চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এক দশকে প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের অগ্রগতি

এক দশকে প্রতিরক্ষা খাতে ভারতের অগ্রগতি

অনলাইন ডেস্ক

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

গত দশ বছরে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় পরিবর্তন এসেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সামরিক সরঞ্জামের উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রতিরক্ষা পণ্যের রপ্তানিও বেড়েছে কয়েক গুণ। একই সময়ে প্রতিরক্ষা বাজেট, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং দেশীয় শিল্পে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগও বেড়েছে।

উৎপাদনে রেকর্ড

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটির প্রতিরক্ষা উৎপাদন রেকর্ড ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। এর আগের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) এ অঙ্ক ছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি রুপি। ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৮৪ হাজার ৬৪৩ কোটি রুপি, আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মাত্র ৪৩ হাজার ৭৪৬ কোটি রুপি।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের মোট উৎপাদনের প্রায় ৭৬ শতাংশ এসেছে সরকারি খাত থেকে, বাকি ২৪ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে। বেসরকারি খাতের উৎপাদনের মূল্য ছিল প্রায় ৪২ হাজার কোটি রুপি।

রপ্তানিতে উল্লম্ফন

এই সময়ে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বদল ঘটেছে রপ্তানিতে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা রপ্তানি ছিল মাত্র ৬৮৬ কোটি রুপি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা রেকর্ড ৩৮ হাজার ৪২৪ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। আগের বছরের ২৩ হাজার ৬২২ কোটি রুপির তুলনায় এক বছরেই রপ্তানি বেড়েছে ৬২ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ভারতের প্রতিরক্ষা পণ্য এখন ৮০টিরও বেশি দেশে যাচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রপ্তানিতে বেসরকারি খাতের অবদান ১৭ হাজার ৩৫৩ কোটি রুপি (৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ)। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান ২১ হাজার ৭১ কোটি রুপি (৫৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ)।

ভারত সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে বার্ষিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন ৩ লাখ কোটি রুপি এবং রপ্তানি ৫০ হাজার কোটি রুপিতে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে।

বাড়ছে বাজেট বরাদ্দ

দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সামরিক খাতে বরাদ্দও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি রুপি, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৮৫ হাজার কোটি রুপিতে। এর মধ্যে মূলধনি ব্যয়ের জন্য রাখা হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার কোটি রুপি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, একই অর্থবছরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ দেশীয় শিল্পখাতের জন্য আলাদাভাবে ১ লাখ ৩৯ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ আছে।

দেশীয় পণ্য কেনায় অগ্রাধিকার

সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে দেশীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি আরও জোরদার করেছে ভারত। প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদ (ডিএসি) ডিআরডিওর নকশা করা এবং ভারতীয় শিল্পে তৈরি বিভিন্ন সরঞ্জামের জন্য ৬ লাখ কোটি রুপির বেশি মূল্যের ‘অ্যাকসেপ্টেন্স অব নেসেসিটি’ (প্রাথমিক অনুমোদন) দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ৬২ হাজার কোটি রুপি মূল্যের ৯৭টি তেজস এমকে-১এ যুদ্ধবিমান এবং প্রায় ৬২ হাজার ৭০০ কোটি রুপি মূল্যের ১৫৬টি এলসিএইচ প্রচণ্ড হেলিকপ্টার।

২০১৬ সালের ডিফেন্স প্রকিউরমেন্ট পলিসি ও ২০২০ সালের ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন প্রসিডিউর (ডিএপি) দেশীয় ক্রয় ও উৎপাদনের কাঠামোকে শক্ত করেছে। ২০২৫ সালের ডিফেন্স প্রকিউরমেন্ট ম্যানুয়ালের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ কোটি রুপির রাজস্ব খাতের ক্রয়প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। খসড়া ডিএপি ২০২৬-এ দেশীয় নকশা, উৎপাদন ও উপাদান ব্যবহারে আরও জোর দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

স্টার্টআপ ও বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা

নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন বাড়াতে স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং উদ্ভাবকদের যুক্ত করার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। ‘ইনোভেশনস ফর ডিফেন্স এক্সিলেন্স’ (আইডেক্স) কর্মসূচির আওতায় ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৬৭৬টি স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান এবং উদ্ভাবক যুক্ত হয়েছে। এ সময়ে নকশা ও উন্নয়নের ৫৫১টি চুক্তি হয়েছে। কর্মসূচিটির মোট বরাদ্দ ৪৯৮ কোটি ৭৮ লাখ রুপি।

গবেষণা ও উন্নয়নে বাড়তি বিনিয়োগ

ডিআরডিওর গবেষণা ও উন্নয়ন বরাদ্দ ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ১৩ হাজার ৭১৬ কোটি ১৪ লাখ রুপি থেকে বেড়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৯ হাজার ১০০ কোটি ২৫ লাখ রুপি হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন বাজেটের ২৫ শতাংশ শিল্প, স্টার্টআপ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

গোলাবারুদে স্বনির্ভরতা

দেশীয় উৎপাদনের প্রসার সেনাবাহিনীর গোলাবারুদ সরবরাহেও প্রভাব ফেলেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৭৫ ধরনের গোলাবারুদের মধ্যে ১৫৯ ধরন এখন দেশীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। সরকারি হিসাবে, এতে গোলাবারুদে প্রায় ৯১ শতাংশ স্বনির্ভরতা এসেছে।

ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মতে, দেশীয় উৎপাদন বাড়লে বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমে এবং প্রয়োজনমতো সরঞ্জাম উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদন বাড়ানো সহজ হয়।

সার্বিক চিত্র

গত এক দশকে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে উৎপাদন, রপ্তানি, গবেষণা, দেশীয় ক্রয় ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই সম্প্রসারণ ঘটেছে। তবে এসব পরিসংখ্যান মূলত ভারত সরকারের প্রকাশিত তথ্য। এগুলো থেকে এমন সিদ্ধান্তে আসা যায় না যে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প আমদানিনির্ভরতা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছে। দেশীয় সক্ষমতা বাড়লেও কিছু ক্ষেত্রে আমদানি এখনো প্রতিরক্ষা সরবরাহব্যবস্থার অংশ।

পূর্বকোণ/আদর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট