কয়েক বছর ধরে চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতালকে ঘিরে নানা পরিকল্পনা, জল্পনা-কল্পনা ও বিতর্ক চলছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই হাসপাতাল সম্পর্কে জানে না। জানা উচিত- কীভাবে একটি ঐতিহ্যবাহী সচল হাসপাতালকে তিলে তিলে ধ্বংস করা হয়েছে। একইসঙ্গে চলছে এই হাসপাতাল তথা পুরো সিআরবি শিরিষতলাকে বাণিজ্যিকভাবে কুক্ষিগত করার ষড়যন্ত্র- আধুনিকায়ন ও স¤প্রসারণের নামে, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে।
রেলওয়ের অমূল্য এই জায়গা দেওয়া হবে, আর গড়ে তোলা হবে বাণিজ্যিক হাসপাতাল, মেডিকেল ও নার্সিং কলেজ, ডরমিটরি এবং সংশ্লিষ্ট আরও নানা স্থাপনা- এমন পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে। এর ফলে পুরো শিরিষতলা ও আশপাশের এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং বৈশিষ্ট্য বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাইরে থেকে দেখানো হচ্ছে- সবই রেলওয়ে হাসপাতালের উন্নয়নের জন্য। আবার কেউ কেউ এখানে ডেন্টাল কলেজ চালুর কথাও বলছেন।
প্রসঙ্গত, ১৮৬২ সালে তৎকালীন বাংলা ও আসামে যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ১৮৯২ সালে আনুষ্ঠানিক রূপ পায়। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকদের বাণিজ্যিক সুবিধার জন্য চট্টগ্রামকে এর সদর দপ্তর করা হয়। আসাম ও উত্তর-পূর্ব বাংলার পণ্য সহজে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর জন্যই এই রেলপথ গড়ে তোলা হয়েছিল। ১৮৯৯ সালে সদর দপ্তরের ভবন নির্মিত হয়, যার নামকরণ করা হয় সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি)।
দেশ বিভাগের পর এটি ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে, পরে ১৯৬১ সালে পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রেলওয়ে নামে পরিচিত হয়। নগরীর কেন্দ্রস্থলে পাহাড় ও সবুজ বনাঞ্চলের মাঝে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে এই এলাকা, যেখানে উপনিবেশিক আমলের প্রশাসনিক, সামাজিক ও আবাসিক স্থাপনাগুলো আজও বিদ্যমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কিছু এলাকা সামরিক বাহিনীর দখলে যায়, যার ধারাবাহিকতায় বর্তমানে আশপাশে রেডিসন হোটেলসহ বিভিন্ন সামরিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
১৯২৪ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতাল চালু করে। একই সময়ে কুমিরায় প্রতিষ্ঠিত হয় কুমিরা স্যানাটোরিয়াম-টিবি রোগের চিকিৎসার জন্য। এই দুটি প্রতিষ্ঠানই মূলত রেলওয়ে কর্মচারী ও তাদের পরিবারের চিকিৎসাসেবার জন্য গড়ে ওঠে- একটি সাধারণ রোগের জন্য, অন্যটি যক্ষ্মা চিকিৎসার জন্য।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতাল ছিল একটি সুসজ্জিত, অভিজাত ও পূর্ণাঙ্গ মাল্টিডিসিপ্লিনারি জেনারেল হাসপাতাল, যার শয্যা সংখ্যা ছিল প্রায় ২০০। এখানে প্রাইভেট রোগী ভর্তি হতো, অপারেশন হতো, প্রসূতি সেবা দেওয়া হতো। চট্টগ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এখানে ভিজিটিং কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করতেন।
আমরা নিজেরা মেডিকেল ছাত্রজীবনে এখানে এসেছি এবং পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে রোগীও দেখেছি। পুরো স্থাপত্য ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশিক ধাঁচের। ১৯৯৪ সালে বর্তমান সামনের ভবনটি নির্মাণ করা হয়।
গত শতাব্দীর আশির দশক থেকে রেলওয়ে ব্যবস্থাপনায় দাতাদের পরামর্শ অনুযায়ী নানা সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়, যার মধ্যে ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’ নীতির মাধ্যমে জনবল সংকোচন অন্যতম। এর প্রভাব পড়ে হাসপাতালেও। ধীরে ধীরে এটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। একইসঙ্গে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ হাসপাতালের জনসম্পদ ও ব্যবস্থাপনায় সময়োপযোগী হালনাগাদ করেনি।
অথচ প্রায় একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম পোর্ট হাসপাতাল আজ একটি আধুনিক, বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই বৈপরীত্য প্রশ্ন জাগায়- ইচ্ছার অভাব, নাকি পরিকল্পিত অবহেলা?
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে রেল মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান এখানে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেই সময় থেকেই দেশে বেসরকারি বাণিজ্যিক মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় সিআরবি এলাকায় বেসরকারি বিনিয়োগে মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজ, হাসপাতাল ও ডরমিটরি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়- যা প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবেও আলোচিত।
হাজার হাজার কোটি টাকার এই সরকারি সম্পত্তি বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার এমন উদ্যোগ নিয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে মনে হয়- এই মেডিকেল প্রকল্পগুলো পুরো সিআরবি এলাকা দখলের একটি প্রাথমিক ধাপ হতে পারে।
বর্তমান রেলওয়ে হাসপাতালকে যথাযথভাবে সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হলে এটি আবারও একটি কার্যকর জনমুখী চিকিৎসা কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে- যা হবে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কিন্তু তা না করে আমলা-ব্যবসায়ী-নেতা চক্রের স্বার্থে জনস্বার্থবিরোধী এই মহাহরণ কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য নয়।
এই চক্রান্ত সফল হতে দেওয়া যাবে না। সিআরবি শিরিষতলার প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যিক অস্তিত্ব রক্ষা করতে হবে। শিরিষতলার বাতাসে আজও প্রতিধ্বনিত হোক ‘প্রাঙ্গণে মোর শিরীষ শাখায়, ফাগুন মাসে কী উচ্ছ্বাসে, ক্লান্তিবিহীন ফুল ফোটানোর খেলা।’
লেখক: অধ্যাপক ইমরান বিন ইউনুস সিআরবি রক্ষা মঞ্চ, চট্টগ্রাম।
পূর্বকোণ/ইবনুর






















