চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬

সেই শিশুটি যুবক হয়ে ফিরছেন ঘরে

সেই শিশুটি যুবক হয়ে ফিরছেন ঘরে

তাসনীম হাসান

২০ আগস্ট, ২০২৬ | ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ

একজন মা অপেক্ষা করছেন ছেলের জন্য। সেই অপেক্ষা এক-দুই বছর নয়, প্রায় ২৫ বছরের। যে ছেলে মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে দেশ ছেড়েছিলেন। কোথায় আছেন, কেমন আছেন-কিছুই জানতেন না পরিবারের কেউ। সময়ের সঙ্গে সেই অপেক্ষা পরিণত হয়েছিল অনিশ্চয়তায়। তবু মায়ের বুকের ভেতর জেগে ছিল ক্ষীণ একটি আশা-ছেলে একদিন ফিরবে। অবশেষে ফিরেছেন মোহাম্মদ ফরিদ।

 

দীর্ঘ ২৫ বছর পর তুরস্ক থেকে দেশে ফিরেছেন তিনি। এই দীর্ঘ সময়ে জীবনের কত বাঁক পেরিয়েছেন-পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, মানবপাচারের শিকার হয়েছেন, হারিয়েছেন দুই পা। বিদেশের মাটিতে একা লড়াই করেছেন বেঁচে থাকার জন্য। তবু হারাননি শৈশবের স্মৃতি, হারাননি ঘরে ফেরার আশা। আজ বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাকের মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে ফরিদকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কক্সবাজার থেকে তাঁর ভাই সৈয়দ আলম এরই মধ্যে ঢাকার পথে। দীর্ঘ দুই যুগ পর দুই ভাইয়ের দেখা হবে। আর বড় ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা শেষ হবে বৃদ্ধ মা নূরজাহান বেগমের।

 

প্রায় ২৫ বছর আগে, ফরিদের বয়স তখন ১০। বাবা মো. আয়ুব আলীর সঙ্গে জাহাজে করে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে প্রায় ১০ বছর থাকার পর দালালেরা তাঁকে সড়কপথে তুরস্কে নিয়ে যায়। তারপর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। কক্সবাজারের উখিয়ার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ায় পড়ে থাকে তাঁর পরিবার। তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে ফরিদ সবার বড়। তুরস্কে থাকাকালে এক দুর্ঘটনায় তাঁর দুই পা কেটে যায়। এরপর কেটে গেছে বছরের পর বছর।

 

গত মঙ্গলবার ভোরে তুরস্ক থেকে টি কে ৭১২ ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছান ফরিদ। দীর্ঘদিন বাংলায় কথা বলার অনভ্যাসে ঠিকমতো মাতৃভাষা বলতেও পারছিলেন না। নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম আর কয়েকটি বিচ্ছিন্ন তথ্য-এই ছিল তাঁর সম্বল।

 

বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে ফরিদকে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে নেওয়া হয়। শুরু হয় পরিবারের সন্ধান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী ও স্থানীয় মানুষের সহায়তায় চলে খোঁজ। অবশেষে দেশে ফেরার মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই উখিয়ার নাছির পাড়ায় পাওয়া যায় ফরিদের পরিবার।

 

বুধবার বিকেলে ভিডিও কলে ভাই সৈয়দ আলমের সঙ্গে কথা হয় ফরিদের। দুই যুগের বেশি সময় পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে ফরিদ যেন ফিরে গেলেন সেই শৈশবে। একপর্যায়ে জানতে চান, ‘তোর তো একটা আঙুল বেশি ছিল?’ সৈয়দ আলম তখন উত্তর দেন, ‘হ্যাঁ।’ সময় ফরিদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু শৈশবের সেই ছোট্ট স্মৃতিটুকু যেন মুছে দিতে পারেনি।

 

ফরিদের ভাই সৈয়দ আলম বলেন, ‘তুরস্কে যাওয়ার পর আমাদের সঙ্গে ফরিদ ভাইয়ের আর কোনো যোগাযোগ হয়নি। আমরা প্রতিদিনই তাঁর অপেক্ষায় থাকতাম। আশা করতাম, এই বুঝি ভাইয়ের ফোন আসবে। অবশেষে ভাই ফিরল। আমার মায়ের অপেক্ষাও ফুরাল। এত বছর পর ভাইকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ এখন আমাদের সবার মাঝে।’

 

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান পূর্বকোণকে বলেন, ‘ফরিদের কাছে তথ্য ছিল খুবই সীমিত। বাংলাতেও ভালোভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। এরপরও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মানুষ, গণমাধ্যমকর্মী ও ব্র্যাকের কর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দ্রুত তাঁর পরিবারের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হয়েছে। এখন একজন মা তাঁর সন্তানকে ফিরে পাবেন, একজন ভাই তাঁর ভাইকে ফিরে পাবেন, আর একজন মানুষ ফিরে পাবেন তাঁর হারানো স্বজনÑএর চেয়ে মানবিক আর কী হতে পারে।’

 

১০ বছর বয়সে যে শিশুটি বাবার হাত ধরে অচেনা পথে পা বাড়িয়েছিল, আজ তিনি ফিরছেন জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে। মঙ্গলবার দেশে ফিরেছেন। বুধবার ফিরে পেয়েছেন পরিবারের ঠিকানা। আজ দেখা হবে ভাইয়ের সঙ্গে। আর কাল ফিরবেন ঘরে। এরই মধ্যে শেষ হতে চলেছে দুই যুগের অপেক্ষা। তবে বাড়িছাড়া সেই শিশুটি নয়। ২৫ বছর আগে যে ছোট্ট ফরিদ দেশ ছেড়েছিলেন, সময় তাকে যুবক করে দিয়েছে। কাল সেই ফরিদই ফিরবেন-নিজের ঘরে, চেনা উঠোনে, মায়ের কাছে।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট