বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের সাংবিধানিক পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’ এবং কোনো ভুল বা বিভ্রান্তিকর প্রশ্নের পেছনে না ছুটে দেশের সবাইকে ‘আদিবাসী’ না হয়ে ‘অধিবাসী’ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেছেন, পাহাড়ি অঞ্চলে সৃষ্ট ঐতিহাসিক বিভেদ ও ষড়যন্ত্রের পেছনে ভিনদেশি উসকানি এবং আন্তর্জাতিক মহলের স্বার্থ রয়েছে। তবে আমরা সবাই বাংলাদেশের ‘অধিবাসী’ হবো, ‘আদিবাসী’ কেউ হবো না।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির দাবিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত আন্দোলন জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর গৃহীত ‘ইউনাইটেড নেশনস ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অফ ইন্ডিজিনাস পিপল’ চার্টারে বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত ছিল। এমনকি বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালী কয়েকটি রাষ্ট্রও এর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। আইএলও কনভেনশন ১৬৯ এবং জাতিসংঘের ওই চার্টার বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কারণ, বাংলাদেশ এর অংশ নয়। তাই এ বিষয়টি নিয়ে বারবার সমস্যা বা সমাধানের প্রসঙ্গ ওঠার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
সমস্যার স্থায়ী ও সাংবিধানিক সমাধানের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, জুলাই চার্টারে রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে সবাই স্বাক্ষর করেছে। দলগুলোর মধ্যে যেসব দফায় কোনো দ্বিমত বা নোট অব ডিসেন্ট ছাড়াই ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরের সব নাগরিকের মূল পরিচয় হবে বাংলাদেশি। এটি সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর ভাষা, যা আগামী সংশোধনীতেও নিয়ে আসার জন্য রাজনৈতিক সমঝোতা ও অঙ্গীকার রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ও ভূ-রাজনীতি নিয়ে সতর্ক করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলে অতীতে যেমন ভিনদেশি উসকানি ছিল, তেমনই এখনো বাংলাদেশের পূর্ব সীমান্ত ও আশপাশের অঞ্চলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল নিজেদের স্বার্থে ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা করছে। তবে এই ভূখণ্ডের ঐতিহ্য বহুকালের। লক্ষ্মণ সেন বা পাল বংশের বহু আগে থেকেই এদেশের মানুষ নিজস্ব আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের জন্য সংগ্রাম করে আসছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র ও আধুনিক নেশন স্টেট হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও এদেশের নিজস্ব জাতিসত্তা বহুকালের পুরোনো।
অন্যান্য দেশের উদাহরণ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশে প্রায় দেড় হাজার আঞ্চলিক ভাষা এবং ৩৬টির মতো প্রধান ভাষা রয়েছে। কিন্তু তাই বলে তারা দেড় হাজার কিংবা ৩৬টি আলাদা জাতি নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এমন দাবি উঠলেও তা স্বীকৃত হয়নি। বাংলাদেশে যারা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী বা উপজাতি রয়েছে তাদের বিকাশের স্বার্থে সংবিধানে বিশেষ সুবিধা ও কোটা রিজার্ভেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যেন সমাজে সমতা আসে।
তিনি আরও বলেন, আমরা কেন নদী অববাহিকায় বাস করলাম, আর আরেকজন কেন পাহাড়ি উপত্যকায় বাস করলো, তার ওপর ভিত্তি করে কোনো নেশন স্টেট হতে পারে না। তাই আমরা সবাই বাংলাদেশের ‘অধিবাসী’ হবো, ‘আদিবাসী’ কেউ হবো না।
দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সব ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি ও ভাষাভাষির মানুষ আমরা এদেশের নাগরিক। নাগরিক হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক অধিকার পুরোপুরি সমান এবং এই পরিচয়েই আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম প্রমুখ।
পূর্বকোণ/আদর/পারভেজ















