পবিত্র কুরআনুল কারিমে একটি সুরা আছে যাতে রোমান জাতির বিজয়ের ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল। এটির নাম সুরা আর-রুম বা রোমবাসী। মক্কায় অবতীর্ণ ৩০তম এই সূরায় ৬০টি আয়াত রয়েছে।
সূরার নামকরণের মূল কারণ হলো এর ২ থেকে ৫ আয়াতে রোমান সাম্রাজ্যের পরাজয় ও পরবর্তীতে তাদের বিজয়ের ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়। রোমানরা পারসিকদের কাছে পরাজিত হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা অচিরেই (তিন থেকে নয় বছরের মধ্যে) রোমানদের বিজয়ের সুসংবাদ দেন, যা মুমিনদের জন্য আনন্দের কারণ হয়েছিল।
নবী করিম সা.-এর যুগে পারস্য (ইরান) ও রোম দুটি বৃহৎ শক্তি ছিল। পারসীকরা ছিল অগ্নিপূজক মুশরিক এবং রোমানরা ছিল খ্রিষ্টান (আহলে কিতাব)। মক্কার মুশরিকদের সহানুভূতি ছিল পারসীকদের প্রতি; কারণ তারা উভয়েই গায়রুল্লাহর উপাসক ছিল। পক্ষান্তরে মুসলিমদের সহানুভূতি রোমের খ্রিষ্টান রাজ্যের প্রতি ছিল; কারণ খ্রিষ্টানরাও মুসলিমদের মত (আহলে কিতাব) ছিল এবং অহী ও রিসালাতের প্রতি বিশ্বাসী ছিল। তাদের উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ-বিবাদ লেগেই থাকত। ৬০৩ খ্রিষ্টাব্দের সময়ে রোমের অধিবাসীরা একের পর এক যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছিল। নবী করিম সা.- এর নবুয়ত প্রাপ্তির কয়েক বছর পর ৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে পারস্য দামেস্ক পার হয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত দখল করে নেয়। এতে মুসলমানদের মন ভেঙে যায়। অবিশ্বাসীরা খুশি হয়। কারণ পারস্যরাও ছিল তাদের মতো পৌত্তলিক।
ওই সময় কুরআন কারীমের এই আয়াতগুলি অবতীর্ণ হয়। যাতে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে যে, কয়েক বছরের মধ্যে রোমানরা বিজয়ী হবে এবং বিজয়ীরা পরাজিত ও পরাজিতরা বিজয়ী হয়ে যাবে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে উক্ত ভবিষ্যদ্বাণী অসম্ভব মনে হলেও আল্লাহর উক্ত বাণীর ফলে মুসলিমদের মনে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, তা অবশ্যই সংঘটিত হবে।
আবু বকর সিদ্দীক রা. যখন এসব আয়াত শুনলেন, তখন মক্কার চারপাশে এবং মুশরিকদের সমাবেশ ও বাজারে উপস্থিত হয়ে ঘোষণা করলেন, ‘তোমাদের হর্ষোৎফুল্ল হওয়ার কোন কারণ নেই। কয়েক বছরের মধ্যে রোমকরা পারসিকদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করবে।’ অবিশ্বাসীরা ঠাট্টা করতে লাগলো।
মুশরিকদের মধ্যে কাফিরদের সর্দার উবাই ইবনে খালফ বলল, ‘তুমি মিথ্যা বলছ। এরূপ কখনও হতে পারে না।’ আবু বকর রা. বললেন, ‘আল্লাহর দুশমন, তুই-ই মিথ্যাবাদী। আমি এই ঘটনার জন্যে বাজি রাখতে প্ৰস্তুত আছি। যদি তিন বছরের মধ্যে রোমকরা বিজয়ী না হয়, তবে আমি তোকে দশটি উষ্ট্রী দেব।’ উবাই এতে সম্মত হল। একথা বলে আবু বকর রা. রসূলুল্লাহ সা. এর কাছে উপস্থিত হয়ে ঘটনা বিবৃত করলেন। মহানবী সা. বললেন, আমি তো তিন বছরের সময় নির্দিষ্ট করিনি। কুরআনে এই জন্যে بضع শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। কাজেই তিন থেকে নয় বছরের মধ্যে এই ঘটনা ঘটতে পারে। তুমি যাও এবং উবাইকে বল যে, আমি দশটি উষ্ট্রীর স্থলে একশ উষ্ট্রী বাজি রাখছি, কিন্তু সময়কাল তিন বছরের পরিবর্তে নয় বছর এবং কোন কোন বর্ণনা মতে সাত বছর নির্দিষ্ট করছি। আবু বকর রা. আদেশ পালন করলেন এবং উবাইও নতুন চুক্তিতে সম্মত হল। [তিরমিযী: ৩১৯৩, ৩১৯৪]। উল্লেখ্য, ইসলামে জুয়া বা বাজি ধরা তখনো হারাম হয়নি।
বলাবাহুল্য, কুরআনুল কারিমের ভবিষ্যৎ বাণী অনুযায়ী রোমানরা নয় বছর সময়ের মধ্যেই (সূরা অবতীর্ণ হওয়ার) ঠিক সপ্তম বছরে পুনরায় পারসীকদের উপর জয়যুক্ত হল।
রোমানদের এই বিজয় ঠিক ঐ সময় হয়েছিল, যখন মুসলিমগণ বদরের যুদ্ধে কাফেরদের উপর বিজয় লাভ করেছিলেন। মুসলিমগণ নিজেরা জয়ী হওয়ার ফলে আনন্দিত হন। রোমানদের এই বিজয় কুরআন কারীমের সত্যতার এক উজ্জ্বল প্রমাণ বহন করে।
আগেই বলা হয়েছে, তখনও পর্যন্ত এরূপ বাজি ধরাকে হারাম করা হয়নি, কিন্তু যখন এ ভবিষ্যদ্বাণী পূরণ হয়ে যায় তত দিনে এটা হারাম হয়ে গিয়েছিল। কাজেই উবাই ইবনে খালফের পুত্রগণ একশ উট হযরত আবু বকর রা.-কে আদায় করলে মহানবী সা. তাঁকে হুকুম দিলেন, ‘উটগুলো সদকা করে দাও।’
সুরা আর রুমের প্রথম পাঁচ আয়াতের বঙ্গানুবাদ নিম্নরূপ :-
১/ আলিফ-লাম-মীম
২/ রোমানরা পরাজিত হয়েছে
৩/ (আরবের) নিকটবর্তী অঞ্চলে, আর তারা তাদের এ পরাজয়ের পর অচিরেই বিজয়ী হবে
৪/ কয়েক (তিন থেকে নয়) বছরের মধ্যেই। পূর্বের ও পরের সব ফয়সালা আল্লাহরই। আর সেদিন মুমিনরা আনন্দিত হবে
৫/ (সে বিজয় অর্জিত হবে) আল্লাহর সাহায্যে। যাকে ইচ্ছে তিনি সাহায্য করেন, তিনি মহাপরাক্রমশালী, বড়ই দয়ালু
ফজিলত ও আমল : হজরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সকালে আয়াতগুলো পাঠ করবে, তার সারাদিনের আমলের ত্রুটিসমূহ এর বরকতে দূর করে দেওয়া হবে। একইভাবে সন্ধ্যায় পাঠ করলে সারা রাতের আমলের ত্রুটিসমূহ দূর হবে।’
আল্লাহর নিদর্শন ও সৃষ্টিতত্ত্ব : এই সূরায় আল্লাহর একত্ববাদ, মানুষের সৃষ্টি, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসা, রাত-দিনের বিশ্রাম, বৃষ্টি, আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং বিভিন্ন ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্যকে আল্লাহর মহান নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরার ২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানু ওয়া তা’ আলা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার ভালোবাসা, দয়া ও প্রশান্তির চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। দাম্পত্য জীবনে সুখ ও শান্তির জন্য এই আয়াতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বিপদ ও সতর্কবার্তা : মানুষের পাপ ও অন্যায়ের কারণেই পৃথিবীতে বিপর্যয় নেমে আসে, যাতে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
মহান রব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক
পূর্বকোণ/রেহেনুমা নাসির















