চট্টগ্রাম সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১

সর্বশেষ:

২৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৩:২৩ পূর্বাহ্ণ

মনিরুল ইসলাম রফিক

সন্তানের প্রতি পিতামাতার কর্তব্য

ইসলামের আলোকধারা

একজন নবজাত শিশুর জন্ম থেকেই পরিবেশ পারিপার্শি¦কতা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখা পিতা-মাতা, অভিভাবকের কর্তব্য। বস্তুত সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই পিতামাতার প্রতি তাদের প্রাথমিক পর্যায়ের কতক হক কার্যকর হতে শুরু করে এবং তখন থেকেই সে হক অনুযায়ী আমল করা পিতা-মাতার কর্তব্য হয়ে যায়।
হযরত আবু হুরায়রা (রাদি.) নবী করীম (স.) থেকে এ সম্পর্কে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন : পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের হক হচ্ছে প্রথমত তিনটি: জন্মের পরপরই তার জন্য উত্তম একটি নাম রাখতে হবে, জ্ঞান বুদ্ধি বাড়লে তাকে কুরআন শরীফ তথা ইসলাম শিক্ষা দিতে হবে। আর সে যখন পূর্ণবয়স্ক হবে, তখন তার বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। – (তানবীহুল গাফিলিন -৪৭)।

বস্তুত : সন্তানের ভাল নাম না রাখা, পবিত্র কুরআন ও ইসলামের শিক্ষাদান না করা এবং তার বিয়ের ব্যবস্থা না করা মাতা-পিতার অপরাধের মধ্যে গণ্য। এসব কাজ না করলে পিতামাতার পারিবারিক দায়িত্ব পালিত হতে পারেনা। ভবিষ্যৎ সমাজ ও ইসলামী আদর্শ মুতাবিক সন্তান গড়ে উঠতে পারেনা। এ পর্যায়ে একটি ঘটনা উল্লেখ্য। একজন লোক হযরত উমর ফারুক (রাদি.) এর কাছে একটি ছেলেকে সঙ্গে করে উপস্থিত হয়ে বলল: এ আমার ছেলে, কিন্তু আমার সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেছে ।’ তখন হযরত উমর (রাদি.) ছেলেটিকে বললেন : তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? পিতা-মাতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা গুনাহের কাজ তা কি জান না? সন্তানের উপর পিতা-মাতার যে অনেক হক রয়েছে তা তুমি কিভাবে অস্বীকার করতে পার?’

ছেলেটি বলল হে আমীরুল মু’মিনীন! পিতামাতার উপরও কি সন্তানের কোন হক আছে? হযরত ওমর (রাদি.) বললেন; নিশ্চয়ই।’ ছেলেটি বলল: আল্লাহর শপথ, আমার এ পিতা আমার এ হকগুলোর একটিও আদায় করেননি। তখন হযরত ওমর (রদি.) সেই লোকটিকে লক্ষ্য করে বললেন: তুমি বলছ, তোমার ছেলে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। আসলে তো তোমার থেকে সে সম্পর্ক ছিন্ন করার আগে তুমিই তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছ। (তার হক নষ্ট করেছ), ওঠো এখান থেকে চলে যাও।’.. তার মানে পিতা মাতা যদি বাস্তবিকই চান যে, তাদের সন্তান তাদের হক আদায় করুক, হাহলে তাদের কর্তব্য, সর্বাগ্রে সন্তানদের হক আদায় করা এবং তাতে কোন গাফেলতি না করা।
সন্তানকে মায়ের দুধ পান করানো একটি অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছে ইসলাম। শাল দুধ পান করানোর ব্যাপারেও ইসলাম উৎসাহ প্রদান করে থাকে। যদিও কুসংস্কারের কারণে অনেক পরিবারে তা অমান্য করা হয়। আমাদের প্রিয় নবী (স.) মুসলমান মহিলাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, তোমরা অন্তরের টুকরাকে দুধ পান করিয়ে শুধু দুনিয়াতেই তার প্রতিদান পাবেনা বরং আখিরতের জীবনেও তোমাদেরকে অপরিসীম সাওয়াব ও পুরস্কার দেওয়া হবে। প্রিয় নবী (স.) বলেছেন: ‘এবং মুসলিম মহিলা যে নিজের সন্তানকে দুধের প্রথম ঢোক পান করায়, একটি মানুষের জীবন দানকারীর ন্যায় সওয়াব পাবে। ’(্কানযুল উম্মাল)।
শিশু সন্তানকে দুধ দানকারী মহিলাকে প্রিয় নবী (স.) সেই মুজাহিদদের মত বলে বর্ণনা করেছেন যে মুজাহিদ খোদার রাস্তায় অব্যাহতভাবে পাহারা দানে ব্রত থাকে। যদি সেই মহিলা এই সময়ে মারা যায় তাহলে সে শাহাদাতের সওয়াব পায় ।

