মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানসহ কিছু ইস্যুতে চীনের সমর্থন লাভের প্রত্যাশাকে প্রাধান্য দিয়ে তিনদিনের (১৩-১৫ মে) জন্য চীন সফরে যান। এই সফরের সময়, গ্রেট হল অফ দ্য পিপল-এ শি জিনপিং ট্রাম্পকে অভ্যর্থনা জানান, যেখানে দুই নেতা আলোচনা করেন। শি ঘোষণা করেন যে, উভয় পক্ষ একটি গঠনমূলক ও কৌশলগত স্থিতিশীলতাসম্পন্ন চীন-মার্কিন সম্পর্ক স্থাপনে সম্মত হয়েছে। আলোচনার পর, শি এবং ট্রাম্প টেম্পল অফ হেভেন পরিদর্শন করেন। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের পর, তিনিই দ্বিতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি ক্ষমতায় থাকাকালীন এই মন্দির পরিদর্শন করলেন। পরে, শি গ্রেট হল অফ দ্য পিপল-এর গোল্ডেন রুমে ট্রাম্পকে একটি নৈশভোজে আপ্যায়ন করেন। গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুই নেতার মধ্যে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ করপোরেট নির্বাহীরা। যেমন টেসলার ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং। তবে জাঁকজমকপূর্ণ নৈশভোজ ছাড়া ট্রাম্পের এ সফর থেকে দৃশ্যমান অর্জন তেমন নেই বলছেন বিশ্লেকরা।
শীর্ষ বৈঠকে ইরানের যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তার বিষয়ে চীনের কোনো প্রকাশ্য অঙ্গীকারও পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাত বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায়ও প্রভাব ফেলেছে। ওয়াশিংটনের ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের চীনবিশেষজ্ঞ ক্রেইগ সিঙ্গেলটন বলেন, ‘এই শীর্ষ বৈঠক স্থিতিশীলতার বার্তা দিয়েছে, কিন্তু অচলাবস্থা ভাঙতে পারেনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক যতটা বহন করতে পারে, এটি মূলত ততটাই-সীমিত, সাফল্য হিসেবে প্রচারযোগ্য ও নিয়ন্ত্রিত ফলাফল।’ অনেক আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক বলেছেন- নিজেকে ‘মাস্টার নেগোশিয়েটর’ বা দর-কষাকষির কারিগর হিসেবে দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তিন দিনের চীন সফর শেষে তাঁর ঝুলিতে এক ব্যাগ ফুলের বীজের প্রতিশ্রæতি ছাড়া আর বড় কোনো অর্জনই নেই। প্রসঙ্গত, গত শুক্রবার বেইজিংয়ের পবিত্র ঝংনানহাই মন্দির পরিদর্শন করেন ৭৯ বছর বয়সী মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেখানে তিনি কিছু ফুলের প্রশংসা করলে চীনা নেতা শি চিনপিং তাঁকে সেই ফুলের বীজ পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেকদের মতে, এই সফরকে ট্রাম্প ‘অবিশ্বাস্য’ বলে বর্ণনা করলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি বা ক‚টনৈতিক সাফল্য ছাড়াই বেইজিং ছেড়েছেন তিনি। তাইওয়ান ইস্যু থেকে শুরু করে খনিজ সম্পদ, কোনো ক্ষেত্রেই চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেননি তিনি। উল্টো মার্কিন কৃষকদের স্বার্থ বিসর্জন এবং একটি অস্পষ্ট চুক্তির মাধ্যমে বোয়িংয়ের শেয়ারবাজারে ধস নামিয়ে ফিরেছেন তিনি।
উল্লেখ্য, প্রায় এক দশক পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের বেইজিং সফর, সঙ্গে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি, জ্বালানি, বিমান ও আর্থিক খাতের করপোরেট প্রধানদের বিশাল বহর-সব মিলিয়ে একে কেবল ক‚টনৈতিক সফর নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছিল।অ্যাপল, এনভিডিয়া, বোয়িং, অ্যাক্সনমবিল, সিটিগ্রুপ, টেসলা, মেটা- এমন বহু প্রতিষ্ঠানের শীর্ষনির্বাহীরা ট্রাম্পের সফরসঙ্গী ছিলেন। সফরের আগে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, এটি ‘চীনকে আরও উন্মুক্ত করার’ একটি বড় সুযোগ হতে পারে। কিন্তু সফর শেষে দেখা গেল, প্রত্যাশিত বড় কোনো বাণিজ্যচুক্তি হয়নি, নতুন শুল্ক সমঝোতা হয়নি, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়নি, এমনকি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামোগত বিরোধেরও দৃশ্যমান সমাধান আসেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ এখন প্রশ্ন তুলছে- ট্রাম্পের এই সফর কি শেষ পর্যন্ত ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’-এর উদাহরণ হয়ে গেল?
এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল মার্কিন করপোরেট জগতের মহারথীদের উপস্থিতি। ট্রাম্পপ্রশাসন মূলত দেখাতে চেয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের বড় ব্যবসাগুলো এখনও চীনাবাজারে প্রবেশ ও সম্প্রসারণে আগ্রহী। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি, বিমান ও ভোক্তা প্রযুক্তিখাতে নতুন সুযোগ তৈরির আশা ছিল। বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, সফরে অন্তত কয়েকটি বড় বিনিয়োগ চুক্তি বা বাজার উন্মুক্তকরণের ঘোষণা আসবে। চীন হয়তো মার্কিন কৃষিপণ্য, জ্বালানি বা বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দেবে। বাস্তবে সবচেয়ে বড় ঘোষণাটি ছিল চীনের সম্ভাব্য ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার আগ্রহ। কিন্তু এটিও আনুষ্ঠানিক চ‚ড়ান্ত চুক্তি হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি। বরং বাজারে আগে যে ৫০০ বিমানের সম্ভাব্য অর্ডারের আলোচনা ছিল, তার তুলনায় এটি অনেক ছোট হয়ে গেছে। ফলে বোয়িং ও জিই অ্যারোস্পেসের শেয়ারদর পর্যন্ত পড়ে গেছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স। উল্লেখ্য, বিশ্ব এখন এক গভীর রূপান্তরের যুগ অতিক্রম করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যে একমেরুকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, তার ভিত্তি ক্রমশ নড়বড়ে হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা প্রভাব এখনো শক্তিশালী, কিন্তু আর একচ্ছত্র নয়। এর বিপরীতে চীন অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ভ‚রাজনৈতিক প্রভাবের সমন্বয়ে এক নতুন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। রাশিয়া সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলোও নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরান প্রশ্ন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত আধিপত্য এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার পুনর্গঠন।
এই বাস্তবতায় ইরান আর শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি এখন বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য পরীক্ষার ক্ষেত্র। পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা বা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক উত্তেজনা- এসবের বাইরেও ইরান এখন বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরান একটি নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জ, চীনের জন্য জ্বালানি ও ভ‚রাজনৈতিক অংশীদার, রাশিয়ার জন্য পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত সেতু, আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য এটি একইসঙ্গে হুমকি ও বাস্তবতা। আর এই জটিলতার কেন্দ্রেই রয়েছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের একটি বড় অংশ এই সরু জলপথ দিয়ে যায়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা বিপর্যস্ত করতে পারে এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিকে ভয়াবহ চাপে ফেলতে পারে। হরমুজ আজ কেবল একটি ভৌগোলিক পথ নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির ধমনি। ফলে ইরান-পশ্চিমা উত্তেজনা এখন সরাসরি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত। চীন এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত হিসাবি দৃষ্টিতে দেখছে। বেইজিং জানে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা মানে তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়া। আবার তারা এটাও বোঝে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো এখনো তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ নয়। ফলে চীন এমন এক ভারসাম্যনীতি অনুসরণ করছে, যেখানে তারা একইসঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে, আবার পশ্চিমাবিশ্বের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিরোধেও যাচ্ছে না। চীনের এই কৌশলের ভিত্তি মূলত অর্থনৈতিক প্রভাব। তারা সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের চেয়ে বন্দর, অবকাঠামো, রেলপথ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মাধ্যমে তারা ইউরেশিয়াজুড়ে একটি বিকল্প অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে চায়। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি ও অবকাঠামো সহযোগিতাও সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীনের সঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক টিকে থাকার অর্থ হলো- বিশ্বব্যবস্থা এখন আর পুরোপুরি পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণে নেই।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখন এক কৌশলগত দ্বিধার মধ্যে আটকে আছে। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ ও জোট-রাজনীতির মাধ্যমে বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রেখেছে। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার, ইরাকযুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে না পারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে। ফলে ইরান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবস্থান বজায় রাখলেও পূর্ণমাত্রার সংঘাতে যেতে চাইছে না। এই দ্বৈততা তাদের নীতিকে দুর্বল ও অস্পষ্ট করে তুলছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিন পিংয়ের সাম্প্রতিক বৈঠকও এই বাস্তবতার প্রতিফলন। বহুল আলোচিত বৈঠকে বড় কোনো অগ্রগতি না হলেও উভয়পক্ষই বুঝিয়েছে যে তারা সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি কমাতে চায়। বাণিজ্যযুদ্ধ, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ও তাইওয়ান প্রশ্নে উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও দুই দেশই এখন ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র পথে হাঁটছে। এটিই বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বাস্তবতা-সংঘাত ও সহযোগিতা একইসঙ্গে চলছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘থুসিডাইডিস ফাঁদ’-এর ধারণা নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিস বলেছিলেন, এথেন্সের উত্থান স্পার্টার মধ্যে যে ভীতি তৈরি করেছিল, সেটিই যুদ্ধকে অনিবার্য করেছিল। আধুনিক ভ‚রাজনীতিতে চীনের উত্থান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াকে অনেকে সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসন এই ধারণাকে জনপ্রিয় করে দেখিয়েছেন, ইতিহাসে উদীয়মান ও প্রতিষ্ঠিত শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহুবার যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা অতীতের চেয়ে ভিন্ন। কারণ এখন বিশ্ব অর্থনীতি এতটাই আন্তঃনির্ভরশীল যে পূর্ণমাত্রার সংঘাত উভয় পক্ষের জন্যই বিপর্যয়কর হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পরস্পরের বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, বিনিয়োগ ও উৎপাদন-সবকিছু এত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত যে বিচ্ছিন্নতা সহজ নয়। ফলে উভয়পক্ষ এখন প্রতিযোগিতার মধ্যেও সহাবস্থানের পথ খুঁজছে। চীনের ভাষায় এটি ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’; যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় ‘কৌশলগত প্রতিযোগিতা’। শব্দ আলাদা হলেও বাস্তবতা একই- কেউই সরাসরি সংঘাত চায় না, কিন্তু কেউই প্রভাব হারাতেও রাজি নয়। এই কারণেই বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সহাবস্থান’ বলা যায়।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন শুধু সামরিক বা ক‚টনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তি হয়ে উঠেছে নতুন শক্তির মানদণ্ড। সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং ডেটা নিয়ন্ত্রণ- এসব ক্ষেত্র এখন ভ‚রাজনীতির কেন্দ্রে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রযুক্তিগত উত্থান ঠেকাতে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করছে। অন্যদিকে চীন প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা অর্জনের জন্য বিশাল বিনিয়োগ করছে। ফলে বিশ্ব এখন নতুন ধরনের ‘প্রযুক্তি স্নায়ুযুদ্ধ’-এর দিকে এগোচ্ছে।
তাইওয়ান প্রশ্ন এই প্রতিযোগিতাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। কারণ এটি কেবল একটি দ্বীপের রাজনৈতিক অবস্থান নয়; এটি প্রযুক্তিগত সরবরাহব্যবস্থা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে জড়িত। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যেকোনো সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। উপসাগরীয় দেশগুলো এখন আর এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করছে না। তারা নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা কাতারের মতো দেশগুলো এখন বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ করছে। এই পরিবর্তনই প্রমাণ করে যে বিশ্বব্যবস্থা ক্রমশ বহুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।
ইউরোপও এই পরিবর্তনের মধ্যে দ্বিধাগ্রস্ত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা জোটের অংশ, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। ফলে ওয়াশিংটনের কঠোর অবস্থানের সঙ্গে ব্রাসেলসের বাস্তববাদী অবস্থানের পার্থক্য বাড়ছে। ইরান প্রশ্নেও ইউরোপ সম্পূর্ণ সামরিক সংঘাতের বদলে ক‚টনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এই বিভক্তি ইরানের জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি করছে। কারণ আন্তর্জাতিক অবস্থানের ভিন্নতা ইরানকে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে আলাদা সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ দিচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না, কারণ বিকল্প অর্থনৈতিক ও ক‚টনৈতিক পথ তৈরি হয়েছে। চীন ও রাশিয়ার সমর্থন ইরানকে টিকে থাকার নতুন সক্ষমতা দিয়েছে। তবে এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে উন্নয়নশীল বিশ্ব। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার সংকট, মুদ্রাস্ফীতি ও বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করছে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিদ্বতা বিশ্ব অর্থনীতিকে এমন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে দুর্বল রাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই কারণেই চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শুধু দুই দেশের বিষয় নয়; এটি পুরোবিশ্বের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। তারা যদি প্রতিযোগিতাকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে পারে, তাহলে বহুকেন্দ্রিক কিন্তু স্থিতিশীল একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি ভুল হিসাব, অতিরিক্ত অবিশ্বাস বা আঞ্চলিক সংঘাত পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়, তাহলে বিশ্ব নতুন এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার যুগে প্রবেশ করবে।
ইরান সংকট, হরমুজ প্রণালি, তাইওয়ান প্রশ্ন, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা- সবকিছু মূলত একই বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ। এটি হলো ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের যুগ। এই যুগে আর কোনো একক শক্তি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। বরং ভবিষ্যৎ বিশ্ব নির্ধারিত হবে বহুমুখী ক্ষমতার ভারসাম্য, অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা এবং কৌশলগত সহাবস্থানের মাধ্যমে। সুতরাং বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে কেবল সংঘাতের দৃষ্টিতে দেখলে ভুল হবে। এটি একইসঙ্গে পুনর্গঠন, পুনর্বিন্যাস ও নতুন বাস্তবতার জন্মের সময়। এই পরিবর্তনের মধ্যেই বিশ্ব নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে- যেখানে আধিপত্যের বদলে ভারসাম্য, একক নেতৃত্বের বদলে বহু-কেন্দ্রিকতা এবং সরাসরি যুদ্ধের বদলে নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হবে মূল বৈশিষ্ট্য। শেষপর্যন্ত প্রশ্ন একটাই- বিশ্ব কি ইতিহাসের পুরোনো ভুল থেকে শিক্ষা নেবে, নাকি আবারও ভয়, সন্দেহ ও ক্ষমতার প্রতিযোগিতার ফাঁদে আটকে পড়বে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।
আবসার মাহফুজ সাংবাদিক,
গ্রন্থকার; নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিটিক্যাল স্টাডিজ এন্ড রিসার্চ (সিপিএসআর)।
















