অস্ট্রেলিয়ায় শুরু হওয়া ওলবাকিয়া পদ্ধতি ডেঙ্গু প্রতিরোধে নতুন সম্ভাবনা দেখিয়েছে। বাংলাদেশেও এর সুফল পেতে প্রয়োজন স্থানীয় গবেষণা, জনসম্পৃক্ততা এবং ফলাফলভিত্তিক বাস্তবায়ন। ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে আবার মশা ছাড়তে হবে-কথাটি প্রথমে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু এই ধারণা নিয়েই অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে শুরু হয়েছিল একটি গবেষণা। উদ্দেশ্য ছিল, মশার শরীরে এমন একটি ব্যাকটেরিয়া প্রতিষ্ঠা করা, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করবে। সেই ব্যাকটেরিয়ার নাম ওলবাকিয়া। বাংলাদেশে প্রতিবছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু, হাসপাতালে রোগীর চাপ এবং পরিবারের চিকিৎসাব্যয়ের প্রেক্ষাপটে এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। তবে বিদেশের সাফল্যের উদাহরণ দেখেই মশা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন বাংলাদেশের পরিবেশে কার্যকারিতা যাচাই এবং একটি জবাবদিহিমূলক কর্মসূচি।
কুইন্সল্যান্ডে যেভাবে শুরু: অধ্যাপক স্কট ও’নিলের নেতৃত্বে গবেষকেরা ফলের মাছি থেকে ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস ইজিপ্টাই মশায় স্থানান্তর করেন। গবেষণাগারে তাঁরা দেখতে পান, ওলবাকিয়ার একটি ধরন-ডব্লিউমেল-মশার মধ্যে ডেঙ্গু ভাইরাসের সংক্রমণ ও বিস্তারের সক্ষমতা কমাতে পারে। গবেষণা, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আলোচনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের পর ২০১১ সালের জানুয়ারিতে কুইন্সল্যান্ডের কেয়ার্নসের কাছে গর্ডনভেল ও ইয়র্কিস নব এলাকায় প্রথম মশা ছাড়া হয়। কয়েক মাসের মধ্যে স্থানীয় মশার বড় অংশে ওলবাকিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘এলিমিনেট ডেঙ্গু’ নামে শুরু হওয়া উদ্যোগটি পরে ওয়ার্ল্ড মসকুইটো প্রোগ্রাম হিসেবে পরিচিতি পায়। উত্তর কুইন্সল্যান্ডে পরবর্তী গবেষণায় ওলবাকিয়া প্রতিষ্ঠিত এলাকাগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ প্রায় ৯৬ শতাংশ কমার হিসাব পাওয়া যায়। তবে একে সম্পূর্ণ নির্ম‚ল বলা যাবে না। টাউনসভিলে ২০২৪-২৫ সালের বর্ষা মৌসুমে স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত ১৬ জন রোগী শনাক্ত হন। সাফল্যের পরও নজরদারি প্রয়োজন-এ ঘটনা তার প্রমাণ।
ওলবাকিয়া কীভাবে কাজ করে: ওলবাকিয়া বহু প্রজাতির কীটপতঙ্গের কোষে স্বাভাবিকভাবে বসবাসকারী ব্যাকটেরিয়া। এটি বহনকারী এডিস মশার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানোর পর সেই মশার মাধ্যমে অন্য মানুষের কাছে ভাইরাস পৌঁছানোর সম্ভাবনা কমে।
স্ত্রী মশা ডিমের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মে ওলবাকিয়া পৌঁছে দেয়। এ কারণে স্থানীয় মশার মধ্যে এটি ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকতে পারে। এই পদ্ধতির লক্ষ্য মশার সংখ্যা কমানো নয়; মশার ডেঙ্গু ছড়ানোর সক্ষমতা কমানো। গবেষণাগারে প্রথমে অতি সূক্ষ সুচের সাহায্যে মশার ডিমে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করানো হয়। সফলভাবে ওলবাকিয়া বহনকারী মশার বংশধারা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সাধারণ প্রজননের মাধ্যমেই তাদের সংখ্যা বাড়ানো যায়। প্রতিটি নতুন ডিমে আলাদা করে ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করাতে হয় না।