টিনের দুধ কিংবা গরুর দুধ কখনো মায়ের দুধের বিকল্প হতে পারেনা। যদি সব ধরনের এলার্জি পেটের ব্যথা এবং বদহজম থেকে শিশুকে মুক্ত পেতে চান, তাহলে বুকের দুধ পান করাতে হবে। শিশু ভূমিষ্ট হওয়ার পর বুকের দুধ পান করানোর পরই মায়ের শরীর দ্রুত সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ের পূর্বে ভূমিষ্ট শিশুর দুর্বলতাও মাতৃদৃগ্ধ পানে দূর হয়।
পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারায় সন্তানকে মায়ের দুধ পান করানোর বিধান সম্বলিত এক দীর্ঘ আয়াত বর্ণিত হয়েছে। ২৩৩ নং আয়াতে এসেছে ‘এবং মায়েরা তাদের শিশুদেরকে পূর্র্ণ দু’বছর বুকের দুধ পান করবে। যাদের পিতারা পূর্ণ মেয়াদের দুধ পান করাতে চায় এই অবস্থায় শিশুর পিতাকে সুন্দরভাবে তার খাবার ও কাপড় দিতে হবে। কিন্তু কারোর ওপর তার সাধ্যের বাইরে বোঝা আরোপ করা যাবেনা। ‘সন্তান মায়ের’- একথা বলে তাকে কষ্ট দেয়া যাবেনা। আবার ‘সন্তান পিতার’- একথা বলে পিতাকেও কষ্ট দেয়া যাবেনা। দুধ পান করানেওয়ালীর এই অধিকার যেমন সন্তানের পিতার ওপর রয়েছে তেমনি তার উত্তরাধিকারদের প্রতিও রয়েছে। কিন্তু উভয় পক্ষ যদি পারস্পরিক সম্মতি এবং পরামর্শের ভিত্তিতে দুধ ছাড়াতে চায় তাহলে তাতে কোন বাধা নেই। তুমি যদি অন্য কোন মহিলার দুধ পান করাতে চাও তাহলে তাতেও কোন বাধা নেই। কিন্তু শর্ত হলো, দুধের বিনিময় যা নির্ধারিত করবে তা সুন্দরভাবে দেবে। খোদাভীতি অবলম্বন কর এবং ইয়াকিন রেখো যা কিছু তুমি করছো, খোদা তা অবলোকন করেছেন।
জন্মের পর পরই আরো যে কাজটা জরুরী তা হচ্ছে, সদ্যজাত শিশুর কানের কাছে আযান দেয়া। হযরত হাসান (রাদি.) এর জন্মের পর নবী করীম (স.) তাঁর কানে আযান ধ্বনি শুনিয়েছিলেন। হযরত ফাতিমা (রাদি.) যখন হুসাইনকে প্রসব করলেন, তখন নবী করীম (স.) কে তার কানে নামাযের আযান শোনাতে আমি দেখেছি। -(মসনদে আহমদ, আবু দাউদ)।

