বিংশ শতকের প্রথমার্ধে চট্টগ্রামের রাউজান থানাধীন নোয়াজিশপুর ছিল যোগাযোগ ও শিক্ষার সুযোগে পিছিয়ে থাকা একটি গ্রাম। গ্রীষ্মকালে মেঠোপথ এবং বর্ষাকালে নৌকাই ছিল মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা। সেই গ্রাম থেকে উঠে আসা একজন মানুষ উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষা সম্পন্ন করতে না পেরেও নিজের অধ্যবসায়, অনুসন্ধিৎসা ও মৌলিক গবেষণার মাধ্যমে দেশের ইতিহাসচর্চায় স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তিনি চট্টলতত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরী।
১৯২২ সালের ২৪ আগস্ট নোয়াজিশপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। তিনি রাউজান উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। উনার পিতার নাম ছিলেন জনাব সরফুদ্দীন, পেশায় ছিলেন ইনজিনিয়ার। তিনি তৎকালীন রেংগুন পোর্ট কমিশনে কর্মরত ছিলেন। ১৯৪০ সালে পিতার মৃত্যুর পর পারিবারিক দায়িত্ব ও সম্পত্তিসংক্রান্ত জটিলতায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ থেমে যায়। কিন্তু থামেনি জানার আগ্রহ। বিদ্যালয়ের পাঠাগার, পুরোনো বই ও পত্রপত্রিকা হয়ে ওঠে তাঁর স্বশিক্ষার অবলম্বন। ১৯৪২ সালে পিতার প্রতিষ্ঠিত নোয়াজিশপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষার মূল্য কেবল সনদে নির্ধারিত হয় না। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো তাঁরও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অসম্পূর্ণ ছিল; তবু নিজের সাধনার মাধ্যমে তিনি জ্ঞানের পরিসর বিস্তৃত করেছেন। বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করতে না পারার সীমাবদ্ধতাকে তিনি আজীবন শেখার পথে বাধা হতে দেননি। তাঁর গবেষণাজীবনে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের সান্নিধ্য বিশেষ ভূমিকা রাখে। ১৯৪৩ সালে পত্রযোগে পরিচয় এবং পরবর্তী সময়ে সাক্ষাতের মাধ্যমে তিনি সাহিত্যবিশারদের কাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন। পুরোনো পুঁথি ও ঐতিহাসিক উপাদান সংগ্রহের আগ্রহ ক্রমে তাঁকে সমাজ, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক ইতিহাসের অনুসন্ধানে নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ড. আহমদ শরীফের উৎসাহ তাঁর সংগৃহীত তথ্য প্রকাশের পথ খুলে দেয়।
আবদুল হক চৌধুরীর ইতিহাসসাধনার সবচেয়ে স্মরণীয় দিক ছিল মানুষের কাছে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা। তিনি গ্রামের প্রবীণ নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলতেন, পুরোনো দিনের ঘটনা শুনতেন এবং স্থানীয় নিদর্শন সম্পর্কে খোঁজ নিতেন। রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ির বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে তিনি ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করেছেন। তাঁর অনুসন্ধানের পরিসর চট্টগ্রামের বাইরেও সিলেট, আরাকান ও ত্রিপুরা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে অতীতের তথ্য সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করার এই শ্রমের জন্য বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁর কাছে ঋণী থাকবে। মানুষের স্মৃতি সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যায়; একটি পুরোনো পরিবারের কাহিনি, একটি গ্রামের পরিচয় কিংবা কোনো সামাজিক প্রথার বিবরণ লিখে রাখা না হলে একসময় তা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর কাজের মূল্য এখানেই স্থানীয় জীবনের উপাদানকে তিনি গবেষণার বিষয় হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের ইতিহাস প্রসঙ্গ, চট্টগ্রামের চরিতাভিধান, চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতি, সিলেটের ইতিহাস প্রসঙ্গ, শহর চট্টগ্রামের ইতিকথা, চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা, চট্টগ্রাম–আরাকান এবং বন্দর শহর চট্টগ্রাম। এসব রচনায় আঞ্চলিক ইতিহাসের পাশাপাশি মানুষের সামাজিক জীবন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় উঠে এসেছে। তাঁর চট্টগ্রামের ইতিহাস প্রসঙ্গ ও চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিল।
একজন মানুষ নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাননি, অথচ তাঁর গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের পাঠের উপকরণ হয়েছে এটি অসাধারণ অর্জন। নোয়াজিশপুরের মতো একটি গ্রাম থেকে উঠে এসে তিনি যে জ্ঞানের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা আমাদের অঞ্চলের গর্ব।
তাঁর গবেষণাকর্ম বিভিন্ন পর্যায়ে সম্মানিত হয়েছে। ১৯৮৪ সালে তিনি নূতন চন্দ্র সিংহ স্মৃতি পদক এবং ১৯৮৭ সালে লেখিকা সংঘ পদক লাভ করেন। গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০১১ সালে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করে। আমার কাছে তিনি ইতিহাসের একজন কৃতী গবেষকের পাশাপাশি পরিবারের শ্রদ্ধেয় একজন মানুষ। সম্পর্কে তিনি আমার দাদা হন। ১৯৯৪ সালে তাঁর মৃত্যুসংবাদ পেয়ে আমার বাবা মোহাম্মদ ইসহাকের সঙ্গে আমি চট্টগ্রামের দিদার মার্কেটের তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম। তাঁর জানাজায় অংশ নেওয়ার সৌভাগ্যও আমার হয়েছিল। সেই বিদায়ের স্মৃতি আজও আমার মনে অম্লান। ১৯৯৪ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবন থেমে গেলেও তাঁর গ্রন্থ ও গবেষণা আমাদের অতীতকে জানার পথ দেখিয়ে চলেছে। তাঁকে স্মরণ করার অর্থ তাই তাঁর কাজ নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করা।
নোয়াজিশপুরে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত স্মৃতিকেন্দ্র ও সংগ্রহশালা এই দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অষ্টম শাখা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই কেন্দ্রকে তাঁর বই, গবেষণার উপকরণ, পাণ্ডলিপি ও ব্যক্তিগত স্মারক সংরক্ষণের পাশাপাশি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চার একটি প্রাণবন্ত স্থানে পরিণত করা প্রয়োজন। সেখানে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পরিদর্শন, ইতিহাসবিষয়ক আলোচনা, প্রবীণদের স্মৃতিবয়ান সংগ্রহ এবং তরুণদের গবেষণায় উৎসাহ দেওয়ার আয়োজন করা যেতে পারে। একজন যোগ্য কিউরেটরের তত্ত্বাবধানে তাঁর সংগ্রহ ও রচনার ডিজিটাল সংরক্ষণও জরুরি। স্থানীয় শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, পরিবার এবং জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এই কাজকে এগিয়ে নিতে পারে।
আবদুল হক চৌধুরীর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- জানার আগ্রহ, অধ্যবসায় ও নিরলস পরিশ্রম একজন মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে। তিনি আমাদের অতীতকে অনুসন্ধান করেছেন; এখন তাঁর কাজ সংরক্ষণ ও ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন
রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক;
এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।


















