পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মাঝেই কারাগারে বন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে লং মার্চ শুরু করেছেন তার লাখ লাখ সমর্থক। সোমবার (৪ অক্টোবর) ইমরান খানের রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) সমর্থকদের লং মার্চের তথ্য নিশ্চিত করেছে।
রবিবার দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে ইসলামাবাদ অভিমুখী ওই লং মার্চের যাত্রা শুরু হয়েছে। খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে বর্তমানে ক্ষমতায় রয়েছে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) সরকার। দীর্ঘ এই লং মার্চ বিভিন্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে একাধিক স্থানে যাত্রাবিরতি শেষে ইসলামাবাদে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছে দলটি।
লং মার্চের নেতৃত্বে থাকা খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘‘আমি আপনাদের সবাইকে রাজপথে নেমে আসার আকুল আহ্বান জানাচ্ছি। তরুণসমাজ, তোমরা তোমাদের কারারুদ্ধ প্রিয় নেতার স্বার্থে রাজপথে নেমে এসো।’’
২০২২ সালে দেশটির পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে পিটিআই নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ইমরান খানের দল ও দেশটির বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মধ্যকার এই তীব্র বিভেদের সূত্রপাত হয়। ওই সময় থেকেই ইমরান খান অভিযোগ করে আসছেন, তার পতনের পেছনে সামরিক বাহিনীর হাত ছিল। যদিও সেনাবাহিনী বরাবরের মতোই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পরবর্তীতে ২০২৩ সালের মে মাসে ইমরান খানকে গ্রেপ্তার করা হলে এই সংকট চরম আকার ধারণ করে। ওই সময় তার সমর্থকরা সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে সহিংস দাঙ্গা ছড়িয়ে দেয়। এর জেরে দেশজুড়ে ব্যাপক দমনপীড়ন শুরু হয়; যেখানে পিটিআইয়ের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার এবং পরবর্তীকালে সামরিক আদালতে বহু সমর্থকের সাজা দেওয়া হয়।
সাবেক ক্রিকেট তারকা ৭৪ বছর বয়সী ইমরান খান নিজেকে একজন ‘রাজনৈতিক বন্দি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
২০২৩ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার আগেই দেশটির সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে তার সম্পর্কের ঘোর অবনতি ঘটে। পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের রাজনীতির মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিশ্লেষকরা সেনাবাহিনীকে বিবেচনা করে থাকেন। তবে বর্তমান বেসামরিক সরকার ও সেনাবাহিনী তাকে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে মানতে নারাজ। তারা বরং দেশের বিচার বিভাগের সম্পূর্ণ স্বাধীনতার কথা তুলে ধরছেন।
বিচারিক আদালতে একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন ইমরান খান। যদিও আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় কেবল একটি মামলা ব্যতীত তার অন্য সব সাজা স্থগিত কিংবা বাতিল করা হয়েছে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর এই লং মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে পিটিআইয়ের উত্থাপিত বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকার আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ায় লং মার্চ পিছিয়ে দেয় পিটিআই। গত সপ্তাহের শেষের দিকে সরকারের সঙ্গে পিটিআইয়ের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ভেস্তে যায়।
দুই বছর আগে অনুষ্ঠিত পিটিআইয়ের সর্বশেষ বড় ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল।
সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এড়াতে বর্তমানে ইসলামাবাদ ও এর আশপাশের অঞ্চলজুড়ে হাজার হাজার পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাস সংবলিত অতিগুরুত্বপূর্ণ সরকারি চত্বর সুরক্ষিত রাখতে বড় বড় শিপিং কনটেইনার দিয়ে পুরো এলাকা অবরুদ্ধ ও ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়েছে।
এদিকে, বিক্ষোভকারীদের যেকোনো মূল্যে ইসলামাবাদে প্রবেশ করতে না দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান সরকার।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমরা এই সমস্যার নিস্পত্তি একেবারে চিরতরে করব। কোনো রাজনৈতিক দলকে নিজেদের ইচ্ছামতো দেশের রাজধানীতে স্বাভাবিক কাজকর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্য স্তব্ধ করার সুযোগ দেওয়া যায় না।
সরকারের পক্ষে ওই বৈঠকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নাকভি। তিনি বলেন, আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে ক্রমবর্ধমান জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় প্রস্তাবিত যৌথ নীতিতে ইমরান খানের দল সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানানোয় আলোচনা ভেস্তে গেছে।
তবে পিটিআই সরকারের এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটি বলেছে, আলোচনার নামে অন্যায্য শর্ত চাপিয়ে দিয়ে দলকে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল সরকার। সীমান্তসংলগ্ন এই অঞ্চলে গত কয়েক মাসে জঙ্গি ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকভিসহ দেশটির কয়েকজন মন্ত্রী বলেছেন, ইমরান খানের দল পরিচালিত প্রাদেশিক সরকার যদি রাষ্ট্র-সমর্থিত সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ নীতি অনুসরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে সাংবিধানিক ও আইনি সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওই প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দেওয়া হতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স।
পূর্বকোণ/রাকিব/পারভেজ

















