চট্টগ্রাম বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

বিশ্লেষণ

এপ্রিল-মার্চে অর্থবছর: কেন পরিবর্তন, কীভাবে হবে, কতটা সুফল মিলবে

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

১৯ আগস্ট, ২০২৬ | ৮:১১ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের প্রচলিত ১ জুলাই- ৩০ জুন অর্থবছরের পরিবর্তে ১ এপ্রিল-৩১ মার্চ অর্থবছর চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ১৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে অর্থ বিভাগের প্রস্তাবটি অনুমোদন করা হয়। তবে পরিবর্তনটি তাৎক্ষণিক নয়; নতুন ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর হবে ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে।

 

অর্থবছর পরিবর্তনের প্রয়োজন হলো কেন

সরকারের প্রধান যুক্তি অর্থনৈতিক তত্ত্ব নয়, বরং বাংলাদেশের মৌসুমি বাস্তবতা ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা।
বর্তমান জুলাই-জুন অর্থবছরের শেষ দুই মাস-জুলাই ও আগস্ট বাংলাদেশের বর্ষাকাল। অথচ অর্থবছরের শেষ দিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের চাপ বাড়ে। ফলে অনেক সড়ক, সেতু, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণকাজ বর্ষার মধ্যে চলতে থাকে। বৃষ্টিতে কাজ বিলম্বিত হয়, নির্মাণকাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং একই সঙ্গে মানুষের দুর্ভোগও বাড়ে।
অর্থ বিভাগের যুক্তি হলো, অর্থবছর যদি এপ্রিল থেকে মার্চ হয়, তাহলে এপ্রিল-মে-জুনের মধ্যেই অর্থবছরের অধিকাংশ উন্নয়নকাজ শেষ করার জন্য প্রশাসনিক ও আর্থিক চাপ তৈরি হবে।
ফলে বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ শেষ করার সুযোগ বাড়বে।
এর আরেকটি সম্ভাব্য সুফল হলো অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে হঠাৎ করে বিপুল অর্থ ব্যয় করার প্রবণতা কমানো। বাংলাদেশে জুন মাসে উন্নয়ন ব্যয় দ্রুত বাড়ানোর প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচিত। একই সময়ে রাজস্ব আদায়ের ওপরও বছরের শেষ মাসে অতিরিক্ত চাপ পড়ে।

 

প্রস্তাবটি কার

এটি কোনো ব্যক্তির একক প্রস্তাব নয়। অর্থ বিভাগই মন্ত্রিসভায় প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছে। ১৭ আগস্টের মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়। তবে অর্থবছর পরিবর্তনের আলোচনা নতুন নয়। চলতি বছরের জুনে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও অর্থবছর পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি অবশ্য এপ্রিল-মার্চ নয়, জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছরের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, অর্থবছরের শেষদিকে বর্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে এডিপি বাস্তবায়নের তাড়াহুড়ো অনিয়ম ও অপচয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। অতএব বর্তমান সিদ্ধান্তটি মূলত অর্থ বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তাব, যা মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে।

 

কীভাবে হবে পরিবর্তন

সিদ্ধান্তটির বিশেষত্ব হলো সরাসরি জুলাই-জুন থেকে এপ্রিল-মার্চে হবে না।
২০২৬- ২৭ : স্বাভাবিক ১২ মাসের জুলাই-জুন অর্থবছর।
২০২৭- ২৮ : হবে ৯ মাসের ট্রানজিশনাল অর্থবছর-জুলাই ২০২৭ থেকে মার্চ ২০২৮।
২০২৮-২৯ : শুরু হবে পূর্ণাঙ্গ নতুন অর্থবছর-১ এপ্রিল ২০২৮ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৯।
অর্থাৎ ২০২৭ সালের এপ্রিল-জুনের পরবর্তী সময়কে আলাদা কোনো ১২ মাসের অর্থবছর হিসেবে নেওয়া হবে না; জুলাই ২০২৭ থেকে শুরু হওয়া ২০২৭-২৮ অর্থবছর মাত্র নয় মাসে, মার্চ ২০২৮-এ শেষ হবে। এরপর এপ্রিল ২০২৮ থেকে নতুন চক্র শুরু হবে।

 

নয় মাসের অর্থবছরের অর্থ কী

এটি নিছক ক্যালেন্ডার পরিবর্তন নয়। নয় মাসের ওই ট্রানজিশনাল বছরে সরকারকে বাজেট, রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প, হিসাবরক্ষণ এবং আর্থিক প্রতিবেদন-সবকিছুর সময়সূচি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে হবে। অর্থাৎ ২০২৭-২৮ সালের বাজেটকে স্বাভাবিক ১২ মাসের পরিবর্তে ৯ মাসের কার্যক্রমের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করতে হবে। তবে কোন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ কীভাবে কমবে বা পুনঃ র্নির্ধারিত হবে, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে সমন্বয় হবে কিংবা চলমান এডিপির প্রকল্পগুলো কীভাবে পুনর্বিন্যাস হবে- এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রকাশিত হয়নি। এ কারণেই বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

 

