প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার কেন্দ্রে প্রযুক্তি, পাঠ্যক্রম বা প্রতিষ্ঠান নয়; আছেন একজন শিক্ষক আর একজন শিক্ষার্থী। কিন্তু দীর্ঘ শিক্ষকতাজীবনের অভিজ্ঞতায় আজ স্পষ্ট বুঝতে পারছি, শিক্ষকতার অর্থ সম্ভবত নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। একই শ্রেণিকক্ষে এখন মুখোমুখি দুটি প্রজন্ম, চকবোর্ডে বেড়ে ওঠা শিক্ষক এবং টাচস্ক্রিনে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থী। আমাদের সময়ে শেখার অবলম্বন ছিল বই, লাইব্রেরি, শিক্ষকের দীর্ঘ বক্তৃতা আর হাতে লেখা নোট। তথ্য ছিল দুর্লভ, তাই শিক্ষকই ছিলেন জ্ঞানের প্রধান উৎস। শিক্ষক বলতেন, শিক্ষার্থী শুনতেন। আজকের শিক্ষার্থী বড় হয়েছেন ডিজিটাল জগতে। কয়েক সেকেন্ডে তথ্য খুঁজে পান, ভিডিও দেখেন, শিক্ষকের কথা শেষ হওয়ার আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তা যাচাই করে ফেলেন। তাই প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘আমরা কী শেখাব’ নয়; বরং ‘এই প্রজন্ম কীভাবে শেখে, এবং তাদের শেখার যাত্রায় আমাদের ভূমিকা কী হবে?’
শিক্ষক এখন জ্ঞানের একমাত্র উৎস নন : একসময় শিক্ষক বলতেন, শিক্ষার্থী শুনতেন। শিক্ষক জানতেন, শিক্ষার্থী জানতেন না। সেই সরল সম্পর্কটি বদলে গেছে। আজকের শিক্ষার্থী শুধু নির্দেশ মেনে নিতে চান না; তিনি জানতে চান,কেন, এর পেছনের যুক্তি কী, প্রমাণ কী এবং বিজ্ঞান কী বলে। এই ‘কেন’-কে অবাধ্যতা ভাবলে নতুন প্রজন্মকে বোঝা যাবে না। প্রশ্নের মধ্যেই আছে শেখার আগ্রহ, বিশ্লেষণী চিন্তা আর নিজের সিদ্ধান্ত যাচাই করার প্রবণতা। গুগল, ইউটিউব বা চ্যাটজিপিটি মুহূর্তে বিপুল তথ্য দিতে পারে। কিন্তু কোন তথ্য নির্ভরযোগ্য, কোন প্রমাণ প্রাসঙ্গিক, কোনটি একজন নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আর কখন বইয়ের জ্ঞানের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ও বিচারবোধ মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে,এসব প্রযুক্তি একা শেখাতে পারে না। এখানেই শিক্ষকের গুরুত্ব কমেনি, বরং বেড়েছে। শুধু ভূমিকা বদলেছে: তথ্যদাতা থেকে চিন্তার পথপ্রদর্শক, বক্তা থেকে সহায়ক, শিক্ষক থেকে মেন্টর।
দুই প্রজন্মের শ্রেণিকক্ষ থেকে আমার শেখা : চকবোর্ডের যুগে পড়িয়েছি, আজ টাচস্ক্রিন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও কাজ করছি। এই অভিজ্ঞতা শিখিয়েছে, শিক্ষকতা কখনো একমুখী নয়। শিক্ষক যেমন শেখান, শিক্ষার্থীর কাছ থেকেও তাঁকে শিখতে হয়। ২০১৮ সালে মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক পদ থেকে অবসরের পর পিজিএস একাডেমিয়ার শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে শল্যচিকিৎসা শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ পেলাম। বুঝলাম, নতুন প্রজন্মের স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণার্থীর জন্য দীর্ঘ বক্তৃতা যথেষ্ট নয়। সেই উপলব্ধি থেকে শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে কেসভিত্তিক আলোচনা, রোগীর পুরো চিকিৎসাযাত্রা অনুসরণ, আত্মমূল্যায়নমূলক শিক্ষা, বহুবিষয়ক আলোচনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা। আমার নিজেরও একটি পরিবর্তন হয়েছে। আগে ভাবতাম, ভালো শিক্ষককে অনেক জানতে হবে এবং ভালোভাবে বলতে হবে। এখন মনে হয়, তার চেয়েও বেশি জানতে হবে,কীভাবে শিক্ষার্থীকে ভাবতে শেখানো যায়।
আরেকটি উপলব্ধি: পরীক্ষায় পাস করাই শেখার শেষ নয়। সনদ হাতে পাওয়ার পরদিনই একজন নবীন সার্জন সব ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য প্রস্তুত হন না। এই উত্তরণের সময় অভিজ্ঞ মেন্টরের পাশে থাকা অত্যন্ত জরুরি। এজন্যই প্রয়োজন ট্রানজিশন টু প্র্যাকটিস, যেখানে তত্ত্বাবধান ও মেন্টরশিপের মাধ্যমে নবীন সার্জনকে নিরাপদ ও আত্মবিশ্বাসী স্বাধীন চিকিৎসাচর্চার দিকে এগিয়ে নেওয়া হয়। শিক্ষকতার এই যাত্রাকে আমি এখন এভাবে দেখি: শিক্ষক → সহায়ক → মেন্টর → তত্ত্বাবধানে উত্তরণ → স্বাধীন পেশাজীবী
টাচস্ক্রিন প্রজন্মকে শেখানোর কয়েকটি ভাবনা : এই প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে বলে আমার মনে হয়েছে।
১. আগে প্রশ্ন, পরে উত্তর। পাঠ শুরু হোক একটি বাস্তব রোগীর সমস্যা দিয়ে, সংজ্ঞা দিয়ে নয়। শিক্ষার্থী আগে নিজে ভাবুক, তারপর শিক্ষক যুক্ত হোন। যে প্রজন্মের হাতে উত্তর সবসময় আছে, তাদের শেখাতে হবে ভালো প্রশ্ন করা।
২. ‘অও-র সঙ্গে বিতর্ক’ অনুশীলন। শিক্ষার্থী কোনো কেসের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরামর্শ নেবেন, তারপর শ্রেণিকক্ষে সেই পরামর্শের ভুল, সীমাবদ্ধতা ও রোগীর নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সঙ্গে অসংগতি খুঁজে বের করবেন। এতে প্রযুক্তির প্রতি অন্ধ আস্থা বা অন্ধ অবিশ্বাস,দুটোই কমে, আর তৈরি হয় যাচাই করার অভ্যাস।
৩. ছোট পরিসর, বারবার ফেরা। এই প্রজন্ম ছোট ছোট খণ্ডে শেখে। দীর্ঘ বক্তৃতার বদলে সংক্ষিপ্ত রেকর্ড করা পাঠ, কেসভিত্তিক মাইক্রো-লার্নিং এবং প্রয়োজনে বারবার দেখার সুযোগ দিতে হবে। এক রাতের ওয়েবিনার শেষ হলেও শেখা যেন শেষ না হয়; পিজিএস একাডেমিয়া অধিবেশনের উপকরণ অনলাইনে সংরক্ষণের উদ্যোগের পেছনে এই ভাবনাই কাজ করেছে।
৪. পর্দার শেখা থেকে রোগীর পাশে শেখা। পর্দা তথ্য দেয়, কিন্তু রোগীর ভয়, দ্বিধা, নীরবতা বোঝা শেখায় না। তাই সিমুলেশন ও ডিজিটাল শেখার পাশাপাশি ওয়ার্ডে, রোগীর বিছানার পাশে সরাসরি শেখার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে রাখতে হবে। যোগাযোগ, সহানুভূতি আর নিরবতার মধ্যে রোগীর কথা শোনা,এগুলো স্ক্রিন থেকে আসে না।
৫. ভুলকে শেখার সুযোগে পরিণত করা। এই প্রজন্মের অনেকেই ভুল করতে ভয় পান,বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে, যেখানে ভুল সহজেই প্রকাশ্যে চলে আসে। তাই প্রয়োজন এমন একটি নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ, যেখানে ভুল লুকানোর পরিবর্তে স্বীকার করা, বিশ্লেষণ করা এবং তা থেকে শেখার সংস্কৃতি থাকবে। মরবিডিটি–মর্টালিটি আলোচনা এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে খোলামেলা আত্মপর্যালোচনা একজন শিক্ষার্থীকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল করে তোলে। একজন শিক্ষক যখন নিজেই বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে আমি ভুল করেছিলাম, এবং সেখান থেকে শিখেছি,’ তখন সেই শিক্ষা অনেক বক্তৃতার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
৬. মনোযোগের যত্ন। নোটিফিকেশনের যুগে একটানা মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। তাই শ্রেণিকক্ষে ও অপারেশন থিয়েটারে নির্দিষ্ট সময় ‘ফোনমুক্ত গভীর মনোযোগ’-এর চর্চা শেখাতে হবে। কঠিন সিদ্ধান্তের জন্য এই ক্ষমতা অপরিহার্য।
৭. নম্বরের বদলে বিচারবোধের মূল্যায়ন। তথ্য এখন সহজেই মুহূর্তের মধ্যে পাওয়া যায়; তাই কতটা মনে রাখা হয়েছে তার চেয়ে, সেই তথ্য কতটা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছে,সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যায়নে হতে হবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যোগাযোগ, দলগত কাজ, পেশাগত আচরণ ও অনিশ্চয়তা সামলানোর ক্ষমতার ওপর।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি শিক্ষককে সরিয়ে দেবে? প্রশ্নটি এভাবে না দেখাই ভালো। বরং দেখা দরকার, শিক্ষক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কতটা সঠিক, নিরাপদ ও নৈতিকভাবে কাজে লাগাতে পারেন। শিক্ষাসামগ্রী তৈরি, কল্পিত রোগীর পরিস্থিতি নির্মাণ, প্রশ্ন তৈরি, প্রতিক্রিয়া ও সিমুলেশনে এর সম্ভাবনা বিপুল। কিন্তু এটি ভুল তথ্য দিতে পারে, পক্ষপাতদুষ্ট উত্তর তৈরি করতে পারে, অস্তিত্বহীন সূত্র উল্লেখ করতে পারে, এমনকি অনুপযুক্ত চিকিৎসা পরামর্শও দিতে পারে। তাই শিক্ষার্থীকে শুধু ব্যবহার নয়, উত্তরকে প্রশ্ন করতে, যাচাই করতে এবং প্রয়োজনে প্রত্যাখ্যান করতেও শেখাতে হবে।
একটি সীমারেখা সবসময় মনে রাখতে হবে: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উত্তর দিতে পারে, কিন্তু দায়িত্ব নিতে পারে না। বিভিন্ন বিকল্প তুলে ধরতে পারে, কিন্তু পেশাগত বিচার-বিবেচনার বিকল্প হতে পারে না। মেন্টরকে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু মেন্টরের বিকল্প হতে পারে না।
প্রযুক্তির চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ: শিক্ষকের নিজের পরিবর্তন- আগামী দিনের শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তি নয়, বরং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতা। কিছু প্রশ্ন আমাদের নিজেদের করতে হবে: আমরা কি শিক্ষার্থীর ‘কেন’ শুনতে প্রস্তুত? আমরা কি বলতে পারি, ‘এর উত্তর আমি এখন নিশ্চিত নই, দেখে বলছি?’ আমরা কি শিক্ষার্থীর কাছ থেকেও শিখতে প্রস্তুত? আমরা কি বক্তৃতা কমিয়ে আলোচনা ও অংশগ্রহণ বাড়াতে পারি? আমরা কি শুধু নম্বর নয়, দক্ষতা, বিচারবোধ, পেশাদারত্ব ও দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতাকেও মূল্যায়নের অংশ করতে পারি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই সম্ভবত আগামী দিনের শিক্ষকের পরিচয় ঠিক করবে।
প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনও জরুরি : ব্যক্তি শিক্ষকের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, প্রতিষ্ঠানকেও এগোতে হবে। মেডিকেল কলেজ ও স্নাতকোত্তর প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপদ ব্যবহারের নীতিমালা দরকার: কোথায় ব্যবহার করা যাবে, কোথায় জানাতে হবে, রোগীর তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, পরীক্ষায় গ্রহণযোগ্য সীমা কোথায়। শিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী উভয়ের জন্য এই বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি মেন্টরশিপকে চিকিৎসা শিক্ষার আনুষ্ঠানিক অংশ করতে হবে, বিশেষ করে স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ থেকে স্বাধীন চিকিৎসাচর্চায় উত্তরণের সময়।
শেষ কথা : প্রযুক্তি বদলাবে, কিন্তু শিক্ষকতার নৈতিক ভিত্তি বদলানো চলবে না। শিক্ষার্থী শিক্ষককে দেখে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞান শেখেন না; শেখেন সততা, বিনয়, রোগীর প্রতি সম্মান, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা এবং ক্ষমতার ন্যায্য ব্যবহার। এ হলো শিক্ষার সেই অদৃশ্য পাঠ্যক্রম, যা কোনো অ্যালগরিদম শেখাতে পারবে না। আগামী দিনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক সম্ভবত তিনি নন, যিনি সবচেয়ে বেশি তথ্য জানেন। বরং তিনি, যিনি শিক্ষার্থীকে চিন্তা করতে শেখান, প্রশ্ন করার সাহস দেন, ভুলের সময় পাশে থাকেন এবং দক্ষ চিকিৎসকের পাশাপাশি নৈতিক, মানবিক ও দায়িত্বশীলমানুষ হয়ে উঠতে পথ দেখান।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষক হারিয়ে যাচ্ছেন না; বদলে যাচ্ছে শিক্ষকতার সংজ্ঞা – শিক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত একজন ভালো মেন্টরই।
শ্রদ্ধা সেই সব শিক্ষকের প্রতি, যাঁরা শুধু পড়ান না, মানুষ তৈরি করেন।
লেখক- অধ্যাপক খন্দকার এ. কে. আজাদ চেয়ারম্যান, পোস্টগ্র্যাজুয়েট সার্জারি একাডেমিয়া, অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), সার্জারি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।

















