চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

শিক্ষাঙ্গনে আমরা কোন ভবিষ্যৎ তৈরি করছি?

প্রফেসর ডা. খন্দকার এ কে আজাদ

১৫ অক্টোবর, ২০২৬ | ৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, উপাচার্য পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এই ঘটনার পেছনে কার যুক্তি কতটা সঠিক, উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক কিংবা কার কী রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ভূমিকা রয়েছে,সেসবের বিচার করার মতো তথ্য আমার কাছে নেই। বিভিন্ন পক্ষ থেকে ভিন্ন বক্তব্যও এসেছে। তাই আমি কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের বিচার করতে চাই না। আমার উদ্বেগ আরও বড় জায়গায়,একটি দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মতপার্থক্য সমাধানের পদ্ধতি যদি এমন হয়ে ওঠে, তাহলে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী দৃষ্টান্ত তৈরি করছি?

 

উপাচার্য নিয়োগে শিক্ষার্থীর ভূমিকা: সীমারেখা কোথায়?
বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে শিক্ষার্থীদের মতামত বা প্রতিনিধিত্বের সুযোগ আছে, কিন্তু সরাসরি নিয়োগ বা অপসারণের ক্ষমতা সাধারণত নেই। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত স্বচ্ছ নীতিমালা, যোগ্যতার মানদণ্ড ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় হওয়া উচিত,শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে নয়।
প্রতিবাদ থাকবে, তবে সীমারেখাও থাকতে হবে
বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীন চিন্তা ও মতপ্রকাশের জায়গা। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করবে, প্রতিবাদ করবে; প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু দাবি আদায়ের জন্য সপ্তাহের পর সপ্তাহ শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখা প্রতিবাদের স্বাভাবিক রূপ হতে পারে না। একইভাবে প্রশাসনেরও দায় রয়েছে,সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আগেই কার্যকর সংলাপ ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা। দীর্ঘ অচলাবস্থায় শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা।

 

আজ চুয়েট, আগামীকাল কোথায়?
আমার সবচেয়ে বড় আশঙ্কা এখানেই। কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভিন্নতা থাকলে তা পরিবর্তনের চেষ্টা হওয়া উচিত গ্রহণযোগ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায়। জোর করে দাবি আদায়ের সংস্কৃতি বিপজ্জনক; কারণ একবার এটি দৃষ্টান্ত হয়ে গেলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়বে না,এই নিশ্চয়তা কে দেবে? এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত।

 

তাহলে কি লেখাপড়াই গৌণ হয়ে যাচ্ছে?
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল দায়িত্ব শিক্ষা ও গবেষণা। প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা ছাত্ররাজনীতি,সবারই দায়িত্ব সেই পরিবেশ রক্ষা করা। দিনের পর দিন ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকলে প্রশ্ন জাগে,বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রে এখনো কি শিক্ষা ও শিক্ষার্থী রয়েছে? একটি সেমিস্টার পিছিয়ে যাওয়া মানে শুধু সময় নষ্ট নয়। এর সঙ্গে জড়িত স্নাতক সম্পন্ন হতে বিলম্ব, উচ্চশিক্ষা ও চাকরির সুযোগে পিছিয়ে পড়া, পরিবারের আর্থিক চাপ এবং শিক্ষার্থীর দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার আশঙ্কার কথাও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।

 

কেন আমি এতটা উদ্বিগ্ন
আমি এই ঘটনাকে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থেকে দেখছি না। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি উদ্বিগ্ন,কারণ দেশের প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে রাষ্ট্রও দুর্বল হয়।
একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক হিসেবে আমি উদ্বিগ্ন,সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাই শিক্ষা অর্জনের জন্য, অনির্দিষ্ট অচলাবস্থা ও সংঘাতের মধ্যে তার ভবিষ্যৎ আটকে যাওয়ার জন্য নয়।
একজন শিক্ষক হিসেবে আমি উদ্বিগ্ন,কারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক থেকে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা হারিয়ে গেলে শিক্ষা কেবল পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে; মানুষ গড়ার মূল উদ্দেশ্যটিই হারিয়ে যাবে।
আর দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন,কারণ আজকের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতিই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের মূল্যবোধ ও আচরণে প্রতিফলিত হবে।

 

শিক্ষার স্বার্থে একটি জাতীয় ঐকমত্য জরুরি
আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা বা উপাচার্য নিয়োগ নিয়েও মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু দেশের বৃহত্তর স্বার্থে অন্তত একটি বিষয়ে আমাদের একমত হওয়া দরকার,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সচল, নিরাপদ এবং শিক্ষা ও গবেষণার উপযোগী রাখতে হবে। শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎকে কোনো রাজনৈতিক, প্রশাসনিক বা গোষ্ঠীগত বিরোধের মূল্য দিতে দেওয়া যাবে না।
আমাদের বাস্তবতায় এ জন্য রাজনৈতিক সমঝোতা ও একটি ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার সুস্পষ্ট মানদণ্ড থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা দরকার, যেখানে সংকট তৈরি হলে দ্রুত সংলাপ, মধ্যস্থতা ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ থাকবে। এই ঐকমত্য কোনো দল বা পক্ষের জন্য নয়,এটি শিক্ষা, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং বাংলাদেশের স্বার্থে।

 

আজকের ঘটনা যেন আগামী দিনের স্বাভাবিকতা না হয়
চুয়েটের বর্তমান সংকট একদিন মিটে যাবে। উপাচার্য থাকবেন অথবা চলে যাবেন, তালা খুলবে, ক্লাস-পরীক্ষাও আবার শুরু হবে। কিন্তু এই ঘটনা আমাদের শিক্ষাঙ্গনে কী সংস্কৃতি রেখে যাবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আজ যদি অবরোধ, অচলাবস্থা ও আলটিমেটামকে মতপার্থক্য সমাধানের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে দিই, কাল একই দৃশ্য অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও দেখা যেতে পারে। তখন ক্ষতিগ্রস্ত হবে কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়,ক্ষতিগ্রস্ত হবে একটি প্রজন্ম, এবং শেষ পর্যন্ত পুরো দেশ।
বিশ্ববিদ্যালয়ে মতবিরোধ থাকবে, প্রতিবাদ থাকবে, তর্কও থাকবে। কিন্তু তার কেন্দ্রে থাকতে হবে জ্ঞান, যুক্তি, পারস্পরিক সম্মান ও শিক্ষা।
কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু রাজনীতির মাঠে তৈরি হয় না; তার ভবিষ্যৎ তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। আজ আমরা যদি সেই জায়গাগুলো রক্ষা করতে ব্যর্থ হই, আগামীকাল তার মূল্য কত বড় হবে,তার হিসাব হয়তো এখনো আমরা কল্পনাও করতে পারছি না।

 

লেখক: চেয়ারম্যান, পোস্ট গ্রাজুয়েট সার্জারি একাডেমিয়া

শেয়ার করুন