চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

শুধু ভবন নয়, দরকার একটি জাতীয় স্বাস্থ্য-অবকাঠামো সংস্কার

উপজেলা হাসপাতাল ১০১ বেডে উন্নীতকরণ

শুধু ভবন নয়, দরকার একটি জাতীয় স্বাস্থ্য-অবকাঠামো সংস্কার

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

১০ জুলাই, ২০২৬ | ১২:৫৪ অপরাহ্ণ

সরকার যদি দেশের উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১০১ বেডে উন্নীত করার পরিকল্পনা করে থাকে, তাহলে এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। কিন্তু এই সুযোগটি যেন কেবল বেড সংখ্যা বাড়ানো, পুরোনো ভবনের সঙ্গে নতুন ব্লক জোড়া লাগানো, অথবা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের গতানুগতিক ‘কুকি-কাটার’ ডিজাইনের হাসপাতাল নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থাকে।

বাংলাদেশে প্রায় ৪৯২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আছে। বাস্তবতা হলো, এদের অনেকগুলোর ভবন, রোগী চলাচলের ব্যবস্থা, জরুরি বিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, ডায়াগনস্টিক এলাকা, পানি-নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, অক্সিজেন সাপ্লাই, রোগীর অপেক্ষার জায়গা এবং চিকিৎসক-নার্সদের কাজের পরিবেশ সবকিছুই আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাই ১০১ বেডে উন্নীতকরণকে শুধু নির্মাণ প্রকল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটিকে দেখতে হবে একটি জাতীয় স্বাস্থ্য-অবকাঠামো পুনর্গঠন প্রকল্প হিসেবে।

এই কাজে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, স্থপতি, চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতাল ব্যবস্থাপক, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা দরকার। প্রতিটি উপজেলার জন্য আলাদা আলাদা অনিয়ন্ত্রিত ডিজাইন না করে একটি জাতীয় মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা উচিত। তবে সেই ডিজাইন যেন অন্ধভাবে একই রকম না হয়; বরং অঞ্চলভেদে জলবায়ু, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, পাহাড়ি এলাকা, নদীভাঙন, জনসংখ্যার চাপ এবং রোগীর প্রবাহ অনুযায়ী অভিযোজিত করা যায়।

এই ক্ষেত্রে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে নির্মিত Friendship Hospital একটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল হতে পারে। স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী/টজইঅঘঅ-এর নকশায় নির্মিত এই হাসপাতালটি ২০২১ সালের RIBA International Prize অর্জন করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে ‘Design excellence and social impact’ বিবেচনায় দেওয়া হয়। ArchDaily-এর বিবরণ অনুযায়ী হাসপাতালটি ২০১৮ সালে সম্পন্ন হয় এবং ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত একটি গ্রামীণ এলাকায় ৮০ বেডের হাসপাতাল হিসেবে নির্মিত হয়। এই হাসপাতালের নকশায় স্থানীয় ইট, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, জলাধার, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা, খোলা আঙিনা এবং মানবিক রোগী-পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। Architectural Digest-এর বিবরণ অনুযায়ী, হাসপাতালের মধ্য দিয়ে যাওয়া জলপথ শুধু নান্দনিক নয়; এটি বৃষ্টির পানি সংগ্রহ, সেচ এবং প্রাকৃতিক শীতলীকরণেও ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশের উপজেলা হাসপাতালগুলো যদি Friendship Hospital -এর আদলে পুনর্বিন্যাস করা যায়, তাহলে সেটি কেবল স্থাপত্যগত সৌন্দর্যের বিষয় হবে না; এটি স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান, রোগীর মর্যাদা, কর্মপরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় সাশ্রয়ের বিষয় হবে। আমাদের দরকার এমন হাসপাতাল যেখানে রোগী এসে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বে না; বরং আলো-বাতাস, পরিষ্কার পরিবেশ, সুশৃঙ্খল রোগী প্রবাহ এবং সহজলভ্য সেবার মাধ্যমে দ্রুত ও মানবিক চিকিৎসা পাবে।

একটি আধুনিক ১০১ বেডের উপজেলা হাসপাতালের ন্যূনতম বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত- ১. প্রশস্ত ও কার্যকর জরুরি বিভাগ, যেখানে ট্রায়াজ, রিসাসিটেশন, পর্যবেক্ষণ বেড এবং জরুরি প্রসূতি সেবা থাকবে। ২. আলাদা বহির্বিভাগ, যাতে মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি-অবস, শিশু, ডেন্টাল, চক্ষু, মানসিক স্বাস্থ্য এবং নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ ক্লিনিক চালানো যায়। ৩. নিরাপদ অপারেশন থিয়েটার, সিজারিয়ান সেকশন সুবিধা, স্টেরিলাইজেশন ইউনিট এবং পোস্ট-অপারেটিভ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। ৪. মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের জন্য আলাদা, সম্মানজনক ও নিরাপদ ব্যবস্থা। ৫. ল্যাবরেটরি, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ঊঈএ এবং ডিজিটাল রিপোর্টিং সুবিধা। ৬. কেন্দ্রীয় অক্সিজেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, সোলার ব্যাকআপ এবং জরুরি জেনারেটর ব্যবস্থা। ৭. পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ইনফেকশন কন্ট্রোলের আধুনিক ব্যবস্থা। ৮. রোগী, স্বজন, চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের জন্য আলাদা চলাচলের পথ এবং যথাযথ অপেক্ষার জায়গা। ৯. নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সহজগম্য নকশা। ১০. জলবায়ু সহনশীল স্থাপত্য বন্যা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার বিষয় বিবেচনায় রেখে।

এই প্রকল্পে স্থপতি কাশেফ চৌধুরীকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে সেটি অত্যন্ত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হবে। তিনি বাংলাদেশের মাটি, জলবায়ু, উপকরণ, গ্রামীণ বাস্তবতা এবং মানবিক স্থাপত্যÑসবকিছু মিলিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে অথবা পরামর্শে একটি জাতীয় ‘উপজেলা হাসপাতাল ডিজাইন গাইডলাইন’ তৈরি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে তরুণ বাংলাদেশি স্থপতি, প্রকৌশলী ও হাসপাতাল পরিকল্পনাবিদদের যুক্ত করে একটি জাতীয় ডিজাইন প্রতিযোগিতা বা বিশেষজ্ঞ প্যানেলও করা যেতে পারে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তরের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা দরকার, কারণ পানি, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্য হাসপাতালের মূল ভিত্তি। হাসপাতাল শুধু ভবন নয়; হাসপাতাল হলো পানি, বাতাস, আলো, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, রোগী চলাচল, বর্জ্য নিষ্কাশন এবং মানবিক ব্যবস্থাপনার সমন্বিত ব্যবস্থা। এই বিষয়গুলো উপেক্ষা করলে ১০১ বেডের হাসপাতালও অল্পদিনের মধ্যে অকার্যকর, অপরিচ্ছন্ন এবং রোগীর জন্য দুর্ভোগের জায়গায় পরিণত হবে।

সরকারের উচিত প্রথমে ১০–১৫টি উপজেলা হাসপাতালকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে বেছে নেওয়া। ভৌগোলিক বৈচিত্র্য অনুযায়ী উপকূলীয় এলাকা, হাওর এলাকা, পাহাড়ি এলাকা, উত্তরবঙ্গ, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা এবং ঘনবসতিপূর্ণ উপজেলা প্রতিটি অঞ্চলের জন্য অভিযোজিত মডেল তৈরি করা যেতে পারে। পাইলট প্রকল্পের ফলাফল মূল্যায়ন করে পরে জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়ন করা উচিত।

এই প্রকল্পে সবচেয়ে বড় ভুল হবে শুধু ‘আরও বেড’ যোগ করা। বেড বাড়ালেই স্বাস্থ্যসেবা বাড়ে না। প্রয়োজন দক্ষ জনবল, সঠিক অবকাঠামো, রোগী-কেন্দ্রিক নকশা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা। ভবন তৈরি করা সহজ; কিন্তু কার্যকর হাসপাতাল তৈরি করা কঠিন। তাই নির্মাণের আগে হাসপাতালের কার্যপ্রবাহ, রোগীর পথচলা, জরুরি সেবা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসক-নার্সদের কাজের পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ-সবকিছু পরিকল্পনায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশের উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১০১ বেডে উন্নীত করা একটি যুগান্তকারী কাজ হতে পারে যদি এটি গতানুগতিক প্রকৌশল প্রকল্প না হয়ে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার প্রকল্পে পরিণত হয়। সাতক্ষীরার Friendship Hospital প্রমাণ করেছে যে সীমিত সম্পদ দিয়েও বিশ্বমানের, পরিবেশবান্ধব, মানবিক এবং কার্যকর হাসপাতাল তৈরি করা সম্ভব। এখন দরকার সেই দর্শনকে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োগ করা। সরকার যদি এই উদ্যোগ সঠিকভাবে নেয়, তাহলে এটি শুধু হাসপাতাল নির্মাণ নয়; এটি হবে বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার নতুন ভিত্তি নির্মাণ।

 

লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রুান্সউইক। এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট