
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, যোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দিতে পেরে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত এবং গর্বিত। এই সম্মাননার মাধ্যমে সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা ব্যক্তিদের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জাতির প্রতি তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি।
শনিবার বিকেলে নগরীর চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়াম চত্বরে চসিকের উদ্যোগে আয়োজিত “স্বাধীনতা বইমেলা চট্টগ্রাম-২০২৬” এর সমাপনী দিনে স্বাধীনতা পদক-২০২৬ ও সাহিত্য সম্মাননা পদক-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ১৯ দিনব্যাপি স্বাধীনতার বইমেলা।
অনুষ্ঠানে দৈনিক পূর্বকোণ সম্পাদক ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ গুণীজন ও তিন প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পদক-২০২৬ ও সাহিত্য সম্মাননা পদক-২০২৬ প্রদান করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র বলেন, সম্মাননা প্রদানের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে যোগ্যতার ভিত্তিতেই নির্বাচন করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং তাদের অবদানই ছিল প্রধান বিবেচ্য।
ইতিহাস প্রসঙ্গে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ইতিহাসকে বিকৃত করার কোনো সুযোগ নেই। দেশের জন্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের যথাযথ সম্মান দিতে হবে। ইতিহাস তার নিজস্ব ধারায় চলবে এবং ইতিহাসবিদরাই তা সংরক্ষণ করবেন।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির অর্জন শুধু এই অঞ্চলের নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সাতটি বিষয়ে এক্রেডিটেশন অর্জন করেছে এ প্রতিষ্ঠান, যা উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে একটি মাইলফলক। একইসঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য নূর আহমেদ চেয়ারম্যানকে সম্মাননা প্রদানের পেছনের যুক্তিও তুলে ধরেন তিনি। তিনি বলেন, যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া আমাদের একটি দুর্বলতা ছিল, সেখান থেকে বের হয়ে আসতেই আমরা এ উদ্যোগ নিয়েছি।
স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্তদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচন করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা অবদানকে মূল্যায়ন করেছি। মরহুম জননেতা আব্দুল্লাহ আল নোমানকে স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করা হয়।
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের জাতির ভিত্তি। এই ইতিহাসকে কোনোভাবেই বিকৃত বা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি উল্লেখ করেন, শহীদ জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণা, সেক্টরভিত্তিক যুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধে অবদান, সবকিছুই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ সকল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে তাঁদের যথাযথ মর্যাদায় মূল্যায়নের আহ্বান জানান তিনি।
বইমেলার সফল আয়োজন প্রসঙ্গে মেয়র উল্লেখ করেন, এবারের মেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বই বিক্রি হয়েছে, যা পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকাশনা শিল্পকে এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের জন্য একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পেরে সিটি কর্পোরেশন আনন্দিত। ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম ৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এস. এম. নছরুল কদির এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজুর রহমান।
স্বাগত বক্তব্যে চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সভাপতি সাহাব উদ্দিন হাসান বাবু বলেন, এবারের স্বাধীনতা বইমেলায় মানুষের যে জোয়ার ছিল, সেটা অবশ্যই দেখার মত ছিল। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, চট্টগ্রামের সামনে আবারও বিপদ উপস্থিত হয়েছে। হেরিটেজ ঘোষিত সিআরবিকে আবার একটি বেসরকারি হাসপাতালকে দিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। আমরা এই চক্রান্ত অতীতে রোধ করেছি এবারও রোধ করব। চট্টগ্রামের মেয়র সাহেব অত্যন্ত ভালো মানুষ। আমরা আশা করব মেয়র সামনে থাকবেন এবং আমরা সবাই মেয়রের পিছনে থেকে চট্টগ্রামকে রক্ষা করব।