পরিবর্তন আনতে হবে আইনেও

অর্থবছর পরিবর্তনের জন্য শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবপদ্ধতি পরিবর্তন করলেই হবে না। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের সংবিধান এবং General Clauses Act, 1897-এ প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। পাশাপাশি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
এ উদ্দেশ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), লেজিসলেটিভ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে একটি কমিটি পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণ করবে।

 

শুধু বাজেট নয়, বদলাবে পুরো আর্থিক চক্র

অর্থবছর পরিবর্তনের প্রভাব শুধু বাজেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হবে-রাজস্ব আদায়ের বার্ষিক লক্ষ্য ও সময়সূচি, সরকারি ব্যয় ও হিসাবরক্ষণ, এডিপি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় ও দরপত্রের সময়সূচি, ব্যাংক ও সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব, কর ও রাজস্ব প্রশাসনের রিপোর্টিং এবং বাজেট প্রণয়ন ও সংসদীয় অনুমোদনের সময়সূচি।
সরকার নিজেও স্বীকার করেছে যে আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় পরিবর্তন প্রয়োজন হবে।

 

এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর কী অস্বাভাবিক

একেবারেই নয়। ভারত এপ্রিল-মার্চ অর্থবছর অনুসরণ করে। এছাড়া জাপান, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ আরও কয়েকটি দেশ একই ধরনের সময়সীমা ব্যবহার করে। তবে এটাও মনে রাখা দরকার, পৃথিবীর বহু দেশ জানুয়ারি-ডিসেম্বর ক্যালেন্ডার বছরকেই অর্থবছর হিসেবে ব্যবহার করে। সুতরাং এপ্রিল-মার্চ কোনো আন্তর্জাতিকভাবে একমাত্র আদর্শ ব্যবস্থা নয়।
বাংলাদেশের জন্য এপ্রিল-মার্চের মূল যুক্তি তাই অন্য দেশকে অনুসরণ করা নয় বরং বাংলাদেশের বর্ষাকাল, উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং সরকারি ব্যয়ের সময়সূচির সঙ্গে অর্থবছরকে সামঞ্জস্য করা।

 

সুফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর

অর্থবছর পরিবর্তন নিজে কোনো জাদুর কাঠি নয়। এপ্রিল-মার্চ করলেই উন্নয়ন প্রকল্পের মান বাড়বে- এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, জমি অধিগ্রহণ, দরপত্র প্রক্রিয়া, ঠিকাদার নির্বাচন, অর্থছাড়, দুর্বল তদারকি এবং প্রশাসনিক জটিলতা যদি থেকেই যায়, তাহলে শুধু অর্থবছরের ক্যালেন্ডার বদলালেই কাক্সিক্ষত ফল আসবে না। বরং নতুন ব্যবস্থার সাফল্যের জন্য প্রয়োজন হবে জানুয়ারি থেকে মার্চকে প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যকর মৌসুম হিসেবে ব্যবহার করা এবং প্রকল্প অনুমোদন ও দরপত্রের কাজ তার অনেক আগেই শেষ করা।

 

তবুও থেকেই যায় গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন

সরকার বলছে, জুলাই-আগস্টের বর্ষায় উন্নয়নকাজের ক্ষতি এড়াতেই অর্থবছর পরিবর্তন করা হচ্ছে। যুক্তিটি বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে যথেষ্ট সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো- অর্থবছর পরিবর্তনের সঙ্গে কি সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সংস্কারও হবে? যদি একটি প্রকল্প অনুমোদন পেতে বছরের পর বছর লাগে, জমি অধিগ্রহণ আটকে থাকে, দরপত্র বারবার বাতিল হয় কিংবা ঠিকাদার নির্বাচন বিলম্বিত হয়, তাহলে ফেব্রুয়ারি-মার্চ করেও বর্ষার আগে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না। সুতরাং অর্থবছর পরিবর্তনকে শুধু ক্যালেন্ডার সংস্কার হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে করতে হবে বাজেট, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার একটি বৃহত্তর সংস্কারের অংশ।

 

পরিবর্তনের সম্ভাব্য বড় লাভ

সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে নতুন ব্যবস্থায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সুফল পাওয়া যেতে পারে- প্রথমত : বর্ষার আগেই অবকাঠামো উন্নয়নকাজ শেষ করার চাপ তৈরি হবে দ্বিতীয়ত : অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে সরকারি ব্যয়ের তাড়াহুড়ো কমতে পারে; তৃতীয়ত: বাজেট ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচি বাংলাদেশের বাস্তব মৌসুমি চক্রের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু এর বিপরীতে নয় মাসের ট্রানজিশনাল বছরটি হবে একটি বড় প্রশাসনিক পরীক্ষা। আইন সংশোধন, বাজেট পুনর্গঠন, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, হিসাবরক্ষণ, সরকারি সফটওয়্যার এবং অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বছর একই সঙ্গে পরিবর্তন করতে হবে।

 

এপ্রিল-মার্চ অর্থবছরের সিদ্ধান্তটি নীতিগতভাবে যুক্তিসঙ্গত হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের চেয়ে বেশি- সরকার সেই পরিবর্তনের সঙ্গে কতটা কার্যকর প্রশাসনিক ও আর্থিক সংস্কার করতে পারে তার ওপর।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট