চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

সর্বশেষ:

মন্তব্য প্রতিবেদন

গাজা: ধ্বংসস্তূপ থেকে বিশ্বমঞ্চে ফিলিস্তিন

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

৮ অক্টোবর, ২০২৬ | ৮:০৬ পূর্বাহ্ণ

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর তিন বছর পেরিয়ে গেছে। এই সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো-দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রান্তে ঠেলে রাখা ফিলিস্তিন প্রশ্ন আবার বিশ্বমঞ্চের কেন্দ্রে ফিরে এসেছে।
সেদিন হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামলায় প্রায় ১,২০০ ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৫১ জন জিম্মি হন। হামলাটি ছিল ভয়াবহ এবং বেসামরিক মানুষ হত্যা ও জিম্মি করার কোনো ন্যায্যতা নেই। কিন্তু এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এমন পরিবর্তন এনেছে, যা হামাসের প্রত্যাশারও বাইরে যেতে পারে।

 

হামলার আগে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া দ্রুত এগোচ্ছিল। আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এবং আঞ্চলিক কূটনীতির নতুন সমীকরণে ফিলিস্তিন প্রশ্ন ক্রমশ আড়ালে চলে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়েও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বাস্তবতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ৭ অক্টোবর সেই ধারণা ভেঙে দেয়।
ইসরায়েলের পাল্টা সামরিক অভিযানে গাজায় যে বিপুল প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, তা বিশ্ববাসীর সামনে ফিলিস্তিনের দীর্ঘদিনের সংকটকে নতুন মাত্রায় তুলে ধরেছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৭৪ হাজারের বেশি। বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং ধ্বংস হয়েছে ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
ফলে আন্তর্জাতিক আলোচনায় ফিলিস্তিন এখন আর শুধু সন্ত্রাসবাদ বা নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, দখলদারিত্ব, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার এবং একটি জনগোষ্ঠীর মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার প্রশ্ন।

 

গাজার ধ্বংসযজ্ঞের ছবি বিশ্বজুড়ে মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কারণে ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ আর কূটনৈতিক বৈঠকের সীমিত আলোচনায় আবদ্ধ নেই। এই মানবিক বিপর্যয় বিশ্ব জনমতকে নতুনভাবে প্রভাবিত করেছে এবং ফিলিস্তিনের প্রতি আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ও সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলিদের ৭ অক্টোবরের অভিজ্ঞতাও উপেক্ষা করা যায় না। নিহত পরিবার, আক্রান্ত জনগোষ্ঠী এবং জিম্মিদের যন্ত্রণা বাস্তব। ইসরায়েলের নিরাপত্তার অধিকার যেমন স্বীকৃত হওয়া উচিত, তেমনি একই অধিকার ফিলিস্তিনিদেরও রয়েছে। কোনো পক্ষের নিরাপত্তা অন্য পক্ষের বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর সীমাহীন সহিংসতার বৈধতা দিতে পারে না।
গণহত্যার অভিযোগ নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুতর বিতর্ক চলছে। দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যা সনদের অধীনে মামলা করেছে। আদালত এখনো চূড়ান্ত রায় দেয়নি যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে; তবে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশে ইসরায়েলকে গণহত্যা সনদের আওতায় পড়তে পারে এমন কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো-ইসরায়েলের সামরিক অভিযান হামাসকে নির্মূল ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে শুরু হলেও এর আরেকটি ফল হয়েছে। ফিলিস্তিন প্রশ্নকে আর উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। বরং তা আবার মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
এখানেই ইতিহাসের শিক্ষা! একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে দমন করে স্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
৭ অক্টোবর ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি- কোনো পক্ষের জন্যই স্থায়ী নিরাপত্তা আনেনি। বরং উভয় জনগোষ্ঠীর ক্ষত আরও গভীর করেছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো-এই নতুন করে জেগে ওঠা বিশ্ব মনোযোগকে শুধু নিন্দা ও সহানুভূতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়া।

 

ফিলিস্তিনিদের জন্য দরকার মর্যাদাপূর্ণ ও কার্যকর রাষ্ট্রের নিশ্চয়তা। অন্যদিকে, ইসরায়েলিদের জন্য দরকার প্রকৃত নিরাপত্তা। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
ফিলিস্তিন প্রশ্নকে আবার ভুলে যাওয়া নয়-এবার তার একটি ন্যায়সংগত রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করাই হতে হবে বিশ্বের অঙ্গীকার।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট