বাংলাদেশের কিংবদন্তি ফুটবলার কায়সার হামিদের মেয়ে কারিনা কায়সার এই মুহূর্তে আইসিইউতে আছেন। কারিনার ফ্যাটি লিভার ছিল। কয়েক দিন ধরেই তাঁর শরীর খারাপ লাগছিল। হাসপাতালে আনার পর চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর শরীরে ইনফেকশন হয়েছে। এর মধ্যে আবার হেপাটাইটিস এ-তেও আক্রান্ত হন। পরে গতকাল তাঁর লিভার ফেইলিউর হলে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
তো, কায়সার হামিদ তাঁর মেয়ের চিকিৎসার জন্য দেশের মানুষের কাছে দোয়া চেয়ে বলেছেন,
– আমরা তাকে চিকিৎসার জন্য ভারত বা সিঙ্গাপুরে নেওয়ার চেষ্টা করছি, কিন্তু এতে বিশাল অঙ্কের টাকার প্রয়োজন।
আরও বলেছেন:
– জমি বিক্রি করে টাকার সংস্থান করার চেষ্টা করছি। কিন্তু এতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন। জানি না, সরকারিভাবে কোনো সাহায্য পাব কিনা। সরকারসহ সাধারণ সবার কাছে আমি সহায়তা চাইছি।
সব মিলিয়ে আমি কারিনা কায়সারের দুটো ভিডিও দেখেছি। এই মেয়ে যেই ধরনের ভিডিও বানায়, সেটা আমার মতো মানুষের দেখার প্রশ্নই আসে না। তবুও দুটো ভিডিও আমার চোখে পড়েছিল—কখনো চকচকে রেস্তোরাঁয় জন্মদিনের অনুষ্ঠান, কখনো ঝকঝকে ফ্ল্যাটে বাবা-মাকে নিয়ে মজার মুহূর্ত—এই ধরনের ভিডিও।
দেখেই আমার মনে হয়েছে: এই মেয়ে এলিট-বুর্জোয়া সমাজের প্রতিনিধি। অর্থাৎ কথা বলার স্টাইল, ভিডিও করার ধরন দেখে আমার এমনটা মনে হয়েছে। অথচ দেখুন, সেই এলিটের মতো আচরণের মেয়েটি যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে, তখন তার বাবাকে পুরো বাংলাদেশের মানুষের কাছে মেয়ের চিকিৎসার জন্য হাত পাততে হচ্ছে।
জমি বিক্রির চিন্তা করতে হচ্ছে এবং এর চাইতেও বড় বিষয় হচ্ছে: ভারত কিংবা সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা করাতে নিয়ে যেতে চাইছেন। এর মানে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর কোনো আস্থা তাঁদেরও নেই কিংবা আমি জানি না, হয়তো এই চিকিৎসা বাংলাদেশে নেই। কারিনা কায়সার কেবল একটি উদাহরণ।
যারা আপনাদের কাছে ভিডিও বানিয়ে এই ধরনের চকচকে জীবন উপহার দেয়, আর আপনারা যারা এমন ভিডিও দেখে ওদের মতো এলিট-বুর্জোয়া হতে চান, আপনারাও জেনে রাখুন: এই দেশের সিস্টেম যদি না বদলায়, তাহলে ওই চকচকে ফ্ল্যাটে থাকা কিংবদন্তি ফুটবলারের কন্যার চিকিৎসা পাওয়াও দুষ্কর হয়ে যায়।
এই কারিনাই যদি আজকে বাংলাদেশে না থেকে ইউরোপের কোনো একটি দেশে থাকত, যেখানে চিকিৎসা বিনামূল্যে, তাহলে কি তার বাবাকে এভাবে আজকে হাত পাততে হতো?
না, তখন এই কারিনাকে চকচকে জীবন যাপন না করলেও চলত। সেটা দেখিয়ে বেড়ানোরও দরকার পড়ত না। আর আপনারা যারা দেখে সাময়িক আনন্দ পেতেন আর ভাবতেন: আহা যদি ওদের মতো হতে পারতাম—আপনারাও ওই বুর্জোয়াতন্ত্রের ফাঁদে পড়তেন না।
ইউরোপের কল্যাণমূলক রাষ্ট্রগুলোতে একজন সুইপার কিংবা রাজমিস্ত্রিকেও তার মেয়ের চিকিৎসার জন্য হাত পাততে হয় না। ভাবতে হয় না: বিদেশে নিয়ে যেতে হবে। সরকারই তাঁর দেখভাল করে বিনা পয়সায়। না, বিনা পয়সায় আসলে নয়।
আমরা এখানকার নাগরিকরা নিজেদের আয়ের ৩০ ভাগ সরকারকে কর হিসেবে দিই। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন। ১০০ টাকা আয় করলে সরকার ৩০ টাকা কেটে নেয়। আমরা সেটা আনন্দ সহকারে দিই। কেন দিই, জানেন?
