বাংলাদেশে শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থানের সংযোগ আরও শক্তিশালী করতে এবং একটি পরীক্ষামূলক দক্ষতা ও কর্মসংস্থান প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চিটাগং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি (সিআইইউ), মালয়েশিয়ার হেল্প ইউনিভার্সিটি এবং ইউসেপ বাংলাদেশ একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাজধানীর ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এইচ চৌধুরী সেন্টারে অনুষ্ঠিত “ক্রিয়েটিং পাথওয়েজ ফর এডুকেশন, স্কিলস অ্যান্ড এমপ্লয়েবিলিটি: আ বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া জয়েন্ট ইনিশিয়েটিভ” শীর্ষক সেমিনারে এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সেমিনারটির যৌথ আয়োজন করে সিআইইউ, হেল্প ইউনিভার্সিটি (মালয়েশিয়া) এবং ইউসেপ বাংলাদেশ।
সমঝোতা অনুযায়ী, তিনটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে একটি পরীক্ষামূলক দক্ষতা ও কর্মসংস্থান প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করবে। পাশাপাশি অ্যাক্রেডিটেশন অব প্রায়র এক্সপেরিয়েন্সিয়াল লার্নিং ফর কোয়ালিফিকেশন (এপিইএল.কিউ), অ্যাক্রেডিটেশন অব প্রায়র এক্সপেরিয়েন্সিয়াল লার্নিং ফর ক্রেডিট অ্যাওয়ার্ড (এপিইএল.সি) এবং রেকগনিশন অব প্রায়র লার্নিং (আরপিএল), মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল এবং মডুলার সার্টিফিকেশন বাস্তবায়নে কাজ করবে।
এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য দক্ষতা সনদ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, শিল্প-সংশ্লিষ্ট সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর শিক্ষা, সনদায়ন ও জনশক্তি উন্নয়ন প্ল্যাটফর্ম তৈরির সম্ভাবনাও অনুসন্ধান করা হবে।
এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো একটি সম্প্রসারণযোগ্য মডেল তৈরি করা, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য জাতীয় পর্যায়ের দক্ষতা, পূর্ব অর্জিত শিক্ষার স্বীকৃতি এবং কর্মসংস্থানভিত্তিক একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম গঠনে সহায়ক হবে।
সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মো. শুহাদা ওসমান। এছাড়া বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিল্পখাতের বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকেরা অংশ নেন।
উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য দেন চিটাগং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং একাডেমিয়া–ইন্ডাস্ট্রি পার্টনারশিপ কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দ মাহমুদুল হক।
এ সময় বক্তব্য দেন ইউসেপ বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. আব্দুল করিম, হেল্প ইউনিভার্সিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও চ্যান্সেলর দাতুক অধ্যাপক ড. পল চ্যান এবং চিটাগং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম নূরুল আবসার। উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান লুৎফি এম আইয়ুব।
সেমিনারে দুটি কারিগরি অধিবেশনে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।
“ফ্রম এডুকেশন টু এমপ্লয়েবিলিটি: অ্যালাইনিং লার্নিং, স্কিলস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি নিডস ইন দ্য এজ অব এআই অ্যান্ড ইমার্জিং টেকনোলজিস” শিরোণামে অনুষ্ঠিত অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হেল্প ইউনিভার্সিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও চ্যান্সেলর দাতুক প্রফেসর ড. পল চ্যান, যেখানে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর শিল্পে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের (বিটিইবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রুহুল আমিন সরকার পরিচালিত সংস্কার কার্যক্রম এবং ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা চালুর উদ্যোগ তুলে ধরেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও এক্সিকিউটিভ প্রোগ্রাম পরিচালক মোহাম্মদ ওয়ালিদ হোসেন শিক্ষা ও কর্মসংস্থান উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, ইউএলকেএসইএমআই-এর প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ এনায়েতুর রহমান সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, এআই-নির্ভর ডিজিটাল অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মশক্তির চাহিদা নিয়ে আলোচনা করেন।
সেমিনারের দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় “হিউম্যান ক্যাপিটাল ইন্টেলিজেন্স, স্কিলস রিকগনিশন অ্যান্ড এমপ্লয়েবিলিটি” শিরোণামে। এতে সভাপতিত্ব করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) ড. মো. নজরুল ইসলাম। মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের সাবেক ডিন এবং ইউনিভার্সিটি অব মালয়ার সাবেক ডিন ড. এ. এস. এম. এ. হাসিব। “ইন্টেলিজেন্ট ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর হিউম্যান ক্যাপিটাল: স্কেলেবল পাথওয়ে টু ওয়ার্কফোর্স ক্যাপাবিলিটি প্ল্যানিং ফর দ্য ফিউচার”শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার জন্য একটি বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক জাতীয় মানবসম্পদ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
এ অধিবেশনের আলোচনায় দাতুক প্রফেসর ড. পল চ্যান মালয়েশিয়ার এপেল-কিউ, এপেল-সি আজীবন শিক্ষা এবং গুণগত মান নিশ্চিতকরণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সিআইইউর স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন প্রফেসর ড. আসিফ ইকবাল কর্মসংস্থানমুখী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা নিয়ে বক্তব্য দেন। এছাড়া জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক জামিল আহমেদ বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতার স্বীকৃতি ও আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
উভয় অধিবেশনেই অংশগ্রহণকারীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং সরকারের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময় সৈয়দ মাহমুদুল হক সেমিনারের সুপারিশসমূহ উপস্থাপন করেন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার রূপরেখা তুলে ধরেন।
সমাপনী অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন দাতুক অধ্যাপক ড. পল চ্যান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোক্তার আহমেদ, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী এবং বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার মো. শুহাদা ওসমান।
সমাপনী বক্তব্য দেন চিটাগাং ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান লুৎফি এম আইয়ুব।
সেমিনারটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং সরকারের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার, ভবিষ্যৎ উপযোগী দক্ষতা অর্জনে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদীয়মান প্রযুক্তি ও পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংলাপের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ভূমিকা রাখে।
পূর্বকোণ/এএইচ















