চট্টগ্রাম বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় লেখা দ্রুত, কিন্তু মগজ কি ঝিমিয়ে পড়ছে?

এমআইটির গবেষণায় এআই-নির্ভর লেখায় দুর্বল স্নায়বিক সংযোগ; তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের সময় এখনো আসেনি।

ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন

১৪ অক্টোবর, ২০২৬ | ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ

পরীক্ষার খাতা থেকে অফিসের প্রতিবেদন-লেখার কাজে চ্যাটজিপিটির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুলের ব্যবহার এখন প্রতিদিনের অভ্যাস। কয়েক সেকেন্ডেই তৈরি হয়ে যায় গোছানো অনুচ্ছেদ। কিন্তু এই সুবিধার বিনিময়ে আমাদের মস্তিষ্ক কী হারাচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) মিডিয়া ল্যাবের একদল গবেষকের একটি গবেষণা এই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।
কীভাবে হলো গবেষণা : গবেষণায় ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ৫৪ জন অংশগ্রহণকারীকে তিনটি দলে ভাগ করা হয়। একটি দল প্রবন্ধ লিখেছে চ্যাটজিপিটির সাহায্যে, দ্বিতীয় দল ব্যবহার করেছে সাধারণ সার্চ ইঞ্জিন, আর তৃতীয় দল কোনো বাইরের সহায়তা ছাড়াই শুধু নিজের চিন্তা খাটিয়ে লিখেছে। লেখার সময় সবার মাথায় ছিল ইইজি (ইলেকট্রো এনসেফালো গ্রাফি) যন্ত্র, যা মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ মাপে। কয়েক দফায় এই লেখার পর্ব চলে। শেষপর্বে কিছু অংশগ্রহণকারীর দল বদলে দেওয়া হয়, আগে যাঁরা চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করতেন, তাঁদের লিখতে হয় সহায়তা ছাড়া, আর যাঁরা নিজে লিখতেন, তাঁরা পান এআইয়ের সুযোগ।
কী পাওয়া গেল : ফলাফলে দেখা গেছে, চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীরা তুলনামূলক দ্রুত লেখা শেষ করেছেন। কিন্তু মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ বা ‘নিউরাল কানেক্টিভিটি’ তাঁদের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে দুর্বল ছিল। সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিস্তৃত সংযোগ দেখা গেছে সহায়তা ছাড়া লেখা দলের মধ্যে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ স্মৃতি নিয়ে। নিজের লেখা প্রবন্ধের অংশ মনে করতে চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীরা বেশি সমস্যায় পড়েছেন। বারবার লেখার পর্বে এআই-নির্ভর দলের মানসিক সম্পৃক্ততাও ক্রমে কমেছে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। দল বদলের পর্বে, আগে এআই ব্যবহার করা অংশগ্রহণকারীরা সহায়তা ছাড়া লিখতে গিয়েও তুলনামূলক দুর্বল সংযোগ দেখিয়েছেন।
কেন এই ফল গুরুত্বপূর্ণ : লেখা মানে শুধু শব্দ সাজানো নয়। ভাবনা তৈরি, তথ্য গোছানো, ঠিক শব্দ বেছে নেওয়া এবং ভিন্ন ভিন্ন ধারণার মধ্যে সেতু বাঁধা- সবই এর অংশ। এই ধাপগুলোর কিছু যখন এআই করে দেয়, তখন ব্যবহারকারীর মস্তিষ্ককে কম খাটতে হয়। গবেষণাপত্রের শিরোনামেই এ ধারণাকে ‘কগনিটিভ ডেট’ বা জ্ঞানীয় ঋণ বলা হয়েছে, সহজ কথায়, এখনকার স্বস্তির মূল্য পরে চিন্তার দক্ষতায় দিতে হতে পারে, এমন আশঙ্কা।
সতর্ক পাঠ জরুরি : তবে এই গবেষণাকে চূড়ান্ত রায় ভাবা ঠিক হবে না। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল কম, এবং তাঁরা একটি নির্দিষ্ট এলাকার কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আসা। শেষপর্বে অংশ নেন মাত্র ১৮ জন। প্রথম প্রকাশের সময় গবেষণাপত্রটি পিয়ার রিভিউ বা বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনার মধ্য দিয়েও যায়নি। সবচেয়ে বড় কথা, চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যকলাপের পার্থক্যের সম্পর্ক পাওয়া মানেই প্রমাণ হয় না যে এটি মস্তিষ্কে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন ঘটায়। এই প্রভাব কতদিন টেকে এবং ব্যবহারের ধরনভেদে কীভাবে বদলায়, তা জানতে আরও বড় পরিসরের গবেষণা দরকার।
প্রশ্নটা ‘কীভাবে’ ব্যবহার : এআই সহকারী নানা কাজে লাগে। কেউ চ্যাটজিপিটিকে দিয়ে নতুন ভাবনা খোঁজেন, কেউ শুধু বানান-ব্যাকরণ মিলিয়ে নেন বা নিজের খসড়া ঘষামাজা করেন। আবার কেউ প্রায় পুরো লেখাটাই তৈরি করিয়ে নেন। এই ভিন্ন ভিন্ন ব্যবহারে মস্তিষ্কের সম্পৃক্ততাও ভিন্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। লক্ষণীয়, গবেষণার শেষপর্বে যাঁরা আগে নিজে লিখেছিলেন, তাঁরা পরে এআই হাতে পেয়ে ভালো স্মৃতিশক্তি ও সক্রিয় স্নায়বিক সংযোগ দেখিয়েছেন। অর্থাৎ আগে নিজে ভেবে তারপর এআইয়ের সাহায্য নিলে ফল ভিন্ন হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে : আমাদের দেশে বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। স্মার্টফোন আর মোবাইল ইন্টারনেটের কল্যাণে শহর থেকে মফস্বল, অনেক শিক্ষার্থীর হাতেই এখন এআই টুল। চ্যাটজিপিটিকে এখন বাংলাতেও প্রশ্ন করা যায়, ফলে ইংরেজিতে স্বচ্ছন্দ নন এমন শিক্ষার্থীরাও সহজে এর সাহায্য নিতে পারছেন। এটি সুযোগ, আবার ঝুঁকিও। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে মুখস্থনির্ভরতা আর নোট-গাইডের ওপর নির্ভরতার জন্য সমালোচিত। সেই জায়গা যদি এখন এআইয়ের তৈরি করা লেখা দখল করে, তবে নিজে ভেবে লেখার অভ্যাস আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। অ্যাসাইনমেন্ট, টার্ম পেপার, এমনকি চাকরির আবেদনপত্র লেখাতেও এআইয়ের ব্যবহার এখন চোখে পড়ে।
শ্রেণিকক্ষের জন্য বার্তা : এ অবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এআই ব্যবহার নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ জরুরি হয়ে উঠছে। এআই নিষিদ্ধ করার চেয়ে এর সচেতন ব্যবহার শেখানো বেশি কার্যকর হতে পারে, এমন মতও জোরালো হচ্ছে। যেমন, প্রথম খসড়া নিজে লেখা, তারপর এআইকে দিয়ে ভুল ধরানো; এআইয়ের দেওয়া তথ্য অন্য উৎস থেকে যাচাই করা; আর নিজের যুক্তি ও ভাষা যেন লেখায় থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখা। মূল্যায়নেও শুধু চূড়ান্ত লেখা নয়, লেখার প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা উঠছে, যাতে শিক্ষার্থীরা ভাবনার কষ্টটুকু এড়িয়ে না যায়।
তাই প্রশ্নটা শুধু এআই ব্যবহার করব কি না, তা নয়; বরং কীভাবে ব্যবহার করব এবং সে সময় নিজে ভাবা, সৃষ্টি করা ও যাচাই করার অভ্যাস ধরে রাখছি কি না, সেটাই আসল। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পেশাজীবী, সবার জন্যই এটি ভাবার বিষয়। এমআইটির গবেষণা এই আলোচনায় একটি প্রাথমিক জানালা খুলে দিয়েছে; পূর্ণ ছবি পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও গবেষণার।

 

লেখক- ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন
অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ ২% বিজ্ঞানীদের একজন।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট