চট্টগ্রাম শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬

নির্বাকের মুখে খই ফোটান তারা

সাহিক চট্টগ্রাম উপকেন্দ্র

ইমাম হোসাইন রাজু

১৮ এপ্রিল, ২০২৬ | ১১:৫৩ পূর্বাহ্ণ

নাদিমুল হোসাইন নাদমান। বয়স মাত্র চার বছরের কিছু বেশি। দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট সে। হাসিখুশি স্বভাবের নাদমান যখন তিন বছরে পা দেয়, তখনো তার মুখে কোনো শব্দ শোনা যায়নি। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে মা জেসমিন আক্তারের।

 

কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বড় ছেলের কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু ছোট ছেলে বয়স বাড়লেও কথা বলে না! চিন্তায় ছিলাম সবসময়’। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের পরামর্শে নাদমানকে নিয়ে আসেন নগরীর খুলশী এলাকায় অবস্থিত ‘সোসাইটি ফর অ্যাসিস্ট্যান্স টু হিয়ারিং ইম্পেয়ার্ড চিলড্রেন’ (সাহিক)-এ। সাত মাস ধরে নিয়মিত স্পিচ থেরাপি ও ক্লাস করছে নাদমান। এখন সেই নাদমানই মাকে ডাকে। টুকটাক এটা সেটা উচ্চারণ করে। তাই দেখে মা জেসমিন আক্তারের চোখে মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির ছাপ। সাহিকের বারান্দায় বসে ছেলের সাথে খেলার ফাঁকে জেসমিন বলেন, ‘এখন যখন ‘মা’ ডাক শুনি, মনে হয় সব কষ্ট শেষ হয়ে গেছে।’

 

একই রকম গল্প সীতাকুন্ড থেকে আসা তিন বছরের আনাবিয়া ফালাকের। জন্মের পর থেকেই তার কথা বলার সমস্যা ছিল। একমাত্র সন্তানের মুখে ‘বাবা’ ডাক শোনার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন বাবা মোস্তফা, যিনি কৃষিকাজ করেন। ফালাকের ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্ট করা হয় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)। এরপর গত এক বছর ধরে সাহিকে নিয়মিত স্পিচ থেরাপি নিচ্ছে সে। এখন ধীরে ধীরে কথা বলতে শিখছে ফালাকও।

 

সাহিকের ক্লাস রুমে বসে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বাবা মোস্তফা বলেন, ‘ভাবতাম কোনোদিন বাবা ডাক শুনতে পারবো না। এখন আমার মেয়ে আমাকে ডাকতে পারে, এর চেয়ে বড় সুখ আর কী হতে পারে!

 

এমন শত শত গল্প তৈরি হচ্ছে চট্টগ্রামের সাহিক উপকেন্দ্রে। নীরবে বিশেষায়িত চিকিৎসা ও শিক্ষাসেবা দিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। কানের জটিল সমস্যা, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা এবং বাকপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য এটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। নগরীর খুলশীর ওয়ারলেস এলাকায় অবস্থিত সুশৃঙ্খল ক্যাম্পাসে রয়েছে হাসপাতাল, প্রাক-বিদ্যালয় এবং স্পিচ থেরাপি সেবা।

 

সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রামের বাইরে বিভিন্ন উপজেলা থেকেও প্রতিদিন রোগীরা আসছেন এখানে। ফালাকের মতো অনেক শিশুকেই সীতাকুন্ডসহ দূরবর্তী এলাকা থেকে নিয়মিত আসতে হচ্ছে থেরাপির জন্য। স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা সেবাও প্রদান করা হয় এখানে।

 

জানা যায়, ১৯৯২ সালে নগরীর নাসিরাবাদ এলাকায় ছোট্ট পরিসরে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ১৯৯৯ সালে নিজস্ব ভবনে কার্যক্রম শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি এখন নীরবে কাজ করে যাচ্ছে। যেখানে বর্তমানে রয়েছে আধুনিক অডিওলজি ল্যাব, স্পিচ থেরাপি বিভাগ, প্রাক-বিদ্যালয় এবং নাক-কান-গলা রোগের চিকিৎসা সুবিধাসহ অপারেশন থিয়েটার এবং প্রশিক্ষিত থেরাপিস্ট দল।

 

প্রতিষ্ঠানটির সেবা কার্যক্রমের তথ্য অনুসারে, গত দুই দশকেরও বেশি সময়ে চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকার বিপুল সংখ্যক মানুষ এখানে চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০০১ সাল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭৩৫ জন রোগী নাক-কান-গলা বিভাগের বহির্বিভাগ  থেকে সেবা নিয়েছেন। একই সময়ে ৪১ হাজার ৩২২ জন রোগীর শ্রবণশক্তি পরীক্ষা করা হয়েছে। অন্যদিকে- ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ১১৩টি অপারেশন হয়েছে কেন্দ্রটিতে।

 

সাহিক চট্টগ্রাম উপকেন্দ্রের এসোসিয়েট কনসালটেন্ট ডা. সুমন তালুকদার বলেন, অনেক রোগী দীর্ঘদিন অবহেলায় থেকে পরে জটিল অবস্থায় আসেন। অথচ সময়মতো চিকিৎসা নিলে বেশিরভাগ সমস্যাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এখানে আমরা সুলভ মূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিচ্ছি।

 

শুধু চিকিৎসাই নয়, বাকপ্রতিবন্ধী শিশুদের কথা বলার সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রতিষ্ঠানটি। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১২ সাল থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চার হাজার ২৬৮ জন রোগী স্পিচ থেরাপি সেবা গ্রহণ করেছেন। পাশাপাশি ২০০১ সাল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এক হাজার ২২৬ জন শিশু বিশেষ শিক্ষাক্রমের আওতায় এসেছে, যেখানে তাদের ভাষা  শেখানো ও মূলধারার শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তুতি দেওয়া হয়।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের পরপরই শ্রবণ পরীক্ষা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং দ্রæত চিকিৎসা- এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে অনেক শিশুকেই প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকি থেকে বাঁচানো সম্ভব।

 

সাহিক চট্টগ্রাম উপকেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল আলীম বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৬ বছর বয়স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে শ্রবণ সমস্যা শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিলে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা দেরিতে বুঝতে পারেন। তখন চিকিৎসা জটিল হয়ে যায়। কিন্তু সময়মতো স্পিচ থেরাপি, শ্রুতিযন্ত্র বা ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্ট করলে শিশুরা অন্যদের মতোই কথা বলতে ও পড়াশোনা করতে পারে।

 

কথা প্রসঙ্গে ডা. আব্দুল আলীম বলেন, সীমিত সম্পদ নিয়ে সূচনা করা এ যাত্রা আজ একটি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে। তবে এতে আমরা সন্তুষ্ট নই, আমাদের আরও অনেক পথ এগোতে হবে। সমাজের সহযোগিতা, সরকারি সমর্থন এবং আমাদের সাহিকের অঙ্গীকার- এই তিনটির সমন্বয়েই শ্রবণপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য একটি উচ্চল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব। সকলের সহযোগিতায় সাহিক চট্টগ্রাম উপকেন্দ্রের এই অগ্রযাত্রা আরও গতিশীল হবে এটি আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট