এক সময় আমেরিকান রাজনীতিতে একটি বিষয় নিয়ে প্রায় কোনো বিতর্ক ছিল না- ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন। ডেমোক্রেট ও রিপাবলিকান উভয় দলই ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করত। কংগ্রেসে ইসরায়েলপন্থী অবস্থান ছিল কার্যত দ্বিদলীয় ঐকমত্যের প্রতীক। কিন্তু ইতিহাসের চাকা কখনো স্থির থাকে না।
আজ যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলকে ঘিরে জনমত, রাজনৈতিক ভাষ্য এবং দলীয় অবস্থান এমনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে, যা এক দশক আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। সাম্প্রতিক জরিপগুলো সেই পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৬ সালে আমেরিকানদের ৬০ শতাংশ ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করছে, যেখানে এক বছর আগে এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ। মাত্র ৩৭ শতাংশ এখন ইসরায়েলকে ইতিবাচকভাবে দেখে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো- ডেমোক্রেটদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে। কিন্তু পরিবর্তন শুধু ডেমোক্রেটদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকান পার্টিকে ইসরায়েলের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখা হয়েছে। এখনও অধিকাংশ রিপাবলিকান ইসরায়েলকে সমর্থন করে। কিন্তু ৫০ বছরের নিচের রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব দ্রুত বাড়ছে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, তরুণ রিপাবলিকানদের ৫৭ শতাংশ এখন ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
কারণ রিপাবলিকান পার্টির নতুন প্রজন্ম আগের নব্য-রক্ষণশীল পররাষ্ট্রনীতিকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ দর্শনের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা জানতে চাইছেÑমধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র কেন জড়াবে? কেন আমেরিকান করদাতাদের অর্থ বিদেশি যুদ্ধে ব্যয় হবে, যখন দেশের অভ্যন্তরে ঋণ, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে? অর্থাৎ ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন আর নিঃশর্ত নয়; সেটি এখন জাতীয় স্বার্থের পাল্লায় ওজন করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে আরও গভীর পরিবর্তন ঘটছে। গাজা যুদ্ধের পর তরুণ ভোটার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এবং প্রগতিশীল কর্মীদের মধ্যে ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হয়েছে। একসময় দলের প্রান্তিক অংশে সীমাবদ্ধ থাকা এই অবস্থান এখন মূলধারার আলোচনায় প্রবেশ করেছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে প্রতীকী উদাহরণ হলেন নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। ২০২৫ সালে নিউইয়র্ক সিটির ডেমোক্রেটিক মেয়র প্রাইমারিতে তাঁর বিজয় শুধু একজন রাজনীতিকের সাফল্য ছিল না; এটি ছিল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক বিদ্রোহের প্রতীক। কিন্তু ঘটনাটি সেখানেই থেমে থাকেনি।
সম্প্রতি মামদানি সমর্থিত তিনজন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট প্রার্থী নিউইয়র্কের কংগ্রেসনাল প্রাইমারিতে প্রতিষ্ঠিত ডেমোক্রেটদের পরাজিত করেছেন। এই প্রার্থীরা প্রকাশ্যে গাজায় মার্কিন সামরিক সহায়তার বিরোধিতা এবং ইসরায়েল নীতির পুনর্মূল্যায়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এটি হয়তো জাতীয় নির্বাচনের চিত্র নয়, কিন্তু এটি ডেমোক্রেটিক পার্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
আজকের তরুণ প্রগতিশীল ভোটারদের কাছে ইসরায়েল আর শুধুমাত্র একটি মিত্র রাষ্ট্র নয়; এটি মানবাধিকার, সামরিক সহায়তা, বৈদেশিক ব্যয় এবং আমেরিকার বৈশ্বিক ভূমিকা নিয়ে বৃহত্তর বিতর্কের অংশ।
আরেকটি জরিপে দেখা যাচ্ছে, প্রথমবারের মতো আমেরিকানদের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতি ইসরায়েলিদের প্রতি সহানুভূতির সমান পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ৪১ শতাংশ আমেরিকান ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন, যেখানে ৩৬ শতাংশ ইসরায়েলিদের প্রতি। গত দুই দশকের বেশি সময়ে এটি একটি বড় পরিবর্তন। তবে এখানেই একটি সতর্কতা প্রয়োজন।
ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা কমছে মানেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ক ভেঙে পড়ছেÑএমন ধারণা ভুল হবে। পেন্টাগন, গোয়েন্দা সহযোগিতা, প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত বাস্তবতায় ইসরায়েল এখনও ওয়াশিংটনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। রাষ্ট্রের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন রাতারাতি আসবে না। কিন্তু জনমত পরিবর্তনের একটি নিজস্ব গতি রয়েছে।
আজকের তরুণ ডেমোক্রেট আগামী দিনের সিনেটর। আজকের সংশয়ী তরুণ রিপাবলিকান আগামী দিনের কংগ্রেসম্যান। ফলে আজ যে প্রশ্নগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উঠছে, কাল সেগুলো কংগ্রেসের বিতর্কে পরিণত হতে পারে। সুতরাং বর্তমান পরিবর্তনের মূল তাৎপর্য কেবল ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা হ্রাস নয়।
মূল প্রশ্ন হলোÑআমেরিকার দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই কি ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেছে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে ইসরায়েল প্রশ্নে আজ যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, সেটি হয়তো কেবল একটি জনমত জরিপের ফল নয় বরং আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির আগামী অধ্যায়ের সূচনা।