এসময় আল্লাহর নামে নবজাতকের মুখে মিষ্টিজাতীয় কিছু লাগিয়ে দেয়া সুন্নাত। হযরত আনাস (রাদি.) বলেন, উম্মে সুলাইম যখন পুত্র সন্তান প্রসব করলেন তখন তাকে নবী করীম (স.) এর কাছে উপস্থিত করা হয় এবং তার সাথে কিছু খেজুরও পাঠিয়ে দেয়া হয়। তখন নবী করীম (স.) সে খেজুর নিজের মুখে পুরে দিলেন এবং তার নাম রাখলেন আবদুল্লাহ্-(বুখারী মুসলিম)।
সন্তানের যাবতীয় খরচ বহন করা ইসলাম এককভাবে পিতার উপর ন্যস্ত করেছে’-্ এর অর্থ হল, ভূমিষ্ট হওয়ার পর থেকে তার বালেগ হওয়া পর্যন্ত সন্তানের সব ধরনের খরচ পিতা বহন করবে। তার ভূমিষ্ট হওয়ার খরচ খানা পিনা ও পরিধানের খরচ’ সেবা তত্ত্বাবধানের খরচ, স্বাস্থ্য ও আরামের খরচ, অন্য কোন মহিলার দুধ পান করানোর প্রয়োজন হলে তার বিনিময় প্রদান, সন্তানের মাকে তালাক দেয়া হলে সে যদি শিশুকে দুধ পান করায় তাহলে তার বিনিময় দান। মোট কথা, সন্তান প্রতিপালনের জন্য সব ধরনের ব্যয় বহন করা পিতার দায়িত্ব। পিতা যদি সচ্ছল হয় তাহলে সন্তানের ছদকা ফিতরা আদায়ও তার উপর ওয়াজিব এবং আকীকা দান মুস্তাহাব। আল্লাহপাক পিতার অন্তরে সন্তানের উপর বিরাট ইহসান করেছেন। এই স্বভাবজাত মায়া-মমতা ছাড়া শুধূমাত্র কর্তব্য হিসেবে সন্তানের খরচ বহন করা খুব কঠিন কাজ ছিল এবং খুব কম মানুষই এই দায়িত্ব পালনে সক্ষম হতো। ফলে সন্তান প্রতিপালন মানবসমাজে এক কঠিন সমস্যা হিসেবে দেখা দিত।

হযরত আবু মাসউদ-উল বদরী (রাদি.) বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (স.) ইরশাদ করেছেন: যখন কোন ব্যক্তি শুধুমাত্র খোদার সন্তুষ্টি বিধান এবং পরকালে সওয়াব পাওয়ার

জন্য পরিবার পরিজনের জন্য ব্যয় করে তাহলে তার এই ব্যয় খোদার দৃষ্টিতে ছদকা হিসেবে পরিগণিত হবে।
সন্তানের আকীকা করা সুন্নাত। প্রিয় নবী (স.) নিজের সন্তানের আকীকা করেছেন এবং আকীকা করার জন্য অন্যদেরকেও উৎসাহিত করতেন। কিন্তু এটা আবশ্যিকভাবে দৃষ্টি রাখতে হবে যে, আকীকা একটি মুস্তাহাব সাদকা। এটা কোন আবশ্যিক ফরজ নয়। যদি কেউ আকীকা না করে তাহলে তাতে কোন গুনাহ নেই। পিতা যদি সচ্ছল হয় তাহলে আকীকা করা উত্তম। আকীকা সন্তানের জীবনের সাদকা। আকীকা করায় বালামুসিবত থেকে সন্তান রক্ষা পায়। আকীকা জন্মের সপ্তম দিনে করা উচিত। যদি কোন কারণে সপ্তম দিনে করা না যায় তাহলে চৌদ্দ দিনে অথবা একুশ দিনেও কার যায় এবং তার পরেও করা যায়।
আকীকা বলা হয় সেই জন্তুটিকে যা সদ্যজাত সন্তানের নামে যবাই করা হয়। এর মূল শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ভাঙ্গা, কেটে ফেলা। আর নবজাত শিশুর মুন্ডিত চুলকেও আকীকাহ বলা হয় । আঁ হযরত (স.) ইরশাদ করেছেন: প্রতিটি সদ্যজাত সন্তান তার আকীকার সাথে বন্দী। তার জন্মের সপ্তম দিনে তার নামে পশু যবাই করতে হয়। এবং তার মাথা কামিয়ে ময়লা দূর করতে হয়। ’

বস্তুত আকীকাহ করার রেওয়াজ প্রাচীন আরব সমাজে ব্যাপকভাবে চালু ছিল। এর মধ্যে নিহিত ছিল সামাজিক নাগরিক ও মনস্তাত্তিক সর্বপ্রকারের কল্যাণবোধ। এ কারণেই নবী করীম (স.) আল্লাহর অনুমতিক্রমে এ প্রথাকে চালু রেখেছিলেন। শাহ ওয়ালীউল্লাহ মোহাদ্দেস দেহলভী (রহ.) এর মতে, আকীকার উপকারিতা অনেক। তার মধ্যে বিশেষ উপকারিতা হচ্ছে আকীকার সাহায্যে খূব সুন্দরভাবেই সন্তান জন্মের ও তার বংশ সম্পর্কের প্রচার হতে থাকে।
আকীকায় কার জন্য কয়টি জন্তু যবাই করা হবে, এ সম্পর্কে হাদীস শরীফ থেকে স্পষ্ট নির্দেশ পাওয়া যায়। ছেলের জন্য দু’টি ছাগল এবং কন্যা সন্তানের জন্য একটি ছাগল যবাই করা যথেষ্ট হবে। – (আহমদ আবু দাউদ , নাসায়ী)।
একটি সুন্দর মার্জিত ও ইসলামী ভাবধারার অর্থবহ নাম পাওয়ার অধিকার আছে সন্তানের। এককালে মানুষ ছিল সহজ সরল, ধর্মপরায়ন তাই তখনকার নামধাম নিয়ে তেমন অসুবিধা হতনা। মুসলমানরা অনায়াসে একটি ধর্মীয় নাম পছন্দ করতেন। কিন্তু আজ যতই অপসংস্কৃতির সংমিশ্রণে মুসলিম আদর্শ ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ চাপা পড়ে যাচ্ছে। ততই মুসলমানরা ইসলামী নাম নির্ণয়ে হিমশিম খাচ্ছে কিংবা ইসলামী নাম রাখা প্রগতির অন্তরায় মনে করছে।
আজ মুসলমানদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস প্রখর হয়ে দেখা দিয়েছে। আপনার সন্তানকে ভবিষ্যৎ মুসলিম নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো তার অর্থবোধক নাম রাখা। হাদীস শরীফে আছে বরকতময় নামের কারণেও বহু লোক পরকালে বেহেস্তী হবে। ইসলামী ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে ইসলামী নামের সংকলন বেরিয়েছে তা থেকে সন্তানের জন্য একটি মনের মত নাম বেছে নেয়া যায়।
আরবী শব্দ সম্পর্কে আমরা একটু ওয়াকিফহাল হলে ঘরে বসেই সুন্দর নাম তৈরী করতে পারি। আল্লাহর ৯৯টি নামের পূর্বে একটি মাত্র শব্দ বসিয়ে নেই অনায়াসে ৯৯টি ব্যক্তির নাম বানিয়ে নেয়া যায়। শব্দটি হলো ‘আবদুন’ আবদু বা ‘আবদুল’। এটি আল্লাহ শব্দের পূর্বে দিলে হবে আবদুল্লাহ। জব্বার এর পাশে দিলে, হবে আবদুল জব্বার’। রহীম শব্দের আগে দিলে হবে আবদুর রহীম।

আরো অর্থবোধক করতে চান? তাহলে নামগুলোর শুরুতে আহমদ কিংবা মুহাম্মদ লাগাতে হবে। তখন হবে মুহাম্মদ আবদুল জব্বার, আহমদ আনীসুর রহমান। মেয়েদের নাম নিয়ে ভাবনায় আছেন? কোন বিড়ম্বনা নেই। ইসলামের সোনালী যুগে চলে যান, ইতিহাসের এক একটি পাতা উল্টান, দেখবেন কত সুন্দর, পবিত্র ও বীরত্ব গাঁথা নামের ছড়াছড়ি। খাদীজা, ফাতিমা, আয়েশা, আসীয়া, হাওলা, আসমা, খালিদা, ফাহীমা, ফেরদৌসী, সাকিয়া ইত্যাদি। আরো সুন্দর ও আকর্ষণীয় নাম দরকার? তাহলে পীরÑমাশায়েখ আলিম ওলামাদের শরণাপন্ন হোন।
আমরা এভাবে একে একে শিশুদেরকে তাদের বিভিন্ন অধিকার প্রদান করে তাদেরকে সুস্থ, সুন্দর জীবন লাভে সাহায্য করতে পারি।

মনিরুল ইসলাম রফিক অধ্যাপক, কলামিস্ট, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতীব

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 2918 People

সম্পর্কিত পোস্ট