জলাবদ্ধতা বর্তমান বাংলাদেশের একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা। বড় শহরগুলোতে দিনদিন এটি আতংকের নাম। নব্বই দশকে ঢাকায় এটি প্রকট ছিল যা নানা উদ্যোগে ইতোমধ্যে অনেকখানি কমে এসেছে। অপরদিকে, চট্টগ্রামে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বৃষ্টি হলেই দশ মিনিটে ডুবে যায় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো। নগর কর্তৃপক্ষের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তার উপর সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, এবং বিভিন্ন নির্মাণ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিজেদের মধ্যে সমন্বয় তো নেই বরং আছে দ্বন্দ্ব। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর দোষারোপের চাপে জলাবদ্ধতা এখন স্থায়ী সমস্যায় রূপ নিয়েছে।
জলাবদ্ধতার সমস্যা সাধারণত সারাবছর উপেক্ষিত থাকে এবং মৌসুমের প্রথম বৃষ্টি পড়ার সাথে সাথেই আলাপটি শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাস্যরসের ও ব্যঙ্গবিদ্রুপের সৃষ্টি হয়। সব শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত হয়ে কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে। এটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হলেও প্রশ্ন থাকে এর কতটা সমাধানের উদ্দেশে করা, আর কতটা কেবল তাল মেলানো। চট্টগ্রামের বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আগে থেকেই জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল ও ড্রেন পরিস্কার করা এবং বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার বিষয়ে সক্রিয় ছিলেন। সংসদ অধিবেশনেও গুরুত্ব পেয়েছে বিষয়টি এবং স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে দু:খপ্রকাশ করেছেন। তবুও বাস্তবতা হলো এ সমস্যার সমাধান হয়নি।
জলাবদ্ধতা পৃথিবীর অনেক শহরেরই একটি বড় সমস্যা। এল নিনো ও লা নিনা সহ নানা বৈশ্বিক জলবায়ুগত পরিবর্তন আবহাওয়াকে অস্থিতিশীল ও পূর্বাভাস-অযোগ্য করে তুলছে। অতএব, কর্তৃপক্ষ ও সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদের দায় ও দায়িত্ব নিয়েও কথা বলতে হবে এবং আমাদের আচরণে গুণগত পরিবর্তন আনতে হবে। এ বিষয়ে কিছু ভাবনা তুলে ধরা হলো।
প্রথমত, জলাবদ্ধতার জন্য প্রধানতম দায়ী একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন ব্যাগ। ৩ জুন ২০২৩ এ দ্য ডেইলি স্টার এর খবরে প্রকাশ, একটি গবেষণা প্রবন্ধ অনুযায়ী বাংলাদেশে দৈনিক প্রায় ৪৬ মিলিয়ন পলিথিন ব্যবহার হয় এবং তার মোট পরিমাণ বছরে ২৭৩ মিলিয়ন কেজি। আমরা যখন বাজারে যাই তখন প্রতিটি জিনিসের জন্য আলাদা পাতলা পলিথিন ব্যাগ নেই এবং অনেক সময় বাসায় পলিথিনের স্তূপ হয়ে যায়। ভ্যানগাড়ি ও ফুটপাত থেকে সুপারমার্কেট কোন জায়গা বাকি নেই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সুপারমার্কেটে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো এবং পরে কাঁচাবাজারেও এটি চালুকরা হয়। অথচ মাঠপর্যায়ের চিত্র কি তা আমরা সবাই জানি। কাঁচা মরিচ থেকে ঔষধ এমনকি গরম চা পর্যন্ত পলিথিন ব্যাগে নেয়া হয়। এর স্বাস্থ্যঝুঁকি তো আছেই, শেষতক ব্যাগের ঠাঁই হয় ড্রেনে বা’ জলাশয়ে। যতদূর মনে পড়ছে ২০০২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার পলিথিন নিষিদ্ধ করেছিলো। কিন্তু পলিথিন ব্যবহারকারীদের উপর আইন করার আগে তা উৎপাদন ও বিপনন বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উন্নত দেশে বর্জ্যব্যবস্থাপনা অত্যন্ত আধুনিক এবং স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড। ইংল্যান্ডে দেখেছিলাম এমন গাড়ি যা চলতে চলতেই অনেক ময়লা রিসাইকল করে ফেলে। ওরা সেখান থেকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ নানান কিছু তৈরি করে। সম্প্রতি বাংলাদেশে এসব গাড়ি আনা হয়েছে তবে তা সংখ্যায় অপ্রতুল। তিনধরনের ডাস্টবিন ব্যবহার করতে হবে যাতে পচনশীল বর্জ্য যা রান্নাঘর ও খাবারের তা আলাদা থাকবে। অন্যটিতে প্লাস্টিক, পলিথিন ও রিসাইক্লেবল বর্জ্য থাকবে এবং অন্যটিতে বিষাক্ত বর্জ্য বা ঝুঁকিপূর্ণ জিনিস থাকবে। প্রতিটি ডাস্টবিন আলাদা রঙ দ্বারা চিহ্নিত থাকবে। নগর কর্তৃপক্ষের দায় হলো এটি সঠিকভাবে তদারকি করা। রিসাইকেল খাতে আরো প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রকৌশলী নিয়োগ দিয়ে এটিকে বিশ্বমানের করে সাজাতে হবে। বর্জ্য থেকে জ্বালানি তৈরি করা এ যুগে কঠিন কিছু নয়, অতএব এক্ষেত্রে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। তৃতীয়ত, স্কুল থেকে সব শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলা এবং যার যার বাড়ির সামনের ড্রেন নিজ দায়িত্বে পরিস্কার রাখার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রয়োজনে তাদের পড়ার বিষয়ের সাথে দশ বা বিশ নম্বরের এসাইনমেন্ট যুক্ত করা যেতে পারে। এলাকাভিত্তিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের র্যালী ও অভিযান শুরু করে তাদের মা বাবা ও স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা যেতে পারে। ড্রেনে প্লাস্টিক বা পলিথিন ফেলা জরিমানা বা শাস্তিযোগ্য করা যেতে পারে।
চতুর্থত, ড্রেনেজ সিস্টেম ঢেলে সাজাতে হবে প্রতিটি শহরেই। চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ জলাবদ্ধতা প্রবণ এলাকায় উঁচ নিচু জায়গার সমন্বয় করে পানি নিচের দিকে চলে যাবার পথ প্রসারিত করতে হবে। এর জন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পুরকৌশল বিভাগগুলোকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন প্রকল্প (থিসিস) দিয়ে দিলে সেখানে মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও গবেষণা করে সমাধান আসবে।
পঞ্চমত, যে কোন প্লাস্টিক বোতলে কিছু কিনতে চাইলে এর জন্য পূর্বের ব্যবহৃত একটি সম-আকারের প্লাস্টিকের বোতল জমা দিতে হবে। এর জন্য ২-৫ টাকা আকারভেদে মূল্যছাড় দেয়া যেতে পারে। এতে করে প্লাস্টিক বর্জ্যের মূল পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। যেমন, কেউ যদি ত্রিশ টাকায় এক লিটার পানি কেনেন তাহলে তাকে একটি খালি বোতল জমা দিতে হবে এবং তখন তাকে ২৫/২৮ টাকা দিলেই হবে। এটি ঐচ্ছিকও করা যেতে পারে।
এ সুন্দর দেশটি আমাদের। এরকম উদার নীলাকাশ, আদিগন্ত মাঠ, পাহাড়, সাগর, নদী হাওড়ের বৈচিত্র্য খুব কম দেশেরই আছে। আমরা বিদেশ থেকে এসে ওখানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ এবং সেখানে গেলে আমরা ময়লা ফেলিনা বা ফেলতে চাইলেও পারিনা। তাহলে নিজের দেশে কেন এ দ্বিচারিতা ও যথেচ্ছোচার? জলাবদ্ধতার অনেকটা কমে যাবে যদি আমরা দায়িত্বশীল আচরণ করি।
ইফতেখারুল আজম। শিক্ষক, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।
পূর্বকোণ/কায়ছার
















