চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে ব্যবসাকে শ্বাস নিতে দিতে হবে

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

৬ অক্টোবর, ২০২৬ | ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন শুধু মূল্যস্ফীতির সংকট নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত এবং ব্যবসার টিকে থাকার সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়কে অস্থির করে তুলেছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে,এই বহিরাগত ধাক্কা যখন অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তখন অর্থনীতির উৎপাদনশীল অংশই ক্রমে চাপের নিচে পড়ে যাচ্ছে।
সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ডিজেলের দাম এক ধাপে ১৭.৪ শতাংশ বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা করেছে। এটি চলতি বছরে তৃতীয় দফা জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মার্চ-আগস্ট সময়ে প্রায় ২২৮.৭৬ বিলিয়ন টাকা লোকসানের কথাও সরকার জানিয়েছে। অক্টোবরেও ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা বহাল রয়েছে।

 

সরকারের হিসাবের প্রয়োজন আছে, কিন্তু অর্থনীতিরও একটি হিসাব আছে। ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির মালিকের খরচ বাড়ে না,কারখানার উৎপাদন, পণ্য পরিবহন, কৃষি, খাদ্য, নির্মাণ, বাজারজাতকরণ,সবকিছুর খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত তার বিল আসে সাধারণ মানুষের ঘরে।
আর এখানেই মূল প্রশ্ন; সরকার কি রাজস্ব সংগ্রহের জন্য ব্যবসাকে আরও চাপে ফেলবে, নাকি ব্যবসাকে টিকিয়ে রেখে ভবিষ্যতের রাজস্ব ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে?

 

বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট আমাদের জন্য যথেষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছে। সংস্থাটি ঋণ ২০২৬-এ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৯ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দিয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮.৫ শতাংশে ছিল; ২০২৫ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২১.৪ শতাংশে উঠেছে, যা ২০২২ সালের ১৮.৭ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান উচ্চ নিয়ন্ত্রক ব্যয়, অনির্ভরযোগ্য অবকাঠামো এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন পরিসংখ্যান নয়। এগুলো একই গল্পের বিভিন্ন অধ্যায়। অর্থনীতি যখন ধীর হয়ে যায়, তখন নতুন বিনিয়োগ কমে। বিনিয়োগ কমলে নতুন কারখানা কমে। নতুন কারখানা কমলে চাকরি কমে। চাকরি কমলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে। ক্রয়ক্ষমতা কমলে বাজারে চাহিদা কমে। চাহিদা কমলে ব্যবসার বিক্রি কমে। আর তখন সরকারও কর পায় কম।
অর্থাৎ ব্যবসাকে চাপে ফেলে সরকার শেষ পর্যন্ত নিজের রাজস্বের ভিত্তিকেই দুর্বল করে ফেলতে পারে।

 

বাংলাদেশের আরেকটি বড় দুর্বলতা জ্বালানি। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০ শতাংশের বেশি আমদানি করা এলএনজিনির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে এলএনজি সরবরাহ ও দাম উভয়ই চাপের মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসে ভর্তুকির বোঝাও বেড়েছে। সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, এলএনজির উচ্চমূল্য শিল্প উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে এবং উন্নয়ন কর্মসূচির ওপরও চাপ তৈরি করছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের শিল্পনীতির মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত,কীভাবে উৎপাদন বন্ধ না করে উৎপাদনের খরচ কমানো যায়।
বিশ্বব্যাংকও ‘স্মার্ট ডিরেগুলেশন’, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, বাণিজ্যনীতি সহজীকরণ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের ভাষায়, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা ছাড়া ক্রমবর্ধমান কর্মশক্তির জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়।

 

কিন্তু বাস্তবে আমরা যদি উল্টো পথে হাঁটি, একদিকে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়বে, অন্যদিকে কর, লাইসেন্স, অনুমোদন, পরিদর্শন, কাগজপত্র এবং বিভিন্ন কমপ্লায়েন্সের বোঝা বাড়তেই থাকবে,তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করবে কেন?
ব্যবসা কোনো অপরাধ নয়। উদ্যোক্তার মুনাফাও কোনো অপরাধ নয়। মুনাফাই নতুন বিনিয়োগের মূলধন, নতুন কারখানার ভিত্তি এবং নতুন কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস। ব্যবসা লাভ করতে না পারলে কর্মসংস্থানও টেকসই হয় না।
সরকারের অবশ্যই রাজস্ব দরকার। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার দরকার। করজাল সম্প্রসারণ দরকার। শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ,সবই প্রয়োজন। কিন্তু কমপ্লায়েন্সের উদ্দেশ্য ব্যবসা বন্ধ করা নয়; ব্যবসাকে নিয়মের মধ্যে রেখে টেকসই করা।
তাই এখন বাড়তি বিধিনিষেধ নয় প্রয়োজন বিনিয়োগ সহায়ক ও সহজ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

 

একটি নতুন কারখানা স্থাপন করতে যদি উদ্যোক্তাকে অসংখ্য দপ্তরের দরজায় যেতে হয়, একই তথ্য বারবার দিতে হয় এবং দীর্ঘ অনুমোদন-প্রক্রিয়ার মধ্যে মূলধন আটকে রাখতে হয়, তাহলে সেই প্রশাসনিক ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামেই যোগ হয়। এর একটি অংশ ভোক্তা দেয়, আরেকটি অংশ দেয় শ্রমিক,কারণ ব্যয় বেড়ে গেলে নিয়োগ কমে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সমস্যা হয়তো আজ শুধু মূল্যস্ফীতি নয়। চাকরি সৃষ্টি না হওয়া।
প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সংখ্যাও সামাজিক বাস্তবতাকে আড়াল করতে পারবে না। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছে যে বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত না হলে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি কঠিন হবে।

 

তাহলে সরকারের করণীয় কী?
প্রথমত, জরুরি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে টেম্পোরারি রেগুলেটরি রিলিফ দিতে হবে। নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের কমপ্লায়েন্স হলিডে বা সরলীকৃত কমপ্লায়েন্স রেজিম বিবেচনা করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানি সংকটের বোঝা সবটা ব্যবসা ও ভোক্তার ওপর চাপানো যাবে না। কৌশলগত মজুত, সরবরাহ বৈচিত্র্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির পাশাপাশি শিল্পখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

 

তৃতীয়ত, করহার বাড়ানোর পরিবর্তে ট্যাক্স বেইস বাড়াতে হবে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ঋণ ২০২৫-এ বাংলাদেশের ট্যাক্স-টু-জিডিপি রেশিও ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে,১৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু করের হার নয়; সমস্যা হলো করের ভিত্তি কতটা বিস্তৃত এবং কার্যকর।
চতুর্থত, ব্যাংকিং খাতকে সুস্থ করতে হবে। আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক,উভয়েই বাংলাদেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আইএমএফ বলেছে, ঋণ ২০২৫-এ প্রবৃদ্ধি ৩.৭ শতাংশে নেমে এসেছে এবং দুর্বল রাজস্ব আহরণ ও আর্থিক খাতের ঝুঁকি অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে।
পঞ্চমত, সরকারকে এখন একটি জব ফার্স্ট ইকনোমি পলিসি বিবেচনা করতে হবে। যে বিনিয়োগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, যে শিল্প রপ্তানি বাড়ায়, যে প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরবরাহ-শৃঙ্খল তৈরি করে, সেগুলোকে একইভাবে দেখা যাবে না যে ব্যবসা শুধু কর দেওয়ার আরেকটি উৎস।

 

কারণ শেষ পর্যন্ত সরকার, ব্যবসা ও জনগণ,তিনটি আলাদা দ্বীপ নয়। তারা একই অর্থনৈতিক নৌকার যাত্রী।
আজ ব্যবসা বাঁচলে কাল চাকরি বাঁচবে। চাকরি বাঁচলে মানুষের আয় বাঁচবে। আয় বাঁচলে বাজার বাঁচবে। বাজার বাঁচলে উৎপাদন বাড়বে। উৎপাদন বাড়লে করের ভিত্তি বাড়বে। আর তখনই রাষ্ট্রের রাজস্বও টেকসই হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাও বাংলাদেশের হাতে নেই। কিন্তু এই বহিরাগত ধাক্কার ভেতরে দেশের অর্থনীতিকে কীভাবে পরিচালনা করা হবে, সেটি আমাদের নীতিনির্ধারণের বিষয়।

 

বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো যখন জ্বালানি সংকটে কৌশলগত মজুত ছাড়ছে, সরবরাহ নিশ্চিত করছে এবং শিল্পকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করছে, তখন বাংলাদেশেরও ভাবতে হবে,সংকটের পুরো খরচ কি ভোক্তা ও উদ্যোক্তার ঘাড়ে তুলে দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ? উত্তরটি নিশ্চয়ই এত সরল নয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির এখন সবচেয়ে প্রয়োজন শ্বাস নেওয়ার জায়গা। সরকারের কাজ ব্যবসাকে ছাড় দেওয়া নয়; বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সৎ ব্যবসা টিকে থাকতে পারে, নতুন ব্যবসা গড়ে উঠতে পারে এবং উদ্যোক্তা ভয় না পেয়ে বিনিয়োগ করতে পারেন। কারণ শিল্পায়ন থেমে গেলে শুধু কারখানার চিমনি বন্ধ হয় না, বন্ধ হয় মানুষের ভবিষ্যতের দরজাও। অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে তাই ব্যবসাকে শ্বাস নিতে দিতে হবে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট