চট্টগ্রাম সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ:

ভবিষ্যতের ইন্ডাস্ট্রি হবে পুরোপুরি ইন্টিগ্রেটেড ও ডিজিটালি কানেক্টেড

ভবিষ্যতের ইন্ডাস্ট্রি হবে পুরোপুরি ইন্টিগ্রেটেড ও ডিজিটালি কানেক্টেড

২৯ জুন, ২০২৬ | ৫:২২ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের কালুরঘাটে ইউনিলিভার বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ফ্যাক্টরিতে প্রবেশ করলেই বোঝা যায়, এটি শুধু একটি উৎপাদন কেন্দ্র নয়, বরং বাংলাদেশের শিল্পায়নের দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। ১৯৬৪ সালে যাত্রা শুরু করা এই ফ্যাক্টরি বিশ্বব্যাপী ইউনিলিভারের কাছে অন্যতম সেরা উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে উৎপাদিত লাক্স সাবান ২০০৮ সালে বিশ্বের বিভিন্ন ইউনিলিভার ফ্যাক্টরিতে উৎপাদিত লাক্স সাবানের মধ্যে বেঞ্চমার্ক হিসেবে বিবেচিত হয়।    

 

তবে সময় বদলেছে, বদলেছে প্রযুক্তি, বাজার ও ভোক্তার চাহিদা। সেই পরিবর্তনের বাস্তবতায় এখন কালুরঘাট ফ্যাক্টরিও এগোচ্ছে বড় ধরনের ম্যানুফ্যাকচারিং ট্রান্সফরমেশনের পথে। ইউনিলিভার বাংলাদেশের ফ্যাক্টরি ডিরেক্টর এস এম তারেক সাইফুল্লাহ মনে করেন, আধুনিক শিল্পে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; একইসঙ্গে হতে হবে আরও স্মার্ট, আরও এফিসিয়েন্ট এবং আরও সাসটেইনেবল। তাই বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের শিল্পখাতকে এখন ট্রান্সফরমেশনের মধ্য দিয়েই এগোতে হবে। 

 

তার ভাষায়, “একসময় আমরা যে প্রযুক্তিতে সাবান উৎপাদন করতাম, সেটি ছিল ওই সময়ের জন্য অত্যন্ত আধুনিক। আমরা ‘সেইজ’ বা ‘সোপ আফটার গ্লিসারিন এক্সট্রাকশন’ পদ্ধতিতে সাবান তৈরি করতাম। দীর্ঘ সময় ধরে এই পদ্ধতি অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এখন বিশ্বজুড়ে উৎপাদন প্রযুক্তিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।”

 

বর্তমানে সাবান আর বিলাসপণ্য নয়; এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। ফলে ভোক্তার কাছে কম খরচে সর্বোচ্চ মানের পণ্য পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে কাঁচামালের দাম, জ্বালানি ব্যয় এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বাড়ার কারণে উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ করে তোলার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।

 

এই বাস্তবতায় ইউনিলিভার বাংলাদেশ এখন কমপ্যাক্ট, এনার্জি-এফিসিয়েন্ট এবং হাই-অটোমেটেড উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এতোদিন যেখানে বড় বড় প্যান ব্যবহার করে সাবান তৈরি করা হতো, এখন সেখানে আরও ইন্টিগ্রেটেড ও স্মার্ট সিস্টেম ব্যবহার করা হবে। এতে কম জায়গা লাগবে, কম এনার্জি খরচ হবে এবং পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া আরও সিমপ্লিফাইড হবে। 

 

তারেক সাইফুল্লাহ জানান, বর্তমানে একটি লাইনে প্রতি মিনিটে প্রায় ১৮০টি সাবান উৎপাদন করা সম্ভব হয়। নতুন অটোমেটেড লাইনে প্রতি মিনিটে প্রায় ৫৫০টি পর্যন্ত সাবান উৎপাদন সম্ভব হবে। অর্থাৎ আগের তিনটি লাইনের সমপরিমাণ কাজ এখন একটি লাইন দিয়েই করা যাবে।        

 

তিনি বলেন, “এই ট্রান্সফরমেশনের উদ্দেশ্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়। আমরা কম রিসোর্স ব্যবহার করে আরও ভালো কোয়ালিটি, আরও বেশি সাসটেইনেবিলিটি এবং আরও বেশি কনজিউমার ভ্যালু নিশ্চিত করতে চাই।”

 

তার মতে, বর্তমানে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হচ্ছে ডেটা-বেইজড ডিসিশন মেকিং। আগে কোনো একটি লাইনে উৎপাদন ঘাটতি বা অপারেশনাল সমস্যা শনাক্ত করতে কয়েক দিন সময় লাগত। তথ্য সংগ্রহ, ইমেইল আদান-প্রদান এবং যাচাই-বাছাই শেষে সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হতো। এখন ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেমের মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে মেশিনের পারফরম্যান্স, উৎপাদনের মান, আউটপুট এবং কোথায় লস হচ্ছে, সবকিছুই দেখা যায়।

 

“এখন আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে লাইভ দেখতে পারছি মেশিন কতটা এফিসিয়েন্টলি কাজ করছে, কোথায় সমস্যা হচ্ছে, কতটুকু আউটপুট আসছে। ফলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে এবং দ্রুত সমাধানও দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, ভবিষ্যতের ইন্ডাস্ট্রি হবে পুরোপুরি ইন্টিগ্রেটেড ও আরও বেশি ডিজিটালি কানেক্টেড” বলেন তিনি।

 

তার মতে, ডিজিটালাইজেশনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা তৈরি। এই সক্ষমতা ব্যবহার করে শুধু উৎপাদন দক্ষতাই বাড়ানো যাচ্ছে এমন না, একইসঙ্গে গ্লোবাল বেঞ্চমার্কিং এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও সহজ হচ্ছে। এখন বিশ্বের অন্য কোনো ইউনিলিভার ফ্যাক্টরির সঙ্গে নিজেদের পারফরম্যান্স তুলনা করে কোথায় উন্নতির সুযোগ রয়েছে, তা দ্রুত নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে।

 

তবে বাংলাদেশের শিল্পখাত এখনো পুরোপুরি ডিজিটাল ইন্টিগ্রেশনের জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান আধুনিক অটোমেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও “ফুললি কানেক্টেড” অপারেশন এখনো সীমিত।

 

তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রেই এখনো এক মেশিন আরেক মেশিনের সঙ্গে পুরোপুরি কানেক্টেড নয়। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে এই জায়গায় এগিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতের ইন্ডাস্ট্রি হবে পুরোপুরি ইন্টিগ্রেটেড এবং ডেটা-ড্রিভেন।”

 

এই সংক্রান্ত নীতিগত সহায়তার প্রসঙ্গে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন শিক্ষা ও স্কিল ডেভেলপমেন্টকে। তার মতে, বাংলাদেশের এডুকেশন সিস্টেমকে এখনো পুরোপুরি ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ কিংবা ডিজিটাল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়নি।

 

“আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন স্কিলড ওয়ার্কফোর্স। প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, মানুষের দক্ষতাকেও তত আপস্কিল হতে হবে। ভবিষ্যতের ফ্যাক্টরিতে মানুষের ভূমিকা আরও বেশি অ্যানালিটিক্যাল, নলেজ-বেইজড এবং প্রবলেম-সলভিং নির্ভর হবে,” বলেন তিনি।

 

তার মতে, বাংলাদেশে এখনো বিদেশি বিশেষজ্ঞ এসে কাজ করছেন, যা স্পষ্ট করে যে দেশে দক্ষ জনবলের চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদা স্থানীয়ভাবেই পূরণ করা সম্ভব হওয়া উচিত।

 

তরুণ প্রকৌশলীদের উদ্দেশ্যে তার বার্তাও অত্যন্ত পরিষ্কার। তিনি মনে করেন, বেসিক বা ফান্ডামেন্টাল জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই।

 

তার ভাষায়, “অটোমেশন, ডেটা অ্যানালিটিক্স কিংবা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সবকিছুর ভিত্তি হলো শক্ত ফান্ডামেন্টাল। মেশিন থেকে ডেটা আসবে, ইনসাইট আসবে, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সমাধানকে দ্রুত ও সহজ করে দিবে কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য স্কিলড মানুষ লাগবে।”

 

একইসঙ্গে তিনি শিল্পকারখানায় কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। “আমি সবসময় বলি, ফ্যাক্টরি হলো একজন ইঞ্জিনিয়ারের জন্য এক্সটেনশন অব ইউনিভার্সিটি। বাস্তব সমস্যার সমাধান, টিমওয়ার্ক, নেতৃত্ব, এসব শেখার সবচেয়ে বড় জায়গা হলো ফ্যাক্টরি ফ্লোর,” বলেন তিনি।

 

তারেক সাইফুল্লাহ মনে করেন, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সাসটেইনেবিলিটিকে একসঙ্গে সামনে রেখে এগোতে পারলে বাংলাদেশের ম্যানুফ্যাকচারিং খাত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে। আর সেই পথচলায় ভবিষ্যতের ফ্যাক্টরি শুধু মেশিননির্ভর হবে না, বরং দক্ষ মানুষ ও স্মার্ট প্রযুক্তির সমন্বয়েই গড়ে উঠবে নতুন শিল্প বাস্তবতা।

পূর্বকোণ/পিআর

শেয়ার করুন