বাংলাদেশের নবমুক্তি হলো ৩৬ জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানে। নামকরণ বাংলাদেশ ২.০। স্বৈরশাসনের জগদ্দল পাথর এবং কণ্ঠ ও চিন্তা রোধ করা লৌহ আঙ্গুলগুলো চুর্ণবিচুর্ণ করে দিল। এখন সময় হলো স্বাধীনতার ঘোষণা অনুযায়ী সাম্য মৈত্রী আর সুশাসন নিশ্চিত করে নিরুদ্রব ফলনধর্মী জীবনের জন্য। ফরাসী বিপ্লবের পর তাদের থীম ছিল লিবার্টে, ইগালিটে ও ফ্রেটারনিটে যথাক্রমে মুক্তি, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব। তাদের জাতীয় পতাকার তিন রঙে তা সুশোভিত। সাম্য মৈত্রী ও সুশাসনের জন্য সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন দুর্নীতি মুক্তপরিবেশ ও কর্মকাÐ। ছোট ছোট অনেক কিছু দিয়েই দুর্নীতির সূত্রপাত হয়। এমনি সবার অলক্ষের একটা বিষয় হলো ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা ‘স্বার্থের দ্ব›দ্ব’।
যখন ব্যক্তিস্বার্থ ও পেশাগত স্বার্থ মুখোমুখি হয়ে যায় তাকে বলা হয় স্বার্থের দ্বন্দ্ব। একটা আরেকটাকে প্রভাবিত করে ফলাফল নষ্ট বা আপোষ করে। স্বাথের দ্বন্দ্ব কয়েক প্রকার। ১. সরাসরি, ২. অনুভুত বা সুপ্ত ও ৩. স্বজনপোষণ, ৪. উতকোচ। সরাসরি দ্বন্দ্ব হয় যখন ব্যক্তির স্বার্থ তার পেশা বা প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করে। যেমন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে নিজ অফিসে সরবরাহের ব্যবসা করা নিজের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। সমসাময়িক কালে সরাসরি স্বার্থের দ্ব›দ্ব সবচেয়ে বেশী হচ্ছে। সবচেয়ে উৎকণ্ঠার অবাক করা বিষয় হলো প্রায় সবাই এটাকে স্বাভাবিক মনে করে। স্বার্থের দ্বন্দ্বের কিছু উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ১) সংসদ সদস্যের নির্বাহী ও আর্থিক কর্মকাÐ। বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র নির্বাহী, বিচার ও বিদানিক বিষয়গুলোকে পুরোপুরি আলাদা করে দিয়েছে। অথচ সংসদ সদস্যগণকে আর্থিকসহ নিজ নিজ এলাকায় অনেক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আর্থিক এবং নির্বাহিক ক্ষমতা দেয়া হয়। যা শাসনতন্ত্রের লঙ্ঘন। আমাদের কিছু ভুল ধারণা আছে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতার ব্যাপারে। শাসনতন্ত্র দু’ধরনের নির্বাচিত প্রতিনিধির ব্যাবস্থা করেছে। নির্বাহী ক্ষমতা সম্পন্ন জনপ্রতিনিধি, যেমন- ইউনিয়ন কাউন্সিল চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌর মেয়রগণ। আইন প্রণয়ন ক্ষমতাসম্পন্ন জনপ্রতিনিধি হলেন সাংসদগণ। আইন প্রণেতাগণ নির্বাহী ও আর্থিক কাজ করতে গিয়ে বিরাট স্বার্থের দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করছেন। এবং তা করতে গিয়ে নির্বাহী ক্ষমতার জনপ্রতিনিধিদের কাজের পরিধি সীমিত করে দিচ্ছেন। ২) দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকা। রাষ্ট্রের সরকারী বা পাবলিক লাভজনক পদে অধিষ্ঠিতগণ রাষ্ট্রের অনেক কিছুর সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকেন, যার সাথে রাষ্ট্রের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা সংযুক্ত। অনেক পদের জন্য গোপনীয়তা নিশ্চয়তার শপথ নিতে হয়। কিন্তু দেখা যায় এ বিষয়টা সমসাময়িক কালে ভয়ংকরভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। এমনকি মন্ত্রী বা সাংসদগণও বা সরকারী কর্মকর্তাগণ তা লঙ্ঘন করছেন। একই সাথে অনেক দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে আছেন। সাধারণ জনগণের জন্য