বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার সংকট ক্রমেই একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা শুধু উদ্বেগজনক নয়, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে একটি গভীর মানবিক, নৈতিক ও নীতিগত প্রশ্নও তুলে ধরেছে। একজন ক্যানসার রোগীকে যখন বলা হয়, ‘আপনার রেডিওথেরাপির সিরিয়াল ২০২৮ সালে,’ তখন তিনি শুধু একটি তারিখ পান না; তাঁর সামনে তৈরি হয় দীর্ঘ ও অনিশ্চিত অপেক্ষার এক বাস্তবতা।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রেডিওথেরাপির অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা প্রায় ৭,৫০০-এ পৌঁছেছে এবং কিছু রোগীর সিরিয়াল ২০২৮ সালের অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত গিয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে সেখানে মাত্র দুটি রেডিওথেরাপি মেশিন দিয়ে তিন শিফটে প্রতিদিন প্রায় ২৫০-৩০০ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, ২০২৬ সালে একজন ক্যানসার রোগীকে ২০২৮ সালের রেডিওথেরাপির তারিখ দিয়ে আমরা আসলে কী দিচ্ছি- চিকিৎসার সুযোগ, নাকি এমন একটি আশ্বাস, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়?
ক্যানসার চিকিৎসায় সময়ের মূল্য: বিলম্ব মানেই ঝুঁকি-
ক্যানসার অপেক্ষা করে না। ক্যানসারের চিকিৎসা সুবিধামতো সময়ে শুরু করার বিষয় নয়। রোগের ধরন, পর্যায় ও চিকিৎসার উদ্দেশ্য অনুযায়ী প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাপদ্ধতি এবং সময়সীমা রয়েছে। কোনো রোগীর ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপিই হতে পারে প্রধান চিকিৎসা; আবার কারও ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এটি শুরু করা জরুরি।
ক্যানসারের চিকিৎসায় প্রতিটি বিলম্বের মূল্য দিতে হয় রোগীকেই। বিএমজে গবেষণায় ১২ লাখের বেশি ক্যানসার রোগীর তথ্য নিয়ে করা একটি বৃহৎ পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও সম্মিলিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চিকিৎসা মাত্র চার সপ্তাহ পিছিয়ে গেলেও বিভিন্ন ক্যানসারে মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে পারে। মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে অস্ত্রোপচারের পর সময়মতো রেডিওথেরাপি শুরু করা চিকিৎসার মানের গুরুত্বপূর্ণ সূচক; স্তন সংরক্ষণমূলক অস্ত্রোপচারের পর অযথা বিলম্বও ক্যানসার একই স্থানে ফিরে আসার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অর্থাৎ, ক্যানসার চিকিৎসায় সময় নিজেই চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই আমাদের বিবেকের কাছেই প্রশ্ন রাখা দরকার- একজন ক্যানসার রোগীকে ২০২৮ সালের সিরিয়াল দিয়ে আমরা কি সত্যিই চিকিৎসার আশা দিচ্ছি, নাকি এমন এক অপেক্ষায় রাখছি, যেখানে সময়ের সঙ্গে রোগ বাড়তে পারে এবং নিরাময়ের সুযোগ কমে যেতে পারে?
এটি শুধু যন্ত্রের সংকট নয়, পুরো ব্যবস্থার সংকট:
একটি দেশে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখলাম, রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপনের জন্য ১৮টি বাংকার প্রস্তুত রয়েছে এবং ১৮টি মেশিন কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে যন্ত্র কেনা আর কার্যকর চিকিৎসাসেবা তৈরি করা এক বিষয় নয়।
একটি রেডিওথেরাপি মেশিন কার্যকরভাবে চালাতে চিকিৎসা পরিকল্পনা ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট, রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট ও প্রকৌশলী প্রয়োজন। একই সঙ্গে দরকার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, মাননিয়ন্ত্রণ এবং নিরবচ্ছিন্ন কারিগরি সহায়তা।
মেশিনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় জনবল ও পরিচালন অবকাঠামো একই সময়ে প্রস্তুত না হলে মেশিন বসে থাকবে, রোগী তার সুফল পাবেন না। তাই পরিকল্পনা শুধু মেশিন কেনার নয়; সেটি দ্রুত চালু করা এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার নিশ্চিত করারও। অতীতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু রেডিওথেরাপি মেশিন দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত বা অচল অবস্থায় পড়ে ছিল; মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণেও ছিল জটিলতা। অতীতের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন উদ্যোগের পরিকল্পনা না করলে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যাবে। আমি প্রশাসন বা স্বাস্থ্যনীতি বিশেষজ্ঞ নই। কিন্তু একজন চিকিৎসক এবং দেশের একজন নাগরিক হিসেবে এটুকু বুঝি- সমস্যাটি কঠিন, কিন্তু সমাধান-অযোগ্য নয়। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহি।
অন্য নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো কী করছে?
সীমিত সম্পদের মধ্যেও সমাধানের উদাহরণ রয়েছে। ভারত আঞ্চলিক ক্যানসার কেন্দ্র, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং সমন্বিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ক্যানসারসেবা বিকেন্দ্রীকরণের পথে এগিয়েছে। তানজানিয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় শুধু মেশিন নয়-অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল ও মাননিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে উন্নত করে রেডিওথেরাপি সক্ষমতা সম্প্রসারণ করেছে। শিক্ষাটি পরিষ্কার- রেডিওথেরাপি সংকটের সমাধান শুধু নতুন মেশিন কেনা নয়; প্রয়োজন জনবল, অবকাঠামো ও রক্ষণাবেক্ষণসহ একটি পরিকল্পিত জাতীয় রেডিওথেরাপি নেটওয়ার্ক।
সমাধানের পথ কোথায়?
প্রথমেই এই পরিস্থিতিকে জাতীয় ক্যানসার চিকিৎসার জরুরি সংকট হিসেবে স্বীকার করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। সমাধানের পথও আমাদের সামনে রয়েছে। রোগের জরুরিতা অনুযায়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণ, উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে প্রমাণভিত্তিক কম সেশনের রেডিওথেরাপি, এবং সরকারি কেন্দ্রে সময়মতো চিকিৎসা সম্ভব না হলে নিম্নআয়ের রোগীদের জন্য বেসরকারি ও অলাভজনক কেন্দ্রের সেবা ব্যবহারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি কেন্দ্রের সচল মেশিন, অপেক্ষমাণ রোগী ও অপেক্ষার সময় নিয়ে জাতীয় ড্যাশবোর্ড ও রেফারেল নেটওয়ার্ক দরকার। নতুন মেশিন কেনার আগেই জনবল, অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি সেবা-চুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিভাগীয় পর্যায়ে সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকার, বিশেষজ্ঞ ও রোগী-প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে।
রেডিওথেরাপিতে বিনিয়োগ শুধু স্বাস্থ্যখাতের ব্যয় নয়-এটি জীবন বাঁচানো এবং দেশের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ। লানসেট অনকোলজি কমিশনের হিসাবে ২০১৫-৩৫ সালে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় রেডিওথেরাপির সক্ষমতা বাড়ালে প্রায় ২ কোটি ৬৯ লাখ জীবন রক্ষা পেতে পারে এবং অর্থনৈতিক নিট সুফল দাঁড়াতে পারে ২৭৮ থেকে ৩৬৫ বিলিয়ন ডলার।
শেষপর্যন্ত এটি মানবিকতা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন:
একজন মানুষ যখন ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার সংবাদ নিয়ে হাসপাতালে আসেন, তখন তাঁর এবং তাঁর পরিবারের প্রতিটি দিন কাটে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তায়। সেই রোগীকে যদি বলা হয়, ‘আপনার রেডিওথেরাপির সিরিয়াল ২০২৮ সালে,’ তবে তাঁকে শুধু একটি তারিখ দেওয়া হয় না; তাঁর চিকিৎসার অমূল্য সময়কেও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়। গত প্রায় এক বছর ধরে গণমাধ্যমে ক্যানসার রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা, অসহায়ত্ব ও দুর্ভোগের যে চিত্র আমরা দেখছি, তা কি আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়? এখন দোষী খোঁজার চেয়ে বেশি প্রয়োজন সমস্যার দায়িত্ব নেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাধানের পথ তৈরি করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্যানসার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করে না। ক্যানসার মেশিন মেরামতের জন্য অপেক্ষা করে না। ক্যানসার ২০২৮ সালের সিরিয়ালের জন্যও অপেক্ষা করবে না। একজন ক্যানসার রোগীর কাছে প্রতিটি দিনই মূল্যবান। দীর্ঘ অপেক্ষায় যদি তাঁর নিরাময়ের সম্ভাবনা কমে যায়, তবে সেটিকে শুধু ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না; এটি আমাদের মানবিকতা, নৈতিকতা ও রোগীর প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্ন। রোগীকে সত্য বলা আমাদের দায়।
শেষকথা:
স্বাস্থ্যসেবা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার, আর সেই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একজন ক্যানসার রোগীকে এমন একটি চিকিৎসার তারিখ দেওয়া, যখন সেই চিকিৎসার কার্যকারিতাই হয়তো আর থাকবে না, কেবল ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের মানবিকতা, নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার জবাবদিহির প্রশ্ন। ক্যানসার অপেক্ষা করে না। তাই রোগীকে ভবিষ্যতের একটি তারিখ নয়, প্রয়োজনের সময় সঠিক চিকিৎসা পাওয়ার বাস্তব সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক- অধ্যাপক খন্দকার এ. কে. আজাদ
চেয়ারম্যান, পোস্টগ্র্যাজুয়েট সার্জারি একাডেমিয়া,
অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), সার্জারি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।


















