এটি সর্বজনবিদিত যে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আর্থিক সংকট উত্তরণে যেকোন জাতিরাষ্ট্রে বৈদেশিক বিনিয়োগের অবদান সমধিক তাৎপর্যপূর্ণ। উদাহরণ স্বরূপ ১৯৮০ এর দশকে লাতিন আমেরিকান আর্থিক সংকট, ১৯৯৪-৯৫ সালের মেক্সিকান সংকট, ১৯৯৭-৯৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট এবং কোভিড-১৯ মহামারি পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বৈদেশিক বিনিয়োগের ভূমিকা ছিল আশাব্যঞ্জক। বিভিন্ন অভিজ্ঞতালব্ধ গবেষণা মতে, বৈদেশিক বিনিয়োগ একটি দেশের মোট বিনিয়োগ ও দক্ষতা বৃদ্ধি-রপ্তানি উদারীকরণ এবং প্রযুক্তিগত ব্যাপকতার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করে থাকে। এটি দেশের পুঁজি অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানুষের সক্ষমতা-দক্ষতা বিকাশে প্রচন্ড সহায়ক। ফলশ্রুতিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশ্বের বহু দেশসমূহের মধ্যে একে অপরের মধ্যে প্রতিযোগিতা অতিশয় দৃশ্যমান।
বিগত কয়েক বছরে বৈশ্বিক বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার ফলে এর মাত্রা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, উচ্চ খাদ্য-জ্বালানি মূল্য ও ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির কারণে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগের পরিমাণ ১২ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে উপনীত হয়। ২০২৩ সালে তা ২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মন্থর বিশ্ব অর্থনীতির কারণে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে বেশিরভাগ দেশই নতুন করে তাদের জাতীয় নীতি প্রণয়ন করছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ছিল হতাশাব্যঞ্জক। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জিডিপির বিপরীতে বাংলাদেশ অনেক দেশ থেকে পিছিয়ে ছিল। ২০২৩ সালে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল ৩ বিলিয়ন ডলার। যদিও বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী জিডিপির বিপরীতে বাংলাদেশে এই বিদেশি বিনিয়োগের পরিমান দেড় শতাংশেরও কম। অথচ বিগত সময়ে চরম অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সংকটে দেওলিয়া হওয়া শ্রীলঙ্কায় বিদেশি বিনিয়োগ জিডিপির ২০ শতাংশেরও বেশি। এদেশে বিনিয়োগকারীদের উপার্জিত আয় স্ব স্ব দেশে ফেরত নেওয়ার ভোগান্তি, অস্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে আগের বছরের তুলনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের নেট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে নেট বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছর শেষে যা ছিল ১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১৪২ মিলিয়ন ডলার।
উল্লেখ্য প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আসা পোশাক ও বস্ত্র খাতেও গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ১৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। ঐ সময়ে খাতটিতে বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছিল ৪৪ কোটি ডলার। এরপরে ব্যাংক খাতে ২৩ কোটি, রাসায়নিক ও ঔষধ শিল্পে ১২ কোটি, গ্যাস ও পেট্রোলিয়ামে ১২ কোটি, টেলিকমিউনিকেশনে ১০ কোটি, কৃষি ও মৎস আহরণে ৬ কোটি এবং চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ৫ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। তন্মধ্যে রাসায়নিক ও ঔষধ এবং কৃষি ও মৎস আহরণ ব্যতিত প্রায় সবখাতে বিদেশি বিনিয়োগ পূর্বের অর্থবছরের তুলনায় কমেছে। তাছাড়া সামগ্রিকভাবে এফডিআই কমে যাওয়ায় কমেছে নতুন বিনিয়োগ (ইকুইটি) ও পুনর্বিনিয়োগও। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ১৪৬ কোটি ডলারের বিনিয়োগের মধ্যে ৪৫ শতাংশ বা ৬৭ কোটি ডলার হচ্ছে নতুন বিনিয়োগ। নতুন বিনিয়োগ আসার হারও গত দুই অর্থবছর ধরেই কমছে। পক্ষান্তরে ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৭৯ কোটি ডলারের পুনর্বিনিয়োগের বিপরীতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে পুনর্বিনিয়োগ হয়েছে ৬১ কোটি ডলার। সর্বশেষ ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকেও দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
খাত সংশ্লিষ্টদের অভিমত, ২০২৫ সালে রাজনৈতিক বাস্তবতা নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতার বড় কারণ। দেশে নির্বাচিত সরকার না থাকায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ নীতি-পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তায় দেশি উদ্যোক্তাদের মতো বিদেশিরাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ছিল। এখন নির্বাচিত সরকার বিনিয়োগ পরিবেশের দিকে নজর দিলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি অনুভূত। তাছাড়া বর্তমানে বিনিয়োগের বড় বাধা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা এবং ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের ওপর। এলএনজি আমদানি ব্যয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে শিল্পখাতে। গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চিয়তার ফলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি বড় নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের মতে, বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাসে দায়ী সর্বাধিক আলোচিত কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সকল পর্যায়ে অবকাঠামো অপ্রতুলতা, দ্বৈত করনীতি, অপ্রত্যাশিত নীতি, কাস্টমস জটিলতা, ব্যবসা পরিচালনায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ইত্যাদি। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে আস্থার সংকট। প্রাসঙ্গিকতায় ২৯ এপ্রিল ২০২৬ মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সংলাপে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের সভাপতি বলেন, ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে অনেক কথা বলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজের কাজ কিছু হয় না। করপোরেট কর কমানোর আশ্বাস দেওয়া হয়, অথচ বাস্তবে আরও বেড়ে যায়। যারা কমপ্লায়েন্ট বা রীতিনীতি মেনে চলে তাদের ওপরই বোঝা চাপানো হয়। ডিজিটাল ট্যাক্সেশনের কথা বলা হয়, অথচ আসে কাগজ। বছরের পর বছর ধরে কথায় আর কাজে মিল না থাকায় বিনিয়োগকারীরা আস্থার সংকটে ভোগেন।’
২৭ এপ্রিল ২০২৬ জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও আঙ্কাডের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশের বিনিয়োগ নীতি সংস্কারে গতি আনতে সমন্বিত জাতীয় বিনিয়োগ নীতিমালা, একীভূত আইন এবং ডিজিটাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মতো অগ্রাধিকারমূলক সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আঞ্চলিক সহযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার চিত্রও তুলে ধরা হয়। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যানের ভাষ্য, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিনিয়োগ পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জের মুখে থাকলেও বাংলাদেশ এই সময়কে প্রস্তুতি জোরদারের সুযোগ হিসেবে দেখতে চায়। এখন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বাস্তবায়ন, সমন্বয় এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য পূর্বাভাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর। তিনি আরও জানান, ২০১৩ সালের তুলনায় এফডিআই পরিস্থিতিতে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার প্রায় স্থির রয়েছে বরং কিছুটা কমেছে। অনেক পরিকল্পনা ও প্রতিবেদন হলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও গতিশীল করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের উদ্যোগ আশাজাগানিয়া। বাজেট প্রস্তাবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তন্মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪ দশমিক ৯ এবং সরকারি খাতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বাজেটে প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলো হচ্ছে- অর্থনৈতিক অঞ্চল সম্প্রসারণ ও দেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) জোরদার করা, ডিজিটাল সেবা বৃদ্ধিসহ নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে স্টার্টআপ সহায়তা ও বিশেষ তহবিল গঠন ইত্যাদি। অর্থ বিভাগের মতে, এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং উৎপাদন ও রপ্তানি নতুন করে উজ্জীবিত হবে। সম্মানিত অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী জনাব আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিনিয়োগনির্ভরতাকে সামনে রেখে বাজেট পরিকল্পনা করা হবে বলে জানিয়েছেন। তিন বলেন, ‘ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে যেতে চায় বর্তমান সরকার। আমরা এখন টাকা ছাপাতে চাই না। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে চাই। দেশী ও বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে এবং এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।’
অতিসম্প্রতি অনুষ্ঠিত মন্ত্রীপরিষদ বৈঠকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ থাকা সরকারি কল-কারখানাগুলোতে যারা আন্তরিকভাবে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মোদ্দাকথা বিপুল সংখ্যক বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের বিকল্প নেই। সুযোগ-সুবিধার অধিকতর সম্প্রসারণ ঘটিয়ে বিদেশে অবস্থানরত দূতাবাসগুলোকে সক্রিয় করে বিনিয়োগের নতুন নতুন ক্ষেত্র অবশ্যই সংকট উত্তরণে ভূমিকা রাখবে। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বর্তমান সরকারের সকল ইতিবাচক প্রচেষ্টা সার্থক হউক। সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা ফলপ্রসূ করে এর যথাযথ দৃশ্যমানতাই সর্বাগ্রে প্রত্যাশিত।
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী শিক্ষাবিদ।


