বিনিময়ে আমার এই শহরে শিক্ষা বিনামূল্যে, চিকিৎসা বিনামূল্যে, গণপরিবহন বিনামূল্যে; চাকরি না থাকলে বেকার ভাতা দেওয়া হয়, বাচ্চা হলে বাচ্চার জন্য ভাতা দেওয়া হয়; বয়স হলে বয়স্ক ভাতা দেওয়া হয়। রাত তিনটে-চারটের সময়ও নারী-পুরুষ যে কেউ নিরাপদে রাস্তায় হেঁটে বেড়াতে পারে। সেই নিরাপত্তাও সরকারই দেয়। আর আমাদের দেশে?
কর তো এমনিতেই কম দেওয়া হয়। যেটা দেওয়া হয়, এর ৮০ ভাগ চলে যায় সরকারি লোকজনের পকেটে। বাকি যেই ২০ ভাগ থাকে, এর ১০ ভাগ স্থানীয় পর্যায়ের লোকজন মেরে দেয়। কাজ করার জন্য থাকে বাকি ১০ ভাগ!
তাই ওই চকচকে জীবন দেখিয়ে আয়-রোজগার করা মেয়েটির বাবাকেও জমি বিক্রি করে চিকিৎসার কথা ভাবতে হয়। সরকার এবং সাধারণ মানুষের কাছে হাত পাততে হয়।
কারণ আপনারা রঙিন জীবনটাই মানুষকে দেখান। মানুষকে আপনাদের মতো বুর্জোয়া হতে উৎসাহ দেন। আপনারা ঢাকার রাস্তায় ধূসর জামা পরা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলোর এই বয়সে কাজ করার দৃশ্য দেখান না। আপনারা শাসকগোষ্ঠীকে প্রশ্ন করেন না: কেন কিছু মানুষ এই দেশে থেকেও নেই? আপনারা ভাবেন: আমরা তো বেশ আছি। চকচকে জীবন আমাদের। কত মানুষ আমাদের দেখে, চেনে-জানে। তাই এসব নিয়ে আপনারা ভাবেন না।
আর আমরা যারা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেও ওই বুর্জোয়াতন্ত্রকে অস্বীকার করে আজীবন শাসকগোষ্ঠীকে প্রশ্ন করে গিয়েছি: কেন কিছু মানুষ দুপুরে ঢাকায় লাঞ্চ করে রাতের বেলায় সিঙ্গাপুরে ডিনার করতে যায়? আর বাকি মানুষগুলো পরের বেলার খাবারের কিংবা মাসের ভাড়ার চিন্তা করতে করতে জীবন কাটিয়ে দেয়? আমরা যারা আপনাদের অধিকারের কথা আজীবন লিখে গিয়েছি, আপনাদের অধিকারের জন্য লড়াই করছি, যাতে এই রাষ্ট্রে সকলেই মৌলিক অধিকারটুকু অন্তত পায়। হ্যাঁ, পুঁজিবাদী সমাজে ধনী-গরিব থাকবে। কিন্তু শিক্ষা, চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার কেন সবাই পাবে না? এই প্রশ্ন আমরা আজীবন করেছি এবং করে যাব। আমাদেরকে কিন্তু আপনারা সেলিব্রেট করেন না। কাদেরকে করেন?
কারিনার মতো যারা চকচকে জীবন আপনাদের উপহার দেয়, একটু বাংলা, একটু ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে দামি রেস্তোরাঁ কিংবা ফ্ল্যাটের দৃশ্য যারা দেখিয়ে বেড়ায়, তাঁদেরকে আপনারা সেলিব্রিটি বানান। দোষটা কারিনার নয়। কারিনাকে স্রেফ একটি উদাহরণ হিসেবে দেখালাম। আমি তাঁর সুস্থতা কামনা করি। দোষটা পুরো সমাজ ও সিস্টেমের। যেখানে প্রতিটি মানুষ অসুস্থ, কিন্তু কেউ বুঝতেই পারছে না। কারণ যারা এই সমাজের চিকিৎসা করবে, তাঁরাও অসুস্থ।
বাংলাদেশ নামক জনপদ চিকিৎসার ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছে। লেখক: আমিনুল ইসলাম
পূর্বকোণ/পিআর
