বাংলাদেশের জন্য আশার ভিত্তি : বাংলাদেশের মতো ডেঙ্গুপ্রবণ দেশের ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। ইয়োগিয়াকার্তায় পরিচালিত একটি নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় ওলবাকিয়া প্রয়োগ করা এলাকায় উপসর্গযুক্ত, পরীক্ষায় নিশ্চিত ডেঙ্গু প্রায় ৭৭ শতাংশ এবং ডেঙ্গুজনিত হাসপাতালে ভর্তি প্রায় ৮৬ শতাংশ কম পাওয়া যায়। চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসের বিরুদ্ধেই কাছাকাছি সুরক্ষা দেখা যায়। তবে বাংলাদেশে একই মাত্রার ফল হবে-এ নিশ্চয়তা এই গবেষণা দেয় না।
বাংলাদেশে প্রয়োজনের মাত্রা বড়। জাতীয় তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, ২০২৫ সালে দেশে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১টি ডেঙ্গু রোগীর হিসাব এবং ৪১৩টি মৃত্যু নথিভুক্ত হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড্যাশবোর্ডে ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত রোগীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৪৮ এবং মৃত্যু ৩৮৪। অর্থাৎ বছর শেষ হওয়ার আগেই আগের বছরের মোট রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে। এসব মূলত হাসপাতালভিত্তিক নজরদারিতে নথিভুক্ত তথ্য; সমাজের সব সংক্রমণের হিসাব নয়।
শুরু করতে হবে পরিকল্পিত পাইলট দিয়ে : বাংলাদেশের জন্য প্রস্তাব হতে পারে-স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইইডিসিআর, সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বে একটি পর্যায়ক্রমিক পাইলট কর্মসূচি। প্রথমে রোগীর অবস্থানভিত্তিক তথ্য ও মশার জরিপ ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক এলাকা নির্বাচন করতে হবে। শুধু প্রশাসনিক সুবিধার কারণে কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ওয়ার্ড বেছে নিলে চলবে না। এলাকার আয়তন, মানুষের যাতায়াত, আশপাশের সংক্রমণ এবং মাঠপর্যায়ে কাজ করার সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে। এরপর স্থানীয় মশার সঙ্গে উপযোগী ওলবাকিয়াবাহী বংশধারা তৈরি ও পরীক্ষা প্রয়োজন। বাংলাদেশের তাপমাত্রা, মৌসুমি পরিবর্তন এবং বিদ্যমান মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের মধ্যে ব্যাকটেরিয়াটি কতটা স্থিতিশীল থাকে, তা যাচাই করতে হবে। বিদেশে ব্যবহৃত বংশধারা এখানে একইভাবে কাজ করবে এমন অনুমান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজনীয় জাতীয় অনুমোদন, পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং গবেষণার নৈতিক পর্যালোচনা সম্পন্ন করেই মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করা উচিত।
মানুষের আস্থা ছাড়া সম্ভব নয়: মশা ছাড়ার খবর মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তাই কর্মসূচির শুরু থেকেই বাসিন্দাদের বোঝাতে হবে-কেন মশা ছাড়া হচ্ছে, কী ফল আশা করা হচ্ছে এবং সীমাবদ্ধতা কোথায়। ওলবাকিয়াবাহী স্ত্রী মশাও কামড়াতে পারে; লক্ষ্য হচ্ছে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় চিকিৎসক, জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটি সংগঠনকে আলোচনায় রাখতে হবে। অভিযোগ জানানো, প্রশ্নের উত্তর পাওয়া এবং পর্যবেক্ষণের ফল দেখার সহজ ব্যবস্থা থাকা দরকার। জনগণকে কেবল কর্মসূচির গ্রহীতা হিসেবে দেখলে চলবে না; তাঁদের অংশীদার করতে হবে।
সাফল্যের মাপকাঠি হবে রোগী কমা: কত লাখ মশা ছাড়া হলো, সেটি কার্যক্রমের হিসাব। জনস্বাস্থ্যের সাফল্য জানতে দেখতে হবে-ডেঙ্গু রোগী ও হাসপাতালে ভর্তি কমল কি না। সে জন্য মশার মধ্যে ওলবাকিয়ার উপস্থিতি পরীক্ষার পাশাপাশি তুলনাযোগ্য এলাকায় ডেঙ্গুর প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বৃষ্টিপাত, মৌসুমি ওঠানামা এবং অন্য নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে একাধিক মৌসুমের ফল মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। ফলাফল স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা ও প্রকাশ করতে হবে। বাজেটেও শুধু মশা উৎপাদন ও ছাড়ার ব্যয় রাখলে হবে না। পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষিত জনবল, জনসম্পৃক্ততা, মান যাচাই এবং দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির অর্থ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয়ভাবে স্থিতিশীল ফল পাওয়া গেলে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
সম্ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতাও জরুরি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৬ সালের জুনে জানিয়েছে, ওলবাকিয়া পদ্ধতির হালনাগাদ প্রমাণ পর্যালোচনা চলছে। সংস্থাটি ২০২৭ সালের শেষভাগে সুপারিশ প্রকাশের সম্ভাব্য সময় জানিয়েছে; তা পর্যালোচনা ও অনুমোদনপ্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। ফলে একে ইতিমধ্যে চুড়ান্ত বৈশ্বিক সুপারিশপ্রাপ্ত পদ্ধতি হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। ওলবাকিয়া প্রয়োগের পাশাপাশি জমে থাকা পানির পাত্র অপসারণ, নিয়মিত মশার নজরদারি, উপযুক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং রোগীর দ্রæত চিকিৎসা চালু রাখতে হবে। এটি চলমান প্রাদুর্ভাব থামানোর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নয়; দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ প্রতিরোধের একটি সম্ভাবনাময় উপায়।
কুইন্সল্যান্ডের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে একটি কার্যকর গবেষণাপথ দেখায়। এখন প্রয়োজন সেই অভিজ্ঞতা থেকে শেখা, স্থানীয় প্রমাণ তৈরি করা এবং ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। ডেঙ্গু প্রতিরোধে নতুন প্রযুক্তির মূল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন তা মানুষের অসুস্থতা, হাসপাতালে ভর্তি এবং পরিবারের দুর্ভোগ কমাতে পারবে।
একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানাই, যাতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ওলবাকিয়া পদ্ধতির সম্ভাবনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইইডিসিআর, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ওয়ার্ল্ড মসকুইটো প্রোগ্রামসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন, বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে চট্টগ্রামে একটি পরিকল্পিত পাইলট কর্মসূচি গ্রহণের সম্ভাবনাও যাচাই করা উচিত।
চট্টগ্রামের ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকাগুলোতে এমন উদ্যোগ নেওয়া গেলে স্থানীয় পরিবেশে পদ্ধতিটির কার্যকারিতা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যাবে। পাশাপাশি জনগণকে সম্পৃক্ত করে নিয়মিত নজরদারি ও ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে কর্মসূচির প্রতি আস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। পাইলটের ফল সন্তোষজনক হলে সেই অভিজ্ঞতা দেশের অন্যান্য ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভিত্তি হতে পারে।
আমরা আশা করি, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সবাই একসঙ্গে কাজ করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের পথ তৈরি করবেন। এর উদ্দেশ্য হবে চট্টগ্রামবাসীর ডেঙ্গুতে অসুস্থতা ও দুর্ভোগ কমানো এবং বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়তা করা।
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী নভার্সিটি, কানাডা।
পূর্বকোণ/মিফতা


















