ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া, আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়ানো, শিশুদের একসাথে খেলাধুলা— সব মিলিয়ে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়। তবে এই সময়টিতে হাম সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। কারণ হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি কিংবা কথা বলার সময় বাতাসের মাধ্যমে সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে।
একজন আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এসে অনেক সংবেদনশীল শিশু আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে ঈদের সময় দীর্ঘ ভ্রমণ, ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশ, পারিবারিক জমায়েত এবং শিশুদের ঘনিষ্ঠ মেলামেশার কারণে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
যেসব শিশু বেশি ঝুঁকিতে
হামের ঝুঁকি বেশি থাকে—
যেসব শিশু এখনও হামের টিকা পায়নি
যাদের টিকা অসম্পূর্ণ
৬ মাসের কম বয়সী শিশু
অপুষ্টিতে ভোগা শিশু
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন শিশু
ঈদের পর আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ সাধারণত সংস্পর্শ বৃদ্ধির কয়েকদিন পর রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে।
যাত্রাপথ ও জমায়েতে অভিভাবকদের করণীয়
ঈদের ভ্রমণ ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে শিশুদের সুরক্ষায় অভিভাবকদের কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত—
ভ্রমণের আগে শিশুর টিকাদান অবস্থা যাচাই করা
সরকার ঘোষিত ক্যাম্পেইন বা নিয়মিত টিকার নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন করা
জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে র্যাশ আছে—এমন শিশুকে জমায়েত থেকে দূরে রাখা
অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা
অপ্রয়োজনীয় ভিড় ও বন্ধ ঘরে দীর্ঘ সময় অবস্থান কমানো
যাত্রাপথে হাত পরিষ্কার রাখা
শিশু অসুস্থ হলে ভ্রমণ পুনর্বিবেচনা করা
ছোট শিশুদের অসুস্থ শিশুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ খেলাধুলা সীমিত করা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টিকাদান। হাম প্রতিরোধে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা।
আক্রান্ত হলে কী করবেন
কোনো শিশুর জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া কিংবা পরে শরীরে র্যাশ দেখা দিলে হামের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে হবে। এ অবস্থায়—
শিশুকে যতটা সম্ভব আলাদা কক্ষে রাখা
অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশা সীমিত করা
জমায়েত, অনুষ্ঠান ও খেলাধুলা থেকে বিরত রাখা
পর্যাপ্ত তরল, পুষ্টিকর খাবার ও বিশ্রাম নিশ্চিত করা
দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
যেসব লক্ষণ দেখলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে
নিচের যেকোনো বিপদসংকেত দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে—
শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস
খেতে বা পান করতে না পারা
অতিরিক্ত ঝিমিয়ে যাওয়া বা অচেতনভাব
খিঁচুনি
বারবার বমি
তীব্র পানিশূন্যতা
চোখে জটিলতা বা দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যা
কানে ব্যথা বা কানের পুঁজ
দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র ডায়রিয়া
শিশু খুব দুর্বল হয়ে যাওয়া
মনে রাখতে হবে, হামকে শুধু “জ্বর আর র্যাশের রোগ” হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, চোখের জটিলতা এবং বিরল ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক জটিলতাও তৈরি করতে পারে।
তাই প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সময়মতো টিকাদানই শিশুদের সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
লেখক : ডা: মিশু তালুকদার
সহকারী অধ্যাপক, শিশু আইসিইউ, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল।
