আইনসঙ্গত হলেও রাষ্ট্রের পদাধিকারীদের জন্য তা বেআইনী, যা অনেক স্বার্থের দ্বন্দ্বে উদ্ভব ঘটায়। ৩) সায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের পদে সরকারী কর্মকর্তা। যেমন মেডিকেল কলেজের সরকারী অধ্যাপক স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টির ডীন। যখন সরকারি আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত বিপরীতমুখী হবে তখন সরকারী সিদ্ধান্তই বহাল থাকরে এবং সায়ত্বশাসন লঙ্ঘিত হবে। ৪) সরকারী ক্রয়-বিক্রয় নিজেদের সম্পর্কের বা পরিচিত বলয়ের মধ্যে রাখা। সরকারী ক্রয়-বিক্রয় নিজের সম্পর্কের বা পরিচিত বলয়ের সরবরাহকারীদের নিকট হতে সম্পন্ন করা। ৫) নিজের আত্মীয়ের পরীক্ষক হওয়া। পরীক্ষার্থী যখন আত্মীয় তখন তা গোপন রেখে পরীক্ষক হওয়া। ৬) নিজের আত্মীয়কে মেডিকেল সার্টিফিকেট দেয়া। নিজের আত্মীয়কে রোগী হিসাবে সার্টিফিকেট দেয়া।
৭) কোন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সুবিধা নেয়া পরামর্শক হওয়া যে কোম্পানীর জন্য গবেষণা করা। ৮) গোপনীয়তা ভঙ্গ করে আর্থিক বা অন্য সুবিধার জন্য তথ্য বা তত্ত্ব দেয়া নেয়া। ৯) একই বিদ্যায়তনের প্রাইভেট পড়ুয়াদের তাদের শিক্ষক কর্র্তৃক সাজেশনের নামে প্রশ্ন দেয়া। ১০) শিক্ষক যখন পাবলিক পরীক্ষার পরিক্ষক হন। ১১) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্র্রেটের অভিযান। যিনি অভিযোগকারী তিনিই বিচারক দণ্ড প্রদানকারী। ১২) বিশেষ সম্পর্কের জন্য কর্মক্ষেত্রে বা ক্রয়-বিক্রয় বা অন্য কিছুতে সুবিধা প্রদান। ১৩) ডেপুটি কমিশনার যখন জেলা ম্যাজিস্ট্র্রেট। ১৪) ইত্যাদি আরও অনেক আনেক স্বার্থের দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
স্বার্থের দ¦›েদ্বর পরিণাম হলো ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের- ১) খ্যাতি ও মর্যাদা নষ্ট হওয়া, ২) আস্থা বিলীন হওয়া, ৩) আর্থিক ক্ষতি, ৪) সম্পর্ক নষ্ট, ৫) বিশৃংখলার সৃষ্টি, ৬) প্রতিষ্ঠান বিলোপ হওয়া। তাই স্বার্থের দ¦›দ্ব নিরসনে কিছু প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আমাদের দেশে এই ব্যাপারে অবগতি ও সচেতনতা খুব একটা নেই। সার্বজনীনভাবে অজ্ঞতা, দক্ষতা, মানসিকতা ও যথাযথ আচরণের অভাব প্রকট। এই ব্যাপারটি আমাদের দেশের অনেক বড় বড় দুর্নীতি, স্বজনতোষণ, কাজের মান ও আর্থিক অনিয়মের সূত্রপাত করে, যাকে বলা যায় ‘সুই হয়ে ঢুকা আর ফাল হয়ে বের হওয়া’। এর নিরসনে যা করা উচিত তা হলো- ১) জাতীয়, এলাকা ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক স্বার্থের দ্বন্দ্ব নীতিমালা প্রণয়ন, প্রশিক্ষণ. প্রকাশনা ও প্রয়োগ; ২) সময় সময় স্বার্থের দ্বন্দ্ব বের করার জন্য জরিপ দ্বারা তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা তেরী ও প্রকাশ; ৩) অবস্থা ও প্রতিষ্ঠান অনুযায়ী কর্মপন্থা গ্রহণ; ৪) নিয়মিত পরীবিক্ষণ ও পর্যবেক্ষেণ; ৫) স্বার্থের দ্বন্দ্ব আছে কিনা নেই তা ঘোষণা দেয়া অভ্যাস করা; ৬) জাতীয় আইন প্রণয়ন করে তা প্রয়োগ করা।
আমাদের প্রতিদিনের কাজ ও সম্পর্কে যদি আমরা স্বার্থের দ্বন্দ্বরে সন্ধান করি ও তা প্রতিরোধ করতে সচেষ্ট হই, তবে আমাদের দেশে দুর্নীতিসহ অনেক খারাপ কাজ বিলোপ হয়ে যাবে।
লেখক: বিশেষজ্ঞ, মেডিসিন ও কিডনি রোগ; গবেষক; প্রাক্তন অধ্যক্ষ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ; খণ্ডকালীন অধ্যাপক জনস্বাস্থ্য, চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি
পূর্বকোণ/এএইচ
















