জীবনচিত্রের ক্যানভাসটা সাজানো ছিল জীবনযুদ্ধের গল্পে। ছোটবেলা থেকেই লড়াইটা শুরু করেছিলেন শারীরিক সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে। তবে সেই প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেই বিশ্বমঞ্চে নিজের নাম খোদাই করেছিলেন আমেরিকান অভিনেতা আরজে মিটি। কালজয়ী টিভি সিরিজ ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এ ‘ওয়াল্টার হোয়াইট জুনিয়র’ চরিত্রে অভিনয় করে আলোড়ন তোলা এই তারকা মাত্র ৩৪ বছর বয়সে মারা গেছেন।
সোমবার টেক্সাসের ব্রাউনসভিলে নিজের বাসভবনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন তিনি। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আত্মহত্যা করেছেন এই তরুণ অভিনতা। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিদায়ে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো বিনোদন জগতে।
অভিনেতা হওয়ার খুব একটা পরিকল্পনা মিটির ছিল না। ২০০৫ সালে ছোট বোনের অভিনয় ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে টেক্সাস থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে পাড়ি জমায় তাঁর পরিবার। সেখানেই ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের মেথামফেটামিন বা ‘মেথ’ মাদকের কুফল বিষয়ক একটি জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনের জন্য জীবনে প্রথমবার ক্যামেরা ফেস করেন তিনি।
ভাগ্যচক্রে সেই সচেতনতামূলক প্রচারের অভিজ্ঞতা থেকেই আসে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ। সম্প্রতি এক পডকাস্টে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মিটি নিজেই বলেছিলেন, “সেই অডিশনটার পরেই ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এর ডাক আসে। আমার কাছে পুরো সিরিজটাই আসলে সেই মাদকবিরোধী প্রচারেরই একটা বর্ধিত রূপ। কারণ ড্রাগের জালে জড়িয়ে কেউ কখনো দিনশেষে ভালো থাকতে পারে না।”
ছয় মাসের দীর্ঘ অডিশন ও অদম্য ইচ্ছা
‘ব্রেকিং ব্যাড’-এ সুযোগ পাওয়াটা মিটির জন্য সহজ ছিল না। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে তাঁকে একের পর এক অডিশন দিতে হয়েছিল। অডিশনের কাস্টিং ডিরেক্টর স্কি করতে গিয়ে পা ভেঙে ফেলার পর মিটিকে তাঁর ব্যবহৃত ক্রাচ বাড়িয়ে দিয়ে ব্যবহার করতে বলেছিলেন, কারণ বাস্তব জীবনে মিটির সেরেব্রাল পালসি থাকলেও হাঁটার জন্য কখনও ক্রাচ ব্যবহার করতে হয়নি। পর্দায় চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে সেই অভিজ্ঞতা ও কষ্টকে ধারণ করেন মিটি, যা পরবর্তীতে তাঁকে ২০১৪ সালে সম্মানজনক ‘স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড’ (SAG) পুরস্কার এনে দেয়।
পর্দার বাইরেও যিনি আসল নায়ক
২০০৮ থেকে ২০১৩- টানা পাঁচ সিজনজুড়ে ওয়াল্টার হোয়াইট চরিত্রে অভিনয় করা ব্রায়ান ক্র্যানস্টন ও অ্যারন পলের সঙ্গে পর্দায় এক অনন্য রসায়ন গড়ে তুলেছিলেন মিটি। তবে ক্যামেরার বাইরেও তাঁর পরিচয় ছিল বিশাল। তিনি শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না; শারীরিক প্রতিবন্ধীদের অধিকার আদায়ে আজীবন কাজ করে গেছেন। ‘ইউনাইটেড সেরেব্রাল পালসি’ ও ‘শ্রাইনার্স চিলড্রেনস’- এর শুভেচ্ছাদূত হওয়ার পাশাপাশি নিজের ‘দ্য মিটি ফাউন্ডেশন’ দিয়ে তিনি সমাজসেবামূলক অসংখ্য কাজ পরিচালনা করতেন।
পর্দার এই লড়াকু তরুণ ব্যক্তিগত জীবনেও নতুন এক অধ্যায় শুরুর অপেক্ষায় ছিলেন। দীর্ঘ ১০ বছরের পরিচিত বন্ধু ও পাঁচ বছরের প্রেমিকা কেনেডি সুয়ারেজের সঙ্গে বাগদান সেরেছিলেন তিনি। গত বছরই চ্যারিটি ইভেন্টে জীবনের নতুন ইনিংসে পা রাখার ঘোষণা দিলেও, বিয়ের পিঁড়িতে বসা আর হলো না তাঁর।
সহকর্মীদের চোখের জল
মিটির আকস্মিক বিদায়ে ভেঙে পড়েছেন ‘ব্রেকিং ব্যাড’-এর সহশিল্পীরা। সিরিজে বাবার ভূমিকায় অভিনয় করা ব্রায়ান ক্র্যানস্টন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। আর জেসি পিঙ্কম্যানখ্যাত অভিনেতা অ্যারন পল বলেন, “আরজে, আমার ভাই, আমি তোমাকে চিরকাল ভালোবেসে যাব। আমাদের হৃদয়ে তুমি যে খালি জায়গাটা রেখে গেলে, তা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।”
‘হান্নাহ মন্টানা’-তে অতিথি শিল্পী হিসেবে ছোট অভিনয় দিয়ে পথচলা শুরু করা মিটি ‘সুইচড অ্যাট বার্থ’, ‘ওয়েস্টহ্যাম্পটন’, ‘টাইম শেয়ার’ হয়ে চলতি বছরে মুক্তি পাওয়া ‘টকিং টু স্ট্রেঞ্জার্স’-এও তাঁর অভিনয়প্রতিভার ছাপ রেখেছেন।
এক সচেতনতামূলক মাদকবিরোধী অডিশন থেকে যার বিশ্বজয়ের গল্প শুরু হয়েছিল, সেই আলোকময় তরুণ এমন অসময়ে বিদায় নেবেন- তা হয়তো কেউই ভাবতে পারেনি। প্রতিবন্ধকতা জয় করা এই বীর ভক্তদের হৃদয়ে লড়াকু এক প্রেরণার নাম হয়েই বেঁচে থাকবেন।
পূর্বকোণ/রানা/পারভেজ


















