‘হেপাটাইটিস’ শব্দটি শুনলেই অধিকাংশ মানুষের মনে প্রথমেই আসে জন্ডিস। আবার অনেকেই মনে করেন, জন্ডিস নিজেই একটি রোগ এবং সেটিই হেপাটাইটিস। বাস্তবে এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। জন্ডিস কোনো রোগের নাম নয়; এটি একটি উপসর্গ, যা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। হেপাটাইটিস তার একটি কারণ হলেও একমাত্র কারণ নয়। তাই হেপাটাইটিস সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হেপাটাইটিস বলতে মূলত লিভারের প্রদাহকে বোঝায়। এটি সাধারণত ভাইরাসের সংক্রমণে হলেও কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, অটোইমিউন রোগ কিংবা অন্যান্য কারণেও লিভারে প্রদাহ হতে পারে। ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিসের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো হেপাটাইটিস এ, বি, সি এবং ই। তবে এই চার ধরনের হেপাটাইটিসের সংক্রমণের পথ, জটিলতা এবং চিকিৎসা একে অপরের থেকে ভিন্ন।
হেপাটাইটিস এ এবং ই সাধারণত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব সংক্রমণ সাময়িক হয় এবং রোগীরা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে হেপাটাইটিস বি এবং সি সংক্রমিত রক্ত, দূষিত সূঁচ, অনিরাপদ চিকিৎসা সরঞ্জাম অথবা অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। এই দুই ধরনের সংক্রমণ দীর্ঘদিন শরীরে থেকে গেলে লিভার সিরোসিস, লিভার বিকল হয়ে যাওয়া এবং লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।
অনেকেই মনে করেন, জন্ডিস না হলে হেপাটাইটিসও নেই। এটিও একটি ভুল ধারণা। হেপাটাইটিস বি ও সি-তে আক্রান্ত অনেক মানুষের শরীরে বছরের পর বছর কোনো উপসর্গই দেখা যায় না। অথচ এই সময়ের মধ্যেই লিভারের ক্ষতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। আবার জন্ডিস হলেও সেটি সব সময় হেপাটাইটিসের কারণে হয় না। পিত্তনালিতে পাথর, লিভারের অন্যান্য রোগ, এমনকি কিছু রক্তের রোগের কারণেও জন্ডিস হতে পারে। তাই শুধুমাত্র উপসর্গ দেখে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
জন্ডিস দেখা দিলে অনেকেই ঘরোয়া চিকিৎসা, ভেষজ ওষুধ বা খাদ্যনিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ জন্ডিসের প্রকৃত কারণ নির্ণয় না করে চিকিৎসা শুরু করলে রোগ আরও জটিল হয়ে যেতে পারে। বর্তমানে একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই সহজে জানা যায় রোগী কোন ধরনের হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং তার জন্য কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন।
হেপাটাইটিস প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। হেপাটাইটিস এ ও বি-এর বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা রয়েছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে হেপাটাইটিস সি বর্তমানে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। আধুনিক ওষুধের মাধ্যমে সাধারণত তিন মাসের চিকিৎসাতেই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তাই সময়মতো রোগ শনাক্ত করা গেলে সফল চিকিৎসার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
হেপাটাইটিস প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতারও বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশুদ্ধ পানি পান করা, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া, রক্ত নেওয়ার আগে তা স্ক্রিনিং করা, জীবাণুমুক্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করা, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণের মাধ্যমে এই রোগের বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি অ্যান্ড হেপাটোলজি বিভাগে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা ব্যবস্থার সমন্বয়ে লিভার, হেপাটাইটিস, পাকস্থলী, অন্ত্র, পিত্তথলি ও অগ্ন্যাশয়ের বিভিন্ন রোগের বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হয়। বিভিন্ন আধুনিক এন্ডোস্কোপিক সেবার মাধ্যমে দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি প্রতিটি রোগীর জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি ফলো-আপ নিশ্চিত করা হয়, যাতে রোগীরা সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে দ্রুত ফিরে যেতে পারেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে নির্মূল করা। এই লক্ষ্য অর্জনে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হেপাটাইটিস সম্পর্কে ভুল ধারণা, চিকিৎসায় দেরি এবং অজ্ঞতাই অনেক সময় রোগকে জটিল করে তোলে।
তাই মনে রাখতে হবে হেপাটাইটিস মানেই জন্ডিস নয়, আবার জন্ডিস মানেই হেপাটাইটিসও নয়। জন্ডিসকে কখনোই সাধারণ সমস্যা ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়। সঠিক সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সঠিক রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসাই পারে লিভারকে সুস্থ রাখতে এবং গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধ করতে।
পূর্বকোণ/নুসরাত















