চট্টগ্রাম শনিবার, ০৪ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন

চট্টগ্রামের চক্ষুচিকিৎসা, মানবসেবা ও আধুনিক হাসপাতাল ভাবনার এক অগ্রদূত

৩ জুলাই, ২০২৬ | ১০:৪৩ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের চিকিৎসা অঙ্গনে অধ্যাপক ডা. রবিউল হুসাইন একটি উজ্জ্বল ও শ্রদ্ধেয় নাম। তিনি ছিলেন একজন প্রথিতযশা চক্ষুবিশেষজ্ঞ, চিকিৎসা-শিক্ষক, স্বাস্থ্যসেবা সংগঠক এবং আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার দূরদর্শী চিন্তক। বিশেষ করে চট্টগ্রামের চক্ষুচিকিৎসা, কমিউনিটি অপথালমোলজি, প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান দীর্ঘদিন ধরে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে।

 

অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন MBBS, DO, FRCS England এবং FCPS ডিগ্রিধারী একজন অভিজ্ঞ চক্ষু বিশেষজ্ঞ। তিনি কমিউনিটি অপথালমোলজির অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেছেন এবং চট্টগ্রামভিত্তিক Institute of Community Ophthalmology–এর সঙ্গে একাডেমিক ও চিকিৎসাকার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। তাঁর কর্মজীবনের মূল দর্শন ছিল- চোখের চিকিৎসা যেন কেবল শহরের সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং দরিদ্র, গ্রামীণ, প্রান্তিক ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর কাছেও উন্নত চক্ষু চিকিৎসা পৌঁছে যায়।

 

চট্টগ্রাম আই ইনফার্মারি অ্যান্ড ট্রেইনিং কমপ্লেক্স, যা সাধারণ মানুষের কাছে পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল নামে পরিচিত, অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। এই প্রতিষ্ঠান শুধু একটি হাসপাতাল নয়; এটি বাংলাদেশের চক্ষুচিকিৎসা, চিকিৎসা-শিক্ষা, জনসচেতনতা, প্রশিক্ষণ এবং মানবসেবার একটি ঐতিহাসিক কেন্দ্র। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ও লালিত এই পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল বাংলাদেশের একটি দৃষ্টিনন্দন, সুসংগঠিত ও আধুনিক চক্ষুচিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
চোখের চিকিৎসার ক্ষেত্রে পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল বহু মানুষের অন্ধত্ব প্রতিরোধে, দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিতে এবং জটিল চক্ষুরোগের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ক্যাটারাক্ট সার্জারি, গ্লুকোমা, রেটিনা, শিশু চক্ষু চিকিৎসা, অকুলোপ্লাস্টিক, কম ভিশন রিহ্যাবিলিটেশন, কন্টাক্ট লেন্স, অপটিক্যাল সার্ভিসসহ আধুনিক চক্ষু হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় বহু সেবা এই প্রতিষ্ঠানে বিকশিত হয়েছে। ফলে চট্টগ্রাম ও আশপাশের অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ বিদেশে বা রাজধানীতে না গিয়েও উন্নতমানের চোখের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এই হাসপাতালে শিশুদের চোখের ক্যান্সার, বিশেষ করে রেটিনোব্লাস্টোমার ডায়াগনোসিস এবং চিকিৎসার ব্যাপারে বিশেষ নজর দেওয়া হয়।

 

এই হাসপাতালের আরেকটি ঐতিহাসিক অবদান হলো প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি। পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে প্রশিক্ষণ নিয়ে বহু দেশবরেণ্য চক্ষু চিকিৎসক বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করছেন। তাঁদের অনেকে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসা, শিক্ষা, সার্জারি ও জনস্বাস্থ্যভিত্তিক চক্ষু সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন বুঝেছিলেন, একটি দেশের চক্ষু চিকিৎসা উন্নত করতে হলে শুধু হাসপাতাল তৈরি করলেই হবে না; দক্ষ চিকিৎসক, প্রশিক্ষিত সহায়ক জনবল, অপ্টোমেট্রিস্ট, টেকনিশিয়ান এবং স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করাও সমান জরুরি।

 

চক্ষু চিকিৎসার allied branch বা সহযোগী শাখা হিসেবে অপ্টোমেট্রি শিক্ষার প্রসারেও তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অপ্টোমেট্রির মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত ক্ষেত্র যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। অথচ চোখের প্রাথমিক পরীক্ষা, রিফ্র্যাকশন, ভিশন কেয়ার, চশমা নির্ণয়, কম ভিশন সাপোর্ট এবং চক্ষু চিকিৎসকের কাজে সহায়তার ক্ষেত্রে অপ্টোমেট্রিস্টদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপ্টোমেট্রি পড়ানো, প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ডিগ্রি প্রদানের উদ্যোগ বাংলাদেশের চোখের চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

 

শুধু তাই নয়, অকুলারিস্ট সার্ভিস চালুর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি চোখ হারানো বা চোখের গুরুতর গঠনগত সমস্যায় ভোগা রোগীদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। একজন রোগীর চোখের চিকিৎসা শুধু দৃষ্টিশক্তির প্রশ্ন নয়; অনেক সময় এটি তার আত্মবিশ্বাস, সামাজিক জীবন, মানসিক সুস্থতা ও মর্যাদার সঙ্গেও যুক্ত। অকুলারিস্ট সার্ভিসের মতো সেবা চালু হওয়া তাই আধুনিক চক্ষুচিকিৎসার মানবিক ও পুনর্বাসনমূলক দিককে আরও শক্তিশালী করেছে।

 

অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের বড় অবদান ছিল তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তা। তিনি চিকিৎসাকে ব্যক্তিনির্ভর সীমাবদ্ধতার বাইরে নিয়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠাননির্ভর, প্রশিক্ষণনির্ভর ও দীর্ঘমেয়াদি সেবামুখী কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তিনি বুঝেছিলেন, একজন চিকিৎসক জীবদ্দশায় অনেক রোগীকে সেবা দিতে পারেন; কিন্তু একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লাখো মানুষকে সেবা দিতে পারে। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালকে চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও জনসচেতনতার একটি সমন্বিত কেন্দ্রে পরিণত করার কাজে নিজেকে নিবেদন করেছিলেন।

 

চক্ষু চিকিৎসার পাশাপাশি আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। চট্টগ্রামের Imperial Hospital Ltd–এর চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি উন্নতমানের বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশে tertiary care বা উচ্চতর চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, রোগীকেন্দ্রিক সেবা এবং দেশেই উন্নত চিকিৎসার সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তা ও নেতৃত্ব প্রাসঙ্গিক ছিল।

 

বাংলাদেশের বহু রোগী উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশে যান। অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন সেই বাস্তবতাকে গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন। তাঁর কর্মজীবন আমাদের দেখায়- সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা সম্ভব। পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল সেই সম্ভাবনার একটি শক্তিশালী উদাহরণ।

 

অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেন ছিলেন এমন এক চিকিৎসক, যিনি শুধু রোগীর চোখের চিকিৎসা করেননি; তিনি একটি জাতির দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করার কাজ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, চিকিৎসক সমাজ চাইলে হাসপাতাল গড়তে পারে, দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারে, নতুন পেশাগত ক্ষেত্রকে বিকশিত করতে পারে এবং দরিদ্র মানুষের কাছে বিশেষায়িত চিকিৎসা পৌঁছে দিতে পারে।

 

তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন শ্রেষ্ঠ নাগরিককে হারালো। চিকিৎসা অঙ্গন হারালো একজন দূরদর্শী শিক্ষক ও সংগঠককে। চট্টগ্রাম হারালো তার স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের এক নিবেদিতপ্রাণ পথপ্রদর্শককে। আর অসংখ্য রোগী, চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও স্বাস্থ্যকর্মী হারালো একজন অনুপ্রেরণাদায়ী অভিভাবককে।

 

অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের জন্য একটি বড় শিক্ষা- ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়েও বড় হলো মানুষের জন্য স্থায়ী প্রতিষ্ঠান রেখে যাওয়া। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ও গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান, তাঁর প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, এবং তাঁর সেবামূলক চিন্তা বাংলাদেশের চক্ষু চিকিৎসার ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রইলো আমাদের আন্তরিক সমবেদনা। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন এবং তাঁর পরিবার, সহকর্মী, ছাত্রছাত্রী ও শুভানুধ্যায়ীদের এই শোক সহ্য করার শক্তি দিন।

 

 

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট