নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে আগামী পাঁচ বছরে সরকারি কর্মচারীদের পেনশন ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবে, যা বাজেটে ‘অসহনীয় আর্থিক চাপ’ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতীয় বেতন কমিশন।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে পেনশনভোগীর সংখ্যা বেড়েছে।
২০১৫ সালের বেতন কাঠামোর অধীন বিগত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এ খাতে সরকারের ব্যয় হয় ১২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা, যা বার্ষিক হিসাবে দাঁড়ায় প্রায় ২৪ হাজার ৬৭০ কোটি টাকায়। কমিশন জানিয়েছে, নাগরিকদের গড় আয়ু বৃদ্ধির কারণে এখন অবসরপ্রাপ্তরা ২০ বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় ধরে এই আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করছেন, যা বর্তমান ব্যবস্থার ওপর বাড়তি আর্থিক বোঝা তৈরি করছে।
নতুন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর হলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯ লাখ ১৬ হাজার সুবিধাভোগীর পেছনে সরকারের গুনতে হবে ৩৪ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। পরবর্তী চার বছরের ব্যবধানে পেনশনভোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১০ লাখ ৪৫ হাজারে। কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রতিবছর গড়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়ছে।
কমিশন বলেছে, পেনশনের দাবি মেটাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয় জাতীয় বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। দীর্ঘ মেয়াদে এ চাপ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় টেকসই সংস্কার প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেছে কমিশন।
রিপোর্টে বলা হয়, অবসরপ্রাপ্তদের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীরা ২০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে পেনশন পাচ্ছেন।
বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের জন্য সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ‘ডিফাইন্ড বেনিফিট’ বা নির্ধারিত সুবিধাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে। চাকরির সময় কর্মচারীদের এ খাতে কোনো চাঁদা দিতে হয় না। পেনশনের পুরো দায় মেটানো হয় সরকারের রাজস্ব তহবিল থেকে।
অবসরের পর কর্মচারীরা সর্বশেষ মূল বেতনের ৯০ শতাংশের ভিত্তিতে মাসিক পেনশন পান। এর সঙ্গে অবসর-পরবর্তী ছুটির সুবিধাও দেওয়া হয়। প্রায় ৯০টি স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের পেনশন ব্যয়ের বড় অংশ সরকারি অনুদানের মাধ্যমে মেটানো হয়।
কমিশনের ভাষ্য, আগামী বছরগুলোতে এ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ অধিকাংশ উচ্চ আয়ের দেশ এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলো ‘ডিফাইন্ড কন্ট্রিবিউশন’ বা নির্ধারিত চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থায় চলে গেছে।
এ ব্যবস্থায় কর্মচারী ও নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের চাঁদা জমা করে একটি তহবিল গঠন করা হয়। সরকারি সিকিউরিটিজ, শেয়ারবাজার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো কম ঝুঁকির খাতে ওই অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। পরে তহবিলের অর্থ ও বিনিয়োগ থেকে পাওয়া আয় দিয়ে পেনশন দেওয়া হয়।
শ্রীলঙ্কায় কর্মচারীরা বেতনের ৮ শতাংশ এবং সরকার ১২ শতাংশ চাঁদা দেয়। পাকিস্তানে কর্মচারীদের চাঁদা ১০ শতাংশ, সরকার দেয় ১২ শতাংশ। ভারতে কর্মচারীরা ১০ শতাংশ এবং সরকার ১২-১৪ শতাংশ চাঁদা দেয়। অস্ট্রেলিয়ায় বেতনের অন্তত ১২ শতাংশ পেনশন তহবিলে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। ২০২৫ সালে দেশটির পেনশন সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৩৩ ট্রিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার, যা বিশ্বের বৃহত্তম তহবিলগুলোর একটি।
সরকারি কর্মচারীরা গড়ে ৩০ বছর বা তারও বেশি সময় চাকরি করেন উল্লেখ করে কমিশন বলেছে, চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালু হলে এ তহবিল দেশের পুঁজিবাজার ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় চালিকাশক্তি হতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৭ কোটি মানুষের দেশে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের একটি অভিন্ন চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে বিপুল দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ তহবিল গড়ে উঠবে। এতে সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইনের আওতায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের জন্য চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে এতে বাধার মুখে পড়তে হয়। সরকারি কর্মচারীদের এ ব্যবস্থার বাইরে রাখা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গেও পর্যাপ্ত আলোচনা করা হয়নি।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষকে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে নতুন সরকারি কর্মচারী এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য পৃথক চাঁদাভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেছে কমিশন।
নতুন নিয়োগ পাওয়া সব সরকারি কর্মচারীর জন্য বাধ্যতামূলক এ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে বেতন থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কেটে নেওয়ার পাশাপাশি সরকারও সমপরিমাণ অর্থ জমা দেবে। এ অর্থের জন্য আলাদা পেনশন তহবিল গঠন করা হবে।
তহবিলের অর্থ সরকারি সিকিউরিটিজ, শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মতো নিরাপদ ও ভালো মুনাফা পাওয়া যায় এমন খাতে বিনিয়োগ করা হবে। এ থেকে পাওয়া আয় দিয়ে তহবিলকে স্বনির্ভর করার পরিকল্পনা করতে হবে । জনসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখা এবং আর্থিক ভারসাম্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত পর্যালোচনারও সুপারিশ করেছে কমিশন।
এ ছাড়া সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য তহবিলভিত্তিক পেনশন সুবিধা সম্প্রসারণে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও কার্যপরিধি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
পূর্বকোণ/মিফতা



















