চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৩ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

ব্লু ইকোনমি আর পর্যটনের হাতছানি

মোহাম্মদ আলী

১৫ মে, ২০২৬ | ১২:২০ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের একমাত্র দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ। প্রায় তিন হাজার বছরের অধিককাল ধরে মানুষের বসতি ছিল এ দ্বীপে। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক জনপদ। যা মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। চট্টগ্রাম উপকূল ও সন্দ্বীপের মাঝখানে সন্দ্বীপ চ্যানেল অবস্থিত।
একসময় দীপাঞ্চল সন্দ্বীপ মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরের ভয়াবহ ভাঙনের শিকার হলে এখন তা অনেকটা কমে গেছে। উল্টো জেগে উঠেছে সবুজ চর, জাহাজ্জ্যা চর, ভাসানচর, ঠেঙ্গার চর, সুবর্ণচরসহ অসংখ্য চর। অপার সম্ভাবনাময় এ দ্বীপের বাসিন্দারা দেশের রেমিটেন্সে বিশাল অবদান রেখে আসলেও এখনো অবহেলিত দ্বীপের যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। পর্যটনশিল্পে পরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ করলে এ দ্বীপ অর্থনৈতিকভাবে জাগাতে পারে বিশাল এক সম্ভাবনা।
তেমনিভাবে সরকারিভাবে উদ্যোগ নিলে জাহাজ নির্মাণশিল্প, লবণশিল্প, নৌবন্দর, কৃষি, মৎস্যসহ বিভিন্ন খাতেও রয়েছে অপার সম্ভাবনা।
সন্দ্বীপের আলোচিত এসব বিষয় নিয়ে সম্প্রতি দৈনিক পূর্বকোণে আয়োজন করা হয় ‘স্বনির্ভর সন্দ্বীপ : চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনা। সাংবাদিক মোহাম্মদ আলীর সঞ্চালনায় পূর্বকোণ সেন্টারের ইউসুফ চৌধুরী কনফারেন্স হলে আয়োজিত আলোচনায় দ্বীপকন্যা সন্দ্বীপের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন আলোচকগণ। উঠে আসে সম্ভাবনার কথাও। তারা বলেন, পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় সন্দ্বীপ মালদ্বীপ, থাইল্যান্ডের পাতাইয়ার মতো পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলে সন্দ্বীপ হবে পর্যটনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা।
আলোচনায় অংশ নেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম উত্তর জেলার আমির আলাউদ্দিন শিকদার, উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ডেপুটি ডাইরেক্টর ও সন্দ্বীপ সমিতি চট্টগ্রামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন, গণমাধ্যমকর্মী সাংবাদিক সুজিত চন্দ্র সাহা, গণঅধিকার পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির নারী বিষয়ক সহ-সম্পাদক নাসরিন আক্তার ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের শাহজালাল হলের ভিপি আলাউদ্দিন।
জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম উত্তর জেলার আমির আলাউদ্দিন শিকদার বলেন, সন্দ্বীপের অন্যতম সমস্যা নৌ-যাতায়াত। অন্তর্বর্তী সরকার সন্দ্বীপে নৌবন্দর ঘোষণা এবং ফেরি সার্ভিস চালু করেছে। তাতে আমরা কিছুটা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি। কিন্তু মে, জুন ও জুলাই মাসে যখন সাগর উত্তাল থাকে, তখন সংকট সৃষ্টি হয়। এজন্য কোস্টাল ফেরি সার্ভিস চালুর করার দাবি ওঠেছে। সন্ধ্যার পর রোগী কিংবা জরুরি যাতায়াতের জন্য ২৪ ঘণ্টা ফেরি চলাচল করা প্রয়োজন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জটিল কোন রোগীর চিকিৎসা হয় না, প্রাথমিক ট্রিটমেন্ট হয়। সরকারি হাসপাতালে জনবলের অভাব রয়েছে। অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান বা চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। সরকার যদি পর্যটন এরিয়া ঘোষণা করে তাহলে বিশাল কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। একই সাথে ব্লু ইকোনমি যথাযথ কাজে লাগাতে হবে। অধিকাংশ খাল ভরাট হয়ে গেছে। তাতে পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হওয়ায় জলাবদ্ধতা হয়। জাতীয় অর্থনীতিতে সন্দ্বীপের ভূমিকা বিশাল। রেমিটেন্সের প্রায় ১১% পাঠায় সন্দ্বীপের প্রবাসীরা।
উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক এবং সন্দ্বীপ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, সাগরের ভাঙনে মানুষের বাপ-দাদার ভিটে মাটি বিলীন হয়ে গেছে। এখন পুনরায় জেগে উঠেছে। জাহাজ্জ্যের চর, ভাসানচর, স্বর্ণদ্বীপ, ঠেঙ্গার চর- এগুলো সন্দ্বীপের সাথে সম্পৃক্ত হলে সন্দ্বীপ হবে ১০০৪ বর্গ মাইলের একটা বিশাল দ্বীপ। মালদ্বীপ, থাইল্যান্ডের পাতাইয়ার মতো সন্দ্বীপকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলে সন্দ্বীপ হবে পর্যটনের স্বর্ণখনি। মাদকে সয়লাবের কারণে সন্দ্বীপের যুবসমাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই যুব সমাজকে রক্ষা করার জন্য সব রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সন্দ্বীপের ফেরিঘাটকে আরো উন্নত করতে হবে। কোস্টাল ফেরি চালু করলে সন্দ্বীপবাসী উপকৃত হবে। নৌবন্দর ঘোষণা করা হয়েছে সন্দ্বীপকে। কার্যকরী নৌবন্দর চালু এবং সেখানে বড় বড় জাহাজ ভেড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। জাহাজ নির্মাণ শিল্প সন্দ্বীপে চালু করার যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের ডেপুটি ডাইরেক্টর ও সন্দ্বীপ সমিতি চট্টগ্রামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন বলেন, প্রায় তিন হাজার বছরের পুরানো দ্বীপ সন্দ্বীপে জনবসতি শুরু হয়েছে। অনেক বড় বড় মনীষী জন্মগ্রহণ করেছেন এই সন্দ্বীপে। দুঃখজনক হলো- সন্দ্বীপে নদী ভাঙতে ভাঙতে এখন এক-চতুর্থাংশে এসে কি দাঁড়িয়েছে। ২০০৭ সালের পর থেকে সন্দ্বীপের পশ্চিম দিকে যে অঞ্চলটা সবচাইতে বেশি ভাঙন কবলিত হয়েছে সেদিকে চর জেগে ওঠা শুরু করেছে। পরবর্তী সময়ে সন্দ্বীপের পশ্চিম দিকে যেগুলো গত ৫০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে ভেঙে গেছে সেগুলো আস্তে আস্তে চর জেগে ওঠা শুরু করেছে।
গণমাধ্যমকর্মী সাংবাদিক সুজিত চন্দ্র সাহা বলেন, এ দ্বীপে আরব, পর্তুগিজ, ব্রিটিশ যারা এসেছেন তারা প্রথমে পা ফেলেছে সন্দ্বীপে। তাই সন্দ্বীপ আগে থেকে যেভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে হয়নি। ১৫ কিলোমিটারের সন্দ্বীপের মানুষ খুবই অবহেলিত। কিন্তু এখানকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বা অবদান সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সংকটগুলোর জন্য মানুষের উদাসীনতা অবশ্যই আছে। সন্দ্বীপের মানুষ মনে করে এটা তাদের নিয়তি। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে- সন্দ্বীপে রাজনৈতিক দলগুলো ফাংশনিং না। অতীতে দেখা গেছে-যারাই ক্ষমতায় যায়, তারা ছাড়া অন্যরা সেখানে কথা বলতে পারে না। ফলে এখানে কোন মত- চিন্তার বিকাশ ঘটে না। সন্দ্বীপের যাতায়াত, শিক্ষা, চিকিৎসা- এই তিন মেজর সমস্যা।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের শাহজালাল হলের ভিপি আলাউদ্দিন বলেন, সন্দ্বীপে প্রায় ১৫০টির মত প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য মাদ্রাসা। ২৮টা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ৭টা কলেজ রয়েছে। তবে কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ঠিক থাকলেও অনার্স লেভেলে মাত্র দুইটা কোর্স রয়েছে। একটা হচ্ছে হাজি আব্দুল বাতেন কলেজে বাংলা বিভাগ এবং মোস্তাফিজুর রহমান ডিগ্রি কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগ। অনার্সে পর্যাপ্ত কোর্স চালু না থাকাতে বেশিরভাগ সাফার করছে নারী শিক্ষার্থীরা। সাত কলেজে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে কয়েকটা করে অনার্স কোর্স চালু করা হলে সন্দ্বীপের মানুষ উপকৃত হতো।
গণঅধিকার পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির নারী বিষয়ক সহ-সম্পাদক নাসরিন আক্তার বলেন, সন্দ্বীপের নারীরা পিছিয়ে যাচ্ছে। এর একটা কারণ হচ্ছে তারা আসলে কমফোর্ট ফিল করে না। সমাজের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে না। যার কারণে আমাদের এই বিষয়গুলো নিয়ে কনসার্ন হওয়া জরুরি। সন্দ্বীপে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক লেভেলে বিজ্ঞান ও মানবিক বিষয়ে শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। এ দুইটি বিভাগ নিয়ে জোর দিতে হবে। তবে বাণিজ্য বিভাগে শিক্ষক মোটামুটি রয়েছে।

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন