চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ:

মাতারবাড়ী : জাতীয় অর্থনীতির গেম চেঞ্জার

রশীদ আহমেদ চৌধুরী

১৪ মে, ২০২৬ | ১২:২১ অপরাহ্ণ

মাতারবাড়ী, কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের মধ্যে একটি ইউনিয়ন। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেষে চর জেগে গড়ে উঠা এ ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দেশের সর্বকালের সর্ববৃহৎ মেগাপ্রকল্পসমূহ ‘গভীর সমুদ্র বন্দর’, ‘কয়লাবিদু্যুত প্রকল্প’, এসপিএম (সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং) গভীর সমুদ্র থেকে পাইপ লাইনে জ্বালানী তেল খালাস প্রকল্প, এফটিএ (ফ্রি ট্রেড এরিয়া) ও পর্যটনসহ আরও অনেক প্রকল্প। আর এসব প্রকল্পকে ঘিরে মাতারবাড়ী হয়ে উঠছে জাতীয় অর্থনীতির গেম চেঞ্জার।

 

মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে বাস্তবায়িত হচ্ছে জাতীয় ও অঞ্চলিক অর্থনৈতিক করিডোর, যা  MIDI( MOHESHKHALI INTEGRATED DEVELOPMENT INITIATIVES) নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত। এ করিডোর বাংলাদেশ, ভারত নেপাল, ভ‚টান, চীনসহ বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের দেশসমূহের মধ্যে আন্ত যোগাযোগের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। যার ফলে সমগ্র বিশ্বে ভ‚রাজনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে তিনটি হাব (কেন্দ্র) যথাক্রমে লজিষ্টিক হাব, বিদ্যুত ও জ্বালানি হাব এবং বাণিজ্য ও শিল্পহাব গড়ে উঠেছে। এ হাবগুলিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে জাতীয় ও আঞ্চলিক সহযোগিতা উন্নয়নের প্রধান্য-বিস্তারকারী খাত- যেমন, যোগাযোগ ও পরিবহন, সংযোগ শিল্প, তথ্য প্রযুক্তি, এফটিএ, (ফ্রি ট্রেড এরিয়া) ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন ও এফডিআই (ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট) ইত্যাদি।

 

মাতারবাড়ী, জাতীয় অর্থনীতির গেমচেঞ্জার হবার জন্য অনেক গুলো মেঘা প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্প’। এটি শুধুমাত্র একটি বন্দর নয় বরং, এটি হচ্ছে একটি সমন্বিত শিল্প ও বাণিজ্যিক হাব, যা জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমুদ্রবাণিজ্যে দক্ষিণ এশিয়াসহ সমগ্র বিশ্বে একটি যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। জাইকা (জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশণ এজেন্সি) এর অর্থিক ও কারিগরী সহযোগিতায় বাস্তবায়নাধীন এ মেঘা প্রকল্প ২০২০ সালের ১০ মার্চ একনেক কমিটিতে পাস হয় যা ২০২৯ সালে বাস্তবায়নযোগ্য। প্রথমদিকে যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিলো, ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। যা পরবর্তীতে সংশোধিত হয়ে ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা করা হয়। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ প্রকল্প জিডিপিতে ২ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলার যোগ করতে পারবে, যা মোট জিডিপির শতকরা ২-৩ শতাংশ। হাজার হাজার লোকের সর্মসংস্থান হবে। এ বন্দর যেটিতে ৮ থেকে ১০ হাজার TUES ( TWENTY FEET EQUIVALENT UNITS) কন্টেনারবাহী বড় মাদার ভ্যাসেল, যা ১৬ থেকে ১৮ মিটার ড্রাপ্ট সম্পন্ন ভিড়তে পারবে। চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়তে পারে ১০.৫ মিটারের ড্রাপ্টের জাহাজ। এর ফলে সিঙ্গাপুর, কলম্বো ও মালেশিয়া বন্দরে ফিডার ভ্যাসেল করে কন্টেইনার ট্রান্সশিপমেন্টের দরকার হবে না। যা কন্টেনার প্রতি আনুমানিক ১০০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত খরচ কমবে। বর্তমানে আমেরিকাতে ১টি চালান পৌঁছাতে ৪৫দিন সময় লাগে বন্দর চালু হলে তা ২৩ দিনে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এরই মধ্যে ১.৭ কি.মি ব্রেকওয়াটার (সমুদ্রপ্রাচীর) নির্মাণ করা হয়েছে সমুদ্র শাসন করার জন্য। ইতিমধ্যে ১৪.৩ কি.মি দ্যৈর্ঘ ও ৩৫০ কিমি চওড়ার ও ১৬ মিটার গভীরতার দুটি কৃত্রিম চেনেল নির্মাণ করা হয়েছে। দুইটি জেটি নির্মান করার জন্য পেন্টাওশান (জাপান) ও টোয়া কর্পোরেশন (জাপান) এর সাথে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। জাতীয় এ ফাস্ট ট্রাক প্রকল্পে জাইকার সহযোগিতায় ২য় সংশোধিত ডিপিপি একনেকে (০৭-১০-২০২৫) অনুমোদিত হয়, যা দেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। সম্প্রতি সংযুক্ত আরব, জাপান, সৌদিয়া ও সিঙ্গাপুরের প্রতিনিধি দল মাতারবাড়ি পরিদর্শন করছেন। তারা ওখানে মেরিটাইম আবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ, এফটিএ, শিপইয়ার্ড নির্মাণসহ আরও বহুবিধ শিল্পকারখানা নির্মানে বিনিযোগ সম্ভাবতা যাচাই করেন। ইতিমধ্যে বন্দর টার্মিনাল ও বেটার্মিনাল নির্মানের জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে ৫ মিলিয়ন TUES কন্টেইনার হেন্ডেলিং এর লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে।

 

এ প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে গেম চেঞ্জার হলেও স্থানীয় অধিবাসিদের জীবনে এ প্রকল্প আর্শিবাদ না হয়ে বরং ক্ষেত্র বিশেষে অভিশাপ ডেকে এনেছে। স্থানীয়রা তাদের ভিটামাটি লবণখেত ও চিংড়ি চাষের জমি হারিয়েছে। শতবছরের পেশা হারিয়েছে। প্রকল্পের নিক্ষিপ্তর র্বজ নদী ও সাগরের জল, বায়ু মাটি, দুষিত করেছে। মাছ ও অন্যান্য জলজ জীবের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে। বায়ুদুষণের ফলে জনস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। স্থানীয়রা প্রকল্পে কাজ পাচ্ছে না। বহিরাগত ঠিকাদার ও শ্রমিকের দাপট বেড়েছে। পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও পূর্ণবাসন না করার ফলে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তষ দানা বাধছে। বাইরের জেলা থেকে বিশাল জনস্রোত  আসার ফলে জীবনযাত্রার ব্যায় বেড়েছে। তাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবন নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।

 

রশীদ আহমেদ চৌধুরী, আয়কর ও ভ্যাট কনসালটেন্ট (এনবিআর)

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট