবাদিকদের হয়রানি করতে চাইবে না— এমন নিশ্চয়তা থাকলেও আগামী দিনের সরকার একই আইন কীভাবে প্রয়োগ করবে, তা কেউ জানে না। তাই আইনের মধ্যেই এমন সুরক্ষা থাকতে হবে, যাতে ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা দলের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নির্ভরশীল না হয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বড় সতর্কবার্তা। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পরবর্তী সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে যে দীর্ঘ বিতর্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল অস্পষ্ট ও বিস্তৃত কিছু বিধান এবং সেগুলোর প্রয়োগের বাস্তবতা।
 
 
ড. আলী রীয়াজের গবেষণায় ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর থেকে ২০২৩ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১ হাজার ৪৩৬টি মামলার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল, যেখানে ৪ হাজার ৫২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা ছিল। সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও শিক্ষার্থীদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলার শিকার হওয়ার কথাও গবেষণায় উঠে এসেছে। সরকারি হিসাবেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় ৭ হাজারের বেশি মামলা হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। লেখক মুশতাক আহমদের কারাগারে মৃত্যুর ঘটনাও আইনটির প্রয়োগ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছিল। অতীতের এই অভিজ্ঞতা স্মরণ করার উদ্দেশ্য পুরোনো রাজনৈতিক বিতর্ক পুনরুজ্জীবিত করা নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়া। একটি আইন কে তৈরি করেছে বা কোন সরকার তা প্রণয়ন করেছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আইনটি ভবিষ্যতে কার হাতে কী ক্ষমতা তুলে দেবে। সরকার পরিবর্তিত হয়, রাজনৈতিক পরিবেশ পরিবর্তিত হয়; কিন্তু আইনে দেওয়া ক্ষমতা থেকে যায়। অতএব, নতুন আইনের ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করা হবে বড় ভুল।
 
 
প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি হলো এর ভাষা ও সংজ্ঞা। ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘ভুল তথ্য’, ‘মানহানি’, ‘অপমান’, ‘হেয়প্রতিপন্ন’ কিংবা ‘বুলিং’— এসব শব্দ সাধারণ ব্যবহারে পরিচিত হলেও ফৌজদারি আইনে ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিটি শব্দের সুনির্দিষ্ট, সীমারেখাযুক্ত ও বিচারযোগ্য সংজ্ঞা থাকা জরুরি। একটি সংবাদ ভুল প্রমাণিত হতে পারে, একটি মতামত বিতর্কিত হতে পারে, একটি ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য কারও কাছে অস্বস্তিকর হতে পারে, আবার কোনো বক্তব্য ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে অপমান বা ক্ষতি করার উদ্দেশ্যেও দেওয়া হতে পারে। কিন্তু ভুল, বিতর্কিত, অস্বস্তিকর এবং অপরাধ— এই চারটি বিষয় এক নয়। আইন যদি এই পার্থক্যগুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ না করে, তাহলে প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে অভিযোগকারী পর্যন্ত সবাই নিজস্ব ব্যাখ্যার সুযোগ পেয়ে যেতে পারেন। এর ফল হতে পারে হয়রানিমূলক মামলা, অযথা তদন্ত, গ্রেপ্তার এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া। পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে যদি কারও জীবন, নিরাপত্তা, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা কিংবা জননিরাপত্তা বিপন্ন করা হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনি ব্যবস্থা থাকা উচিত। কিন্তু একটি তথ্য ভুল হওয়ার সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর পার্থক্য রয়েছে; মতামতের সঙ্গে তথ্যের পার্থক্য রয়েছে; সমালোচনার সঙ্গে হুমকির পার্থক্য রয়েছে; ব্যঙ্গের সঙ্গে হয়রানির পার্থক্য রয়েছে। তাই অপরাধের উপাদান, উদ্দেশ্য, ক্ষতির মাত্রা এবং প্রমাণের মানদণ্ড স্পষ্ট করা অপরিহার্য। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। আজ একটি পোস্ট মুহূর্তে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। সত্য তথ্যের পাশাপাশি গুজব, অপপ্রচার, প্রতারণা, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিভ্রান্তিকর তথ্যও দ্রুত ছড়ায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতার কারণে ভুয়া ভিডিও, কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা, অশ্লীল ছবি তৈরি কিংবা কোনো ব্যক্তির নামে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার করাও সহজ হয়েছে। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে আইন অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু অপরাধ দমনের নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকের প্রতিটি বক্তব্য পর্যবেক্ষণ বা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করা যাবে না।
 
 
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারকে, রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার অধিকার নাগরিকের না থাকলে জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু সমালোচনার জবাব মামলা বা গ্রেপ্তার দিয়ে দেওয়া হলে নাগরিকের মধ্যে ভয় তৈরি হয়। ভয় থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ থেকে নীরবতা এবং নীরবতা শেষপর্যন্ত গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে। গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি আরও গভীর। কারণ সংবাদমাধ্যম শুধু সংবাদ প্রকাশের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি সমাজের ও রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান। ক্ষমতাসীন সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং জনস্বার্থের তথ্য সামনে আনা গণমাধ্যমের দায়িত্ব। কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অসন্তুষ্ট হলেই যদি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার বা তাৎক্ষণিক শাস্তির আশঙ্কা তৈরি হয়, তাহলে সাংবাদিক স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করবেন। এভাবেই শুরু হয় ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’।
 
 
২৮ সেপ্টেম্বরের পরামর্শ সভায় মোবাইল কোর্টের বিধান নিয়ে সাংবাদিকদের আপত্তির গুরুত্ব এখানেই। কোনো প্রতিবেদক প্রতিবেদন প্রকাশের পর নির্বাহী ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক শাস্তির মুখোমুখি হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের আগে আদালতের অনুমতির প্রস্তাব তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। এটি সাংবাদিকদের আইনের ঊর্ধ্বে রাখার দাবি নয়; বরং সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের সামাজিক ও গণতান্ত্রিক গুরুত্ব বিবেচনায় একটি প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা। একইসঙ্গে অনলাইন সংবাদমাধ্যম, আঞ্চলিক সংবাদপত্র, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, নাগরিক সাংবাদিক ও স্বাধীন গবেষকদেরও সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। সুরক্ষা ও জবাবদিহিতা— দুটিকেই পাশাপাশি রাখতে হবে। আরেকটি বড় বিষয় হলো নির্বাহী বিভাগের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাবনা। কোনো কনটেন্ট অপসারণ, ডিভাইস তল্লাশি, তথ্য জব্দ, গ্রেপ্তার কিংবা তাৎক্ষণিক শাস্তির মতো ক্ষমতা পর্যাপ্ত বিচারিক তদারকি ছাড়া প্রয়োগ করা হলে নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাধীনতার ওপর বড় প্রভাব পড়তে পারে। আবার ‘সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি’ কে? এই প্রশ্নেরও পরিষ্কার উত্তর থাকা প্রয়োজন। অস্পষ্ট সংজ্ঞা থাকলে যে কেউ নিজেকে সংক্ষুব্ধ দাবি করে মামলা করার সুযোগ পেতে পারেন। তাই ব্যক্তিগত বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার কারণে সাইবার আইনকে হয়রানির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। আপিল নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, দ্রুত ও ন্যায়সংগত বিচার, কার্যকর জামিন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি।
 
 
সরকার যে সাংবাদিক, সম্পাদক ও সাইবার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পর্যালোচনা কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলে চলবে না। সংবাদমাধ্যমের বাস্তব অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, আইন, মানবাধিকার, ডিজিটাল ফরেনসিকস এবং নাগরিক গোপনীয়তার বিশেষজ্ঞ মতামতও প্রয়োজন। জাতীয় সংসদেও প্রতিটি বিতর্কিত ধারা নিয়ে অর্থবহ আলোচনা ও যুক্তি-তর্ক প্রয়োজন। 
 
 
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, একটি আধুনিক সাইবার আইন এমন হওয়া দরকার, যাতে অপরাধী নিরাপদ না থাকে এবং নিরপরাধ নাগরিকও আতঙ্কে না থাকে; ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত থাকে, আবার জনস্বার্থের তথ্য গোপন করার হাতিয়ার তৈরি না হয়; অনলাইন হয়রানি ও প্রতারণা দমন হয়, আবার সমালোচনামূলক বক্তব্য অপরাধে পরিণত না হয়; সাংবাদিকতার স্বাধীনতা বজায় থাকে, আবার সাংবাদিকতার আড়ালে ইচ্ছাকৃত অপরাধের দায় এড়ানোর সুযোগও না থাকে। প্রযুক্তি বদলাবে, অপরাধের ধরন বদলাবে, নতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আরও শক্তিশালী হবে এবং সরকারও পরিবর্তিত হবে। আজ যে আইন তৈরি হবে, আগামী দিনের ভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতায় সেটিই প্রয়োগ করা হবে। তাই প্রতিটি অপরাধের সংজ্ঞা হতে হবে স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য; সমালোচনা, মতামত, ব্যঙ্গ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশকে অপরাধমূলক বক্তব্য থেকে আলাদা করতে হবে; কনটেন্ট অপসারণ, ডিভাইস তল্লাশি, তথ্য জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে; গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কার্যকর প্রতিকারব্যবস্থা রাখতে হবে; সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে আদালতের পূর্বানুমতির মতো প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের এখতিয়ার পুনর্বিবেচনা করতে হবে। নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ও সাংবাদিকের গোপনীয় সূত্র সুরক্ষায় বিশেষ বিধান থাকা প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় কথা, আইনটি যেন ভয় সৃষ্টি না করে, আস্থা তৈরি করে।
 
 
আমরাও বলছি, সাইবার অপরাধীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে। কিন্তু সেই কঠোরতা যেন সমালোচক, সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষার্থী কিংবা সাধারণ নাগরিকের কণ্ঠের ওপর গিয়ে না পড়ে। নতুন সাইবার সুরক্ষা আইন হতে হবে নাগরিকের জন্য সুরক্ষার ঢাল, মতপ্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার নয়। আইনটি এমন হওয়া দরকার, যার দিকে তাকিয়ে নাগরিকসাধারণ বলতে পারেন— এই আইন আমাকে অপরাধীর হাত থেকে রক্ষা করবে, কিন্তু আমার কণ্ঠ রুদ্ধ করবে না।
 
 
পূর্বকোণ/পল্লবী

শেয়ার করুন