চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

দেশ এগোচ্ছে, সাক্ষরতা ‘থমকে’

আজ আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস

দেশ এগোচ্ছে, সাক্ষরতা ‘থমকে’

তাসনীম হাসান

৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১১:৫৬ পূর্বাহ্ণ

অবকাঠামো থেকে প্রযুক্তি, অর্থনীতি থেকে যোগাযোগ-দেশের সবখানেই উন্নয়নের ছাপ। মানুষের হাতে স্মার্টফোন, বাড়ছে ইন্টারনেট ব্যবহার-পুরো পৃথিবী যেন হাতের মুঠোয়। সরকারি-বেসরকারি সেবার বড় একটি অংশও চলে এসেছে অনলাইনে। অথচ এই এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই থমকে আছে মৌলিক সাক্ষরতার অগ্রগতি। গত কয়েক বছর ধরে দেশে সাক্ষরতার হার বাড়ছে ধীরগতিতে।

 

সর্বশেষ পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, দুই বছর আগের জায়গাতেই আটকে আছে সাক্ষরতার হার। ২০২০ সালে দেশে ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ছিল ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২১ সালেও এ হারে কোনো হেরফের হয়নি। এর মধ্যে ২০২২ সালে এসে উল্টো প্রায় ১ শতাংশ কমে যায় সাক্ষরতার হার। ওই বছর সাক্ষরতার হার ছিল ৭৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। পরের বছর অবশ্য আবার বাড়তে শুরু করে। ২০২৩ সালে সাক্ষরতার হার দাঁড়ায় ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে এক শতাংশের বেশি বেড়ে তা দাঁড়ায় ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে। ২০২৫ সালেও ছিল একই হার।

 

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসকে সামনে রেখে গতকাল সোমবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, দেশে সাক্ষরতার হার বর্তমানে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ গত দুই বছর ধরে একই বিন্দুতে থমকে আছে সাক্ষরতার হার। তবে এ হার নিয়ে ‘সন্তুষ্টির’ কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

 

তিনি বলেন, সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৭ শতাংশের বেশি পৌঁছানো নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি। তবে, এখনো একটি বড় অংশ শিক্ষার মৌলিক অধিকার ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার সুযোগ থেকে বাইরে রয়ে গেছে। বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশু, ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং অনগ্রসর প্রাপ্তবয়স্কদের দ্রুত সাক্ষর ও দক্ষ করে তোলাই এখন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। ২০৩১ সালের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি। এর অংশ হিসেবে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর মাধ্যমে বর্তমানে ৬৪ জেলার সদর উপজেলায় কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে।

 

অবশ্য এই দশকে সাক্ষরতার হার বাড়ার প্রবণতা কিছুটা ধীর হলেও আগের দশকগুলোতে বেড়েছে তুলনামূলক বেশি গতিতে। ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত হিসাব করলে এই সময়ে সাক্ষরতার হার বেড়েছে ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। এর আগের দশকে, অর্থাৎ ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সাক্ষরতার হার বেড়েছিল ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত এক দশকেও সাক্ষরতার হার বেড়েছিল ১২ দশমিক ৬ শতাংশ।

 

স্বাধীনতার পরও সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির চিত্র ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ১৯৭৪ সালে তা দাঁড়ায় ২৫ দশমিক ৯ শতাংশে। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে সাক্ষরতার হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশে। অর্থাৎ অতীতে তুলনামূলক দ্রুতগতিতেই বেড়েছে দেশের সাক্ষরতার হার। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর চিত্রে সেই গতি অনেকটাই কমে এসেছে। ২০২০ সালের পর সাক্ষরতার হার যে ধীরগতিতে বাড়ছে, তাতে ২০৩১ সাল নাগাদ আরও ৯ থেকে ১৩ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হবে কি না-সে প্রশ্নও উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তির হার বাড়ালেই সাক্ষরতার চিত্র বদলাবে না। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা, ঝরে পড়া রোধ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কার্যকর সাক্ষরতা কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষা থেকে দীর্ঘদিন বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে ফিরিয়ে আনার জন্য বছরজুড়ে ধারাবাহিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকার এসেছে, সরকার গেছে; বয়স্ক ও যুব সাক্ষরতার জন্য নেওয়া হয়েছে কেবল কিছু প্রকল্পভিত্তিক কাজ। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো একসময় এসব নিয়ে কাজ করেছে। প্রকল্প শেষ, খবরও শেষ। নতুন প্রকল্প আসতে বছর গড়িয়ে যায়। এর মধ্যে যাদের অক্ষরজ্ঞান দেওয়া হয়েছিল, চর্চার অভাবে তারা সব ভুলে বসে থাকেন। তারা সাক্ষরতা থেকে ঝরে পড়েন। সাক্ষরতা এক-দুই বছরে অর্জনের বিষয় নয়; একটি কর্মসূচি অন্তত পাঁচ বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে চালাতে হয়।’

 

তবে বাস্তবে সারাবছর সাক্ষরতার হার বাড়াতে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর। সাক্ষরতা দিবস এলেই যেন নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এবারও সাক্ষরতার হার বাড়াতে নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার।

 

বছর ঘুরে আবার এলো আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’ প্রতিপাদ্যে বিশ্বব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় আজ মঙ্গলবার পালিত হবে দিবসটি। দিবসটি চলে যাবে, ব্যানার নামবে, আলোচনা শেষ হবে-কিন্তু পরের বছর সাক্ষরতার হার কি বাড়বে? না দাঁড়িয়ে থাকবে একই শতাংশে? সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে অপেক্ষা করতে হবে একবছর!

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট