রাত তখন প্রায় ১টা। নগরীর একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে রক্ত প্রয়োজন। রোগীর স্বজনরা পরিচিতজনদের ফোন করেও যখন রক্তদাতা খুঁজে পাচ্ছিলেন না, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রক্ত চেয়ে পোস্ট দেন একজন স্বেচ্ছাসেবী। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পোস্টটি ছড়িয়ে পড়ে। রাত শেষ হওয়ার আগেই মিলে যায় রক্তদাতা। বেঁচে যায় একটি জীবন।
এমন ঘটনা চট্টগ্রামে নতুন নয়। প্রতিদিনই কোনো না কোনো হাসপাতালের বেডে চিকিৎসাধীন রোগীর জন্য রক্তের প্রয়োজন হয়। আর সেই প্রয়োজন মেটাতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন একদল স্বেচ্ছাসেবী, রক্তদাতা এবং সামাজিক সংগঠনের কর্মীরা। তাদের সিংহভাগই তরুণ। অনেকেই রোগীকে চেনেন না, জানেন না তার পরিচয়। তবু একটি ফোনকল, একটি ফেসবুক পোস্ট কিংবা একটি মানবিক আবেদনে নিঃশর্ত টানে ছুটে যান অচেনা মানুষের পাশে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে বিপুল পরিমাণ রক্তের চাহিদা পূরণে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছেন তরুণ স্বেচ্ছাসেবীরা। নিয়মিত রক্তদান, রক্তদাতা সংগ্রহ এবং রক্তদানে নিরলসভাবে সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে তারা গড়ে তুলেছেন মানবতার এক অনন্য বন্ধন।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি এ বৃহৎ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক থেকে প্রতি মাসে গড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করা হয়। সে হিসাবে বছরে প্রায় ৯০ হাজার ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। এই বিপুল চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা, শিক্ষার্থী এবং তরুণদের কাছ থেকে প্রাপ্ত রক্তে।
অন্যদিকে, সন্ধানী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির মাধ্যমে বছরে প্রায় ৫ হাজার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করা হয়। এর প্রায় ৯০ শতাংশই আসে স্বেচ্ছায় রক্তদানকারী দাতাদের কাছ থেকে। সংগঠনটির কর্মকর্তারা বলছেন, রক্তদাতাদের অধিকাংশই তরুণ ও যুবক, যারা মানবিক দায়বদ্ধতা থেকে নিয়মিত রক্তদান করেন।
সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘৪৫০ এমএল’-এর অ্যাডমিন মোহাম্মদ সালমান বলেন, অপরিচিত মানুষের বিপদে এগিয়ে আসতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে হয়। চেনা নেই, জানা নেই, তবুও একটি পোস্টে ছুটে যাই। পরে রক্তদানের মাধ্যমে সেই মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, যা অনেক সময় নিজের পরিবারের সদস্যের মতো মনে হয়। এখনো এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের কোনো এক সময় রক্তদান করেছি, তারা আজও আমাদের খোঁজখবর নেন। তিক্ত অভিজ্ঞতাও আছে, তবে সেগুলোর চেয়ে মানুষের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতাই অনেক বেশি।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ইফতি মাহমুদ বলেন, একজন স্বেচ্ছাসেবীর কাছে সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত হলো, যখন কোনো রোগীর স্বজন ফোন করে বলেন- রক্ত পেয়ে গেছি বা রোগী এখন ভালো আছেন। তখন মনে হয় আমাদের ছোট্ট চেষ্টা সার্থক হয়েছে। রক্তদাতা খুঁজে দেওয়া কিংবা মানুষকে রক্তদানে উৎসাহিত করার এই কাজ করতে গিয়ে আমরা অসংখ্য মানবিক গল্পের সাক্ষী হয়েছি। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই সুযোগই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়।
স্বেচ্ছাসেবীরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এখন রক্তদাতা খুঁজে পাওয়া আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। ফেসবুকের একটি পোস্ট কয়েক মিনিটের মধ্যে শত শত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অনেক সময় অচেনা কোনো ব্যক্তি পোস্ট দেখে রক্ত দিতে এগিয়ে আসেন। ফলে প্রয়োজনের মুহূর্তে দ্রত রক্ত সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন যে পরিমাণ রক্তের প্রয়োজন হয়, তার তুলনায় এখনও আরও বেশি মানুষকে স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, রক্তের কোনো কৃত্রিম বিকল্প নেই। একজন সুস্থ মানুষের কয়েক মিনিটের রক্তদানই অন্য একজন মানুষের জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালাতে পারে।
নিয়মিত রক্তদাতা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠক সূর্য দাস বলেন, অনেকেই ভাবেন, রক্ত দিলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। অথচ রক্তদান নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর। যারা একবার রক্ত দিয়েছেন, তারাই জানেন মানুষের প্রাণ বাঁচানোর সেই সুখানুভূতি। তবে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতাও আছে। অনেক সময় রাতে-বিরাতে মানুষের জরুরি ফোনে ছুটে যাওয়ার পর জানতে পারি রক্তের প্রয়োজন নেই। আবার কখনও রোগীর স্বজনরা ডোনারকে তেমন গুরুত্বও দেন না। অবশ্য সবাই এমন নন। কিছু মানুষের আচরণে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা স্বেচ্ছাসেবীরা হতাশ হন।
বিশ্ব রক্তদাতা দিবস আজ
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্ব রক্তদাতা দিবস আজ। ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতিবছর এ দিনে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ২০০৫ সাল থেকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাও প্রতি বছর ১৪ জুন এ দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়। মূলত নিরাপদ রক্ত নিশ্চিতকরণ ও স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের উৎসাহ করতেই বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘‘মানবতার এক ফোঁটা রক্ত দিন, জীবন বাঁচান’’। সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও নানা আয়োজনে দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে। সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে র্যালি, আলোচনা সভা ও রক্তদাতাদের নিয়ে নানা আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হয়েছে দিবসকে কেন্দ্র করে।
পূর্বকোণ/আদর



















