চট্টগ্রাম বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

তেলের পথ মুক্ত, শান্তির পথ এখনও রুদ্ধ

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী, সম্পাদক

১৭ জুন, ২০২৬ | ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একই সঙ্গে আশার আলো এবং অনিশ্চয়তার ছায়া স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল আলোচিত সমঝোতা স্মারক ডিজিটালি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী শুক্রবার থেকে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে। যুদ্ধের আশঙ্কায় অস্থির বিশ্ববাজারে এরই মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

 

প্রথম দৃষ্টিতে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা কখনোই এত সরল নয়। কারণ হরমুজ খুলে গেলেও লেবানন প্রশ্ন, গাজা প্রশ্ন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে মৌলিক বিরোধগুলো এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

 

বিশ্বজুড়ে অনেকেই এই সমঝোতাকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন। তাদের যুক্তি, যুদ্ধের চেয়ে অসম্পূর্ণ শান্তি অনেক ভালো। দীর্ঘ সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সরাসরি আলোচনার টেবিলে ফিরেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তেলের দাম স্থিতিশীল হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে। ইউরোপীয় শক্তিগুলোও মনে করছে, প্রথমে যুদ্ধ থামানো জরুরি; পরে জটিল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যুগুলোর সমাধান খোঁজা যাবে।

 

কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, এটি এখনো পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি নয়; বরং একটি কাঠামোগত সমঝোতা। পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অধিকৃত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারের মতো মৌলিক প্রশ্নগুলো এখনো ঝুলে আছে।

 

সবচেয়ে বড় সংকটের কেন্দ্রবিন্দু লেবানন। ইরান ও তার মিত্ররা মনে করছে, সমঝোতার স্বাভাবিক পরিণতি হওয়া উচিত দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার। কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজন হলে ইসরায়েল লেবানন, গাজা এবং সিরিয়ার কৌশলগত এলাকাগুলোতে অবস্থান অব্যাহত রাখবে। এখানেই শান্তির পথ কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

ইসরায়েলের যুক্তি হলো, ২০২৩ সালের হামলার অভিজ্ঞতা তাদের নিরাপত্তা ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। তারা আর আগের অবস্থায় ফিরতে চায় না। তাদের মতে, সীমান্তের ওপারে শত্রুভাবাপন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় থাকলে নিরাপত্তা বাফার জোন বজায় রাখা ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু এই যুক্তি আরব বিশ্বের কাছে সম্পূর্ণ গ্রহণযোগ্য নয়।

 

সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান এবং মিশর প্রকাশ্যে যুদ্ধের অবসান ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পক্ষে থাকলেও তাদের মধ্যে একটি গভীর উদ্বেগ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেটি হলো সামরিক শক্তির মাধ্যমে ভূখ-ের বাস্তবতা পরিবর্তনের প্রবণতা।

 

গাজা, দক্ষিণ লেবানন এবং সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উপস্থিতি আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছে শুধু একটি নিরাপত্তা ইস্যু নয়; এটি আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। তাদের আশঙ্কা, যদি কোনো রাষ্ট্র সামরিক শক্তির মাধ্যমে নতুন ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ সৃষ্টি করে এবং তা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখে, তবে ভবিষ্যতে পুরো অঞ্চলের সীমান্তব্যবস্থা ও রাষ্ট্রিক নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে।

 

আরব রাষ্ট্রগুলোর একাংশ মনে করে, আজ লেবানন বা সিরিয়ার ভূখ-ে যে বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, তা আগামী দিনে অন্যদের জন্যও একটি নজির হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে তারা একদিকে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধিকে সীমিত রাখতে চায়, অন্যদিকে ইসরায়েলের ভূখ- সম্প্রসারণমূলক বা স্থায়ী সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছে।

 

এখানেই মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান কূটনীতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। বহু আরব রাষ্ট্র ইরানের নীতির সমালোচক, কিন্তু একই সঙ্গে তারা ইসরায়েলের ভূখ- দখল বা দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধেও উদ্বিগ্ন। অর্থাৎ তারা কোনো পক্ষের পূর্ণ বিজয় চায় না; বরং এমন একটি আঞ্চলিক ভারসাম্য চায় যেখানে কোনো একক শক্তি অন্যদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে না পারে।

 

আরব কূটনৈতিক মহলে এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন উচ্চারিত হচ্ছেÑ যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সামরিক শক্তির মাধ্যমে ভূখ- দখল বা সীমান্ত পরিবর্তনের ঘটনাকে নীরবে মেনে নেয়, তাহলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ কী হবে?

 

এই সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে যুদ্ধ বন্ধ করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী, অন্যদিকে তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েল নিরাপত্তার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে কৌশলগত অগ্রাধিকার নিয়ে সূক্ষ্ম মতপার্থক্যের আভাসও দেখা যাচ্ছে।

 

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য এখন মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে তেলের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে না, বৈশ্বিক বাজার স্থিতিশীল থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে না। কিন্তু নেতানিয়াহুর অগ্রাধিকার নিরাপত্তা, আর ইরানের অগ্রাধিকার আঞ্চলিক প্রভাব ও মর্যাদা। ফলে তিনটি ভিন্ন লক্ষ্য একই টেবিলে বসেছে, কিন্তু তাদের গন্তব্য এক নয়।

 

বর্তমান বাস্তবতা হলোÑ হরমুজ প্রণালি খুলছে, তেলের প্রবাহ স্বাভাবিক হচ্ছে, কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে এবং যুদ্ধ আপাতত থেমেছে। কিন্তু লেবানন প্রশ্ন, গাজা প্রশ্ন, অধিকৃত ভূখ- এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার মৌলিক বিরোধগুলো এখনও রয়ে গেছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস আমাদের শেখায়, অস্ত্রের নীরবতা সবসময় শান্তির সমার্থক নয়। অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রের ধোঁয়া সরে গেলে রাজনৈতিক বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাই আজকের পরিস্থিতিকে পূর্ণাঙ্গ শান্তি বলা হয়তো সময়ের আগে হয়ে যাবে। বরং এটিকে বলা যেতে পারে যুদ্ধ থেকে আলোচনার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনিশ্চিত সেতুবন্ধন।

 

হরমুজের জলপথ খুলে যাচ্ছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পথ এখনো কণ্টকাকীর্ণ। সেই পথ শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তির দিকে যাবে, নাকি নতুন সংঘাতের দিকে মোড় নেবে তার উত্তর লুকিয়ে আছে লেবানন, গাজা এবং অধিকৃত ভূখন্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেওয়া আগামী কয়েক মাসের সিদ্ধান্তে। হরমুজ হয়তো খুলছে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির দরজা এখনো পুরোপুরি খোলেনি।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট