বিশ্বজুড়ে তীব্র খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের অবস্থান মাত্র ১০টি দেশে, আর সেই তালিকায় বাংলাদেশের নামও রয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা ‘ গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ শিরোনামের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ২৪ এপ্রিল প্রকাশিত ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ওই প্রতিবেদনে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের বসবাসকারী দেশগুলো হচ্ছে- আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া ও ইয়েমেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের ১ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ‘সংকটজনক পর্যায় ৩’-এ ও ৪০ লাখ মানুষ ‘জরুরি পর্যায় ৪’-এর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ছিল।
প্রতিবেদনে অবশ্য বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বড় কোনো দুর্যোগ না হওয়া, খাদ্যমূল্যস্ফীতি কমে আসা ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি। তবে বাংলাদেশ ও সিরিয়ার মতো কিছু দেশে পরিস্থিতি উন্নতি হলেও আফগানিস্তান, কঙ্গো, মিয়ানমার ও জিম্বাবুয়েতে উল্লেখযোগ্য অবনতি দেখা গেছে। বাংলাদেশকে ‘মাঝারি মাত্রার পুষ্টিসংকট’ থাকা দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বার্ষিক প্রতিবেদনটিতে আন্তর্জাতিক সাহায্য দ্রæত কমে যাওয়ার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। একইসঙ্গে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ চলমান সংকটগুলোকে আরও গভীর করতে পারে। কারণ, একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে জ্বালানি সংকটে চাষের মৌসুমে সার উৎপাদনের খরচ বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়েছে, যা ২০১৬ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। মূলত দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত এবং চরম বৈরী জলবায়ু পরিস্থিতি এই ভয়াবহ সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ২০২৬ সালেও দেশগুলোতে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতির সম্ভাবনা নেই। বরং অনেক দেশে এই সংকট আরও ঘনীভ‚ত হতে পারে।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের প্রধান আলভারো লারিও বলেছেন, ‘রোপণের মৌসুমে জ্বালানি ও সারের দাম বৃদ্ধি খাদ্য উৎপাদনের ওপর বড়ধরনের প্রভাব ফেলবে।’ এই সংকট থেকে উত্তরণে তিনি স্থানীয়ভাবে সার উৎপাদন বৃদ্ধি, মাটির গুণগত মান উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল ফসলের চাষে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা না নিলে খাদ্যসংকট আরও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মি. আলভারে।
বাংলাদেশের করণীয় : বিশ্বব্যাপী চলমান খাদ্য ও জ্বালানি সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে (রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে) খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ায় বাংলাদেশেও সম্ভাব্য খাদ্য সংকট এড়াতে জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। খাদ্যসংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য করণীয় পদক্ষেপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো।
খাদ্য অপচয় রোধ : খাদ্যসঙ্কট মোকাবিলা ও খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্য অপচয়রোধের পরিকল্পনার বিকল্প নেই। বাংলাদেশে প্রতিবছর যত খাবার উৎপাদন হয়, তারও একটি বড় অংশ ভাগাড়ে যায়, মানে নষ্ট হয়। জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা ইউনেপ ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স নামে রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে এক কোটি ৪০ লাখ টন খাদ্য অপচয় হয়। মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ের হারও বাংলাদেশে বেশি। ইউনেপের ওই ইনডেক্স অনুযায়ী একজন বাংলাদেশি বছরে ৮২ কেজি খাদ্য উপাদান কিংবা তৈরি খাদ্য নষ্ট করেন যা যুক্তরাষ্ট্র (৭৩ কেজি) ও যুক্তরাজ্যের (৭৬ কেজি) চেয়ে বেশি । তাই মাঠ থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতে উৎপাদন, বাজারজাত, প্রক্রিয়াজাত, বিপণন ও পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি খাদ্য অপচয় রোধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলা : ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে টালমাটাল জ্বালানি বাজার। বিশ্ববাজারে ক্রমাগতভাবে বাড়ছে জ্বালানির দাম। জ্বালানির এই সংকটে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে গোটা অর্থনীতি। পণ্য পরিবহনে বাড়ছে খরচ। ডিজেল না পেয়ে কৃষি সেচও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে বন্ধ হচ্ছে সার কারখানাও। এর ফলে আসন্ন মৌসুমে সারের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। এর প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদনেও। আমদানির্ভর জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের কারণে এই সংকট তীব্রতর হয়েছে, যা সরাসরি উৎপাদনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির শঙ্কাও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহে বিঘœ ঘটায় সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় দেশের জনগণের প্রতি ৫টি নির্দেশনা দিয়ে সহযোগিতার আহŸান জানিয়েছে সরকার। নির্দেশনাগুলো হলোÑবিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া; সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার করা; ব্যক্তিগত যানবাহন কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহার; খোলাবাজারে ডিজেল, পেট্রোল বিক্রি রোধে ব্যবসায়ীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হওয়া এবং জ্বালানি পাচার রোধে জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও বিজিবিকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।
বাংলাদেশের জন্য এখনই সময় বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ, বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে। প্রসঙ্গত, চলতি মাসের শুরুতেই আইএমএফ, বিশ্ব ব্যাংক এবং ওয়র্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম গোটা বিশ্বকে খাদ্যপণ্যের চড়া দাম ও খাদ্যসঙ্কট নিয়ে সতর্ক করে দিয়েছে। এ জন্য পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ এবং সেই কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সঙ্কটকেই মূলত দায়ী করেছে তারা।
খাদ্য সংরক্ষণ : সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে দেশে ৫ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতার ৮টি অত্যাধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণ করা হচ্ছে। যদিও বরিশাল বিভাগে ৪৮ হাজার টন ধারণক্ষমতার সাইলোর কাজ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়েছে, কিন্তু অর্থ ও জনবল সংকটের কারণে কিছু সাইলোতে খাদ্যশস্য সংরক্ষণে বিলম্ব হচ্ছে। এই আধুনিক সাইলোতে ৩ বছর পর্যন্ত চালের পুষ্টিগুণ ও গুণগত মান অক্ষুণœ রেখে সংরক্ষণ করা সম্ভব। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং ফসল পরবর্তী ক্ষতি কমাতে এই সাইলোগুলোকে দ্রæত নির্মাণ করে কার্যকর করতে হবে। এছাড়া বড় সাইলোর পাশাপাশি, দুর্যোগ প্রবণ এলাকায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে খাদ্য বা বীজ মজুদের জন্য ৫ লক্ষ পারিবারিক সাইলো (ঐড়ঁংবযড়ষফ ঝরষড়) বিতরণ করার সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণ : দেশের কোনো জায়গাকে পতিত হিসেবে ফেলে না রেখে চাষাবাদের আওতায় আনা।
উচ্চফলনশীল ও খরাসহিষ্ণু জাত : জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সক্ষম খরা, লবণাক্ততা ও বন্যাসহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন ও ব্যবহার বৃদ্ধি। খামারভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হবে।
সার ও জ্বালানিব্যবস্থাপনা : কৃষিতে সেচ ও যন্ত্রচালনায় জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সারের ওপর আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
আমদানি বহুমুখীকরণ : চলমান মধ্যপ্রাচ্যে সংকট ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর নির্ভর না করে আমদানির উৎস বাড়াতে হবে।
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণ : শুধুমাত্র ভাতের ওপর নির্ভর না করে গম, ভুট্টা, আলু ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের ব্যবহার বাড়াতে হবে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের খাদ্যব্যবস্থাপনা : কক্সবাজার ও ভাসানচরে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর খাদ্য চাহিদা মেটাতে আন্তর্জাতিক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী টেকসই পরিকল্পনা নেওয়া।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে টানা উত্তেজনা বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে নতুন করে শঙ্কার মুখে ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত যদি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যে গভীর অভিঘাত হানবে। বাংলাদেশও এর বাইরে থাকবে না। সুতরাং কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বৃদ্ধি করা, প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনসহ জৈব প্রযুক্তি গবেষণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা, জীন ব্যাংক, তথ্য ভাÐার ইত্যাদির সম্প্রসারণ এবং নেটওয়ার্ক তৈরির মাধ্যমে আধুনিক ও উন্নত কৃষিকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো গেলে খাদ্য সঙ্কট মোকাবিলা এবং খাদ্য অপচয়রোধে সহায়ক হবে নিঃসন্দেহে। সারের ওপর আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ঐকমত্য, সঠিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, সর্বপরি সুশাসন নিশ্চিত করা।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক
পূর্বকোণ/ইবনুর


















