ক্ষীণকায় শরীর। বাদামি রঙে রাঙানো লম্বা চুল। গায়ে সবুজ শার্ট-প্যান্ট, গলায় টাই। ঘামে ভিজে পুরো শরীর জবুথবু, তবু কণ্ঠে ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই। রিংভর্তি আঙুলে শক্ত করে ধরা মাইক্রোফোন। নাম তার তাইজুল ওরফে কিম জং। ভ্যানের ওপর দাঁড়িয়ে গানের তালে তালে চলছে ভোটের আবেদন। মাঝেমধ্যেই চারপাশের জনতার উদ্দেশে স্লোগান-‘ভোট দেবেন কোনখানে? খেজুর গাছের মাঝখানে!’ সেই গাড়ি ঘিরে মানুষের থিকথিকে ভিড়। সুর আর স্লোগানের সঙ্গে মিলেমিশে তৈরি হয়েছে অন্যরকম এক আবহ। চট্টগ্রামের ‘রিয়াজউদ্দিন বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির’ নির্বাচন ঘিরেই এই উৎসব। সমিতির তিন বছর মেয়াদী কার্যকরী কমিটির নির্বাচন আগামীকালশনিবার। সেই নির্বাচনী উন্মাদনায় গত দশদিন ধরে দেড়শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী এই বাজার যেন জেগে আছে রাতদিন।
কদিন আগেও ভারী বৃষ্টিতে ডুবে ছিল রিয়াজউদ্দিন বাজারের অলি-গলি। দোকানে ঢুকেছিল পানি, ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়েছে শত কোটি টাকার। সেই ক্ষতির রেশ কাটতে না কাটতেই এখন বদলে গেছে বাজারের চেনা দৃশ্য। দুঃখ ভুলে ভোটের উৎসবে মেতেছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যানার-পোস্টারে ঢাকা পথঘাট, গানে-স্লোগানে মুখর চারপাশ, আর প্রার্থী-সমর্থকদের মিছিল- দেড়শ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী বাজারটিতে এখন যেন শুধুই নির্বাচনের আমেজ।
কাপড়ের পাশাপাশি এই বাজারে রয়েছে সবজি, মাছ, মাংস, চাল, ফল, মুদি, পানসুপারি, মসলা, ইলেকট্রনিকস, মুঠোফোন, অন্দরসজ্জা ও স্টেশনারিসহ অন্তত ১০০ ধরনের দোকান। ছোট-বড় অন্তত ২০টি সমিতির আওতায় থাকা সাড়ে তিন হাজারের বেশি দোকানের প্রতিনিধিত্বকারী এই সংগঠনের নির্বাচনে ২৩ পদে লড়ছেন ৪৮ প্রার্থী। ভোটার ৩ হাজার ১২২ জন।
ব্যানার-পোস্টারের বাজার: বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বাজারে প্রবেশের অন্তত ১৫টি পথ। উত্তরে এনায়েতবাজার, দক্ষিণে স্টেশন রোড, পূর্বে জুবিলী রোড আর পশ্চিমে বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড। পুরো এলাকাজুড়েই এখন নির্বাচনের গন্ধ। সবচেয়ে ব্যস্ত বাহার লেনের ওপর আকাশটাই যেন ঢেকে গেছে ব্যানার-পোস্টারে। একই দৃশ্য সবজি আড়ত থেকে স্টেশন রোড ও জুবিলী রোডজুড়ে। পণ্যের বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত বাজারটি যেন এখন ব্যানার-পোস্টারেরও বাজার।
প্রচারণায় বৈচিত্র্য: কিম জং নামের ওই ব্যক্তি গত এক সপ্তাহ ধরে বাজারজুড়ে নাচে-গানে প্রচারণা চালাচ্ছেন সহসভাপতি প্রার্থী মো. ইয়াসিন রেজা চৌধুরীর হয়ে। গতকাল শেষ দিনের প্রচারণায় দেখা গেছে একের পর এক প্রার্থীর শোডাউন আর মিছিল। কেউ ভোটারদের হাতে তুলে দিয়েছেন প্রচার কার্ড, কেউ দিয়েছেন নানা আশ্বাস। ড্রাম-পার্টি নিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন কার্যকরী সদস্য প্রার্থী আবু জাফর মো. সাদেক। আবার সভাপতি প্রার্থী মোহাম্মদ আলী আব্বাস খানের সমর্থকদের দেখা গেছে মাথায় আস্ত প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে মিছিল করতে। গলির মাইক থেকে ভেসে আসছিল সহসভাপতি প্রার্থী মোহাম্মদ জানে আলমের জন্য বানানো গান-‘জানে আলম ভাইকে দেখিও, আনারস মার্কায় ভোট দিও।’
রিয়াজউদ্দিন বাজার আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ফারুক শিবলীও নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদের এই প্রার্থী পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমি শুরু থেকেই ব্যবসায়ী ভাইদের সুখে-দুঃখে পাশে আছি। নির্বাচিত হলে তাদের কল্যাণে কাজ করে যাব।’
প্রার্থীদের আশ্বাসের তালিকায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে জলাবদ্ধতা নিরসন। আছে যানজট কমানো, নিরাপত্তা জোরদার, গণশৌচাগার নির্মাণ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতিও।
সমিতির আহ্বায়ক আবু তাহের জানান, নির্বাচনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও জানানো হয়েছে। শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মোটেল সৈকতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন ভোটাররা।
সহকারী নির্বাচন কমিশনার ও মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) অ্যাডভোকেট নেজাম উদ্দিন পূর্বকোণকে বলেন, ‘নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর ভাইও এ বিষয়ে অত্যন্ত সক্রিয়। আগের নির্বাচনগুলোর মতো এবার কোনো ধরনের প্রভাব খাটানোর সুযোগ দেওয়া হবে না।’
কয়েক দিন আগেও যে বাজারের ব্যবসায়ীরা পানির ক্ষতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন, ভোটের উৎসব আপাতত সেই দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে। এখন রিয়াজউদ্দিন বাজারের অলি-গলিতে একটাই আলোচনা—কাদের হাতে উঠবে ব্যবসায়ীদের এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনের নেতৃত্বের ভার?
পূর্বকোণ/রেহেনুমা

