প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এস. এম. নছরুল কদির বলেন, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় পদক না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন উপাচার্য। তিনি বলেন, আমরা আশা করেছিলাম পদক আমরা না পাই, কিন্তু আমাদের নাম বিবেচনায় থাকবে। কিন্তু আমরা পাইনি। মেয়র মহোদয় আপনি জেনে থাকবেন, দেশে প্রথমবার বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিশেন কাউন্সিল কাউন্সিল থেকে ছয়টা প্রোগ্রামের একই সঙ্গে অ্যাক্রেডিটেশন পেয়েছে। যা বাংলাদেশে আর কোন পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ^বিদ্যালয় পায়নি।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, আজ যারা সম্মাননা পাচ্ছেন, তারা প্রত্যেকেই স্বমহিমায় মহিমান্বিত। উনারা নিজে যে অবদানটুকু সমাজে রেখেছেন সেটি পদক অর্জন কিংবা সম্মাননা সনদ পাওয়ার জন্য করেননি। উনারা সমাজকে আলোকিত করেছেন, দেশকে আলোকিত করেছেন। আজ যারা সম্মানিত হবেন তাদের প্রতি আমার বিনীত আবেদন থাকবে, আপনারা যে আলোকবর্তিকা আমাদের দেখিয়েছেন এটা অব্যাহত থাকবে। আপনাদের আলোয় আমরা আলোকিত হব।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান বলেন, চট্টগ্রাম নগরবাসী সৌভাগ্যবান এরকম একজন ডাক্তার শাহাদাত হোসেনের মত একজন মেধাবী ব্যক্তিত্ব পেয়েছেন। মেয়র মহোদয়ের নেতৃত্বে আমরা অত্যন্ত সুন্দরভাবে এগিয়ে চলছি, সামনের দিনগুলো আরো অনেক সুন্দর হবে এটি আজকে এখানে আমি কনফিডেন্টলি বলতে চাই। আজ যারা পুরস্কার পাচ্ছেন, তাদের অবদানে এই দেশ, জাতি ও জনগণ পূর্বের মত উপকৃত হবেন বলে আমি আশা করি।
বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, জানতে পারলাম, বইমেলায় প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরে এই পরিমাণ বই সত্যিই যদি বিক্রি হয়ে থাকে তাহলে আমি বলব শিল্প সংস্কৃতিতে এই শহর সত্যি অনন্য উচ্চতায় উঠে গেছে। আর এই গৌরব আপনাদের সকলের। ঢাকার বাইরে বইমেলা আয়োজন করার মত এই সামর্থ্যটুকু শুধু চট্টগ্রাম দেখাতে পারে। চট্টগ্রামে সত্যি অনেক গুণীজন। মহান স্বাধীনতার অগ্রযাত্রা কিন্তু এই ভূমি থেকেই শুরু হয়েছিল।
অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম ৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, আজ এখানে যাদের সম্মাননা দেয়া হয়েছে প্রত্যেকেই আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তাদের মাধ্যমে আমাদের দেশ আলোকিত হয়েছে, সেবা পেয়েছে। তাদের অনুসরণ করে আরো যাতে আলোকিত মানুষ সৃষ্টি হয়, চট্টগ্রামের অঙ্গন যেন আরো আলোকিত হয় সেই প্রত্যাশা থাকবে আমাদের।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. একরামুল করিম বলেন, সিআরবিতে আবার হাসপাতাল নির্মাণের পায়তারা করা হচ্ছে। এটা আমরা মেনে নিব না। আমরা চট্টগ্রামবাসী সিআরবিকে বাণিজ্যিক জায়গা করতে দিব না।
অধ্যাপক ডা. এম এ ফয়েজ বলেন, আমাদের যাত্রাপথ কিন্তু খুব একটা সহজ ছিল না। কারণ একই সাথে স্বাস্থ্য সেবা প্রদান, স্বাস্থ্য সেবা পেশাজীবীদের শিক্ষা প্রদান এবং গবেষণার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। বিশেষ করে আমাদের মতই সর্বত্রই সম্পদের সীমাবদ্ধতায় কাজ করতে হয়। সর্পদংশন নিয়ে চিকিৎসা প্রতিরোধ বিষয়ে গবেষণায় দেখা যায়, কেবলমাত্র সর্পদংশনেই পৃথিবীতে প্রতি পাঁচ মিনিটে একজন মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৬০০০ থেকে ৭৫০০ এবং গত ৫০ বছরে ৪ লাখের মত মানুষ সর্পদংশনে মারা গেছেন। কিন্তু একজনও মারা যাওয়ার কথা না।
সভাপতির বক্তব্যে চসিকের (ভারপ্রাপ্ত) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আমিন বলেন, আপনারা জানেন, এ বছর ২১ ফেব্রুয়ারি বইমেলাটি আমরা বিভিন্ন কারণে করতে পারিনি। পরবর্তীতে যখন আমরা দেখলাম যে দর্শক এবং প্রকাশকদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। চার-পাঁচদিনের মধ্যে পুরো প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হয়েছে। মেয়র মহোদয়ের দিক নির্দেশনা দূরদর্শিতায় এই স্বাধীনতা বইমেলার আয়োজন করা হয়।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে এবং চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এ বইমেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। পুরো মেলা জুড়ে পাঠক দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। সমাপনী অনুষ্ঠানে পদক প্রদান ছাড়াও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন টিভি ও বেতারের উপস্থাপিকা নাহিদা নাজু, চসিক স্কুলের শিক্ষিকা রুমিলা বড়ুয়া ও কংকন দাস।
সম্মাননা পেলেন যারা: এবার স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননার জন্য মোট ১৩ ব্যক্তি ও তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত করা হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদানের জন্য প্রয়াত রাজনীতিবিদ আবদুল্লাহ আলম নোমান (মরণোত্তর), মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. একরামুল করিম, শিক্ষাক্ষেত্রে চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নূর আহমদ চেয়ারম্যান (মরণোত্তর), চিকিৎসা ক্ষেত্রে ডা. এম. এ. ফয়েজ এবং সাংবাদিকতায় দৈনিক পূর্বকোণের সম্পাদক ডা. ম. রমিজ উদ্দিন চৌধুরী সম্মাননায় ভূষিত হন।
এছাড়া ক্রীড়াক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান, সমাজসেবায় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, স্বাস্থ্যসেবায় চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস), সঙ্গীতে শিল্পী আবদুল মান্নান রানা এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অবদানের জন্য শিল্পী বুলবুল আকতার স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননা লাভ করেন।
অন্যদিকে সাহিত্য সম্মাননা পদকের জন্য গীতিকবিতায় ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, শিশু সাহিত্যে সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার, প্রবন্ধ ও গবেষণায় হারুন রশীদ, কবিতায় শাহিদ হাসান এবং কথাসাহিত্যে জাহেদ মোতালেবকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
পূর্বকোণ/সিজান/পারভেজ