চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬

সর্বশেষ:

আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা দেখি না: ডা. জাহেদ

অনলাইন ডেস্ক

১৩ অক্টোবর, ২০২৬ | ১:৩৮ অপরাহ্ণ

আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা বা ‘রিকনসিলিয়েশন’ নিয়ে সরকারের কোনও উদ্যোগ নেই। দলটির নেতারা অতীতের অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইলেও যে সমঝোতার আলোচনা শুরু হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। বরং মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার, গত দুই বছরে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড এবং দলটির নেতৃত্বের বর্তমান অবস্থান বিবেচনায় সমঝোতার কোনও বাস্তব সম্ভাবনা দেখছেন না প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। 
 
একই সঙ্গে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণায় সরকারের কোনও উদ্বেগ বা চাপ নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, সরকার নিজেই শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার নিশ্চিত করতে চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগ এবং জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। 
 
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন ডা. জাহেদ উর রহমান। এ সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা, শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তন ও ভারত থেকে প্রত্যর্পণ, ড. ইউনূসকে হেনস্তার অভিযোগ, দিল্লিতে বিমসটেকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং পুলিশের মনোবল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
 
গত সপ্তাহে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘তার বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, তাতে কিছু ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। সে কারণেই বিষয়টি আরও পরিষ্কার করা প্রয়োজন।’ 
 
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক সমঝোতার ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক বিষয় রয়েছে। প্রথমত, যারা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন, তাদের বিচার অবশ্যই হতে হবে। রাজনৈতিক সমঝোতার আলোচনা কোনওভাবেই সেই বিচার প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না। তবে অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনও কোনও ক্ষেত্রে সমঝোতার আলোচনা হতে পারে।’ 
 
আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘একটি দল মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের পর ক্ষমতা থেকে বিদায় নিয়েছে। কিন্তু এতদিন পরও দলটির পক্ষ থেকে সেসব অপরাধ স্বীকার বা অনুশোচনার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং তাদের কর্মকাণ্ডে এখনও উসকানি ও সংঘাত সৃষ্টির প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।’ 
 
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘যে দলটা এই ধরনের কাজ করে বেড়ায় এবং দেশের ভেতরে সন্ত্রাস ও নানারকম উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করে, তাদের সঙ্গে আলাপের ব্যাপারে সরকারের অবস্থান কী হবে, সেটি বোঝাই যায়। সরকারের দিক থেকে উদ্যোগ নেওয়ার তো কোনও প্রশ্নই আসে না।’
 
তিনি আরও বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার হয়েছে, রায়ও হয়েছে। আরও যেসব বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে, সেগুলোও চলবে।’ 
 
দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী হবে, দলটি রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে কিনা, সেই প্রশ্নও বিচারিক প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত বলে উল্লেখ করেন তিনি। 
 
আওয়ামী লীগ অতীতের অপরাধের দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ তৈরি হবে কিনা, এমন প্রশ্নে নিজের আগের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দল তার অতীত কর্মকাণ্ডের দায় স্বীকার করবে এবং ক্ষমা চাইবে, এটি প্রত্যাশিত হতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমা চাইলেই সমঝোতার আলোচনা শুরু হবে, এমন কোনও শর্ত সরকার দেয়নি। তিনি বলেন, ‘এটা শর্ত না যে, এটা করলে আলোচনা শুরু হতে পারে। মোটেও না। এটা করলে আলাপ শুরু করা যাবে কিনা, সেই আলাপ পরে হতে পারে।’ 
 
তিনি বলেন, ‘কেউ যদি ভবিষ্যতে এসে জানান যে আওয়ামী লীগ অপরাধের দায় স্বীকার করেছে এবং ক্ষমা চেয়েছে, তখন নতুন পরিস্থিতিতে আলোচনা আদৌ সম্ভব কিনা, সেটি বিবেচনার প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে সেটিও একান্তই তাত্ত্বিক আলোচনা। এর অর্থ এই নয় যে সরকার এখনই কোনও রাজনৈতিক সমঝোতার প্রক্রিয়ায় যেতে চাইছে।’ 
 
আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার শাসনামলে শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নয়, তারও বহু বছর আগে থেকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানিমূলক মামলায় জড়ানোর মতো গুরুতর ঘটনা ঘটেছে।’ 
 
এ প্রসঙ্গে বিএনপি নেতা হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের বিরুদ্ধে ৪৫০টির বেশি মামলা হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি। একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এত বিপুলসংখ্যক মামলা হলে তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনে কী ধরনের প্রভাব পড়ে, সেটি বিবেচনার আহ্বান জানান উপদেষ্টা। এ বিষয়টি নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনেও উঠে এসেছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
 
জাহেদ উর রহমান বলেন, দীর্ঘদিনের এসব কর্মকাণ্ডের পর একটি রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কার্যক্রমে ফেরার প্রশ্নে তার অতীতের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যারা রাজনৈতিক সমঝোতার কথা বলছেন, তাদেরও বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। 
 
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক সমঝোতার আলোচনা বিভিন্ন মহলে উঠেছিল। সে সময়ও অপরাধ স্বীকার ও অনুশোচনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’ কিন্তু ৫ আগস্টের পর দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণে কোনও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন না বলে জানান তিনি।
 
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘ক্ষমা চাওয়া, অনুতাপ প্রকাশ করা দূরে থাকুক, তারা হুমকি দিচ্ছেন। বাংলাদেশে সহিংসতা নানাভাবে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।’
 
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রচারিত অডিওর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘কোথাও কোথাও প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার মতো উসকানিমূলক বক্তব্যও এসেছে। এসব কর্মকাণ্ডের হিসাবও বিবেচনায় নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘দুই বছরে কী কী করেছেন, সেটার আমলনামা তো আমাদের কাছে আছে।’
 
এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার বাস্তব সম্ভাবনা ব্যক্তিগতভাবে দেখছেন না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে আসলে একেবারেই দেখি না। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ অপরাধ স্বীকার করলে বা ক্ষমা চাইলে তখনকার পরিস্থিতি অনুযায়ী কী করা হবে, তা ভবিষ্যতের প্রশ্ন। বর্তমানে সেটিকে রাজনৈতিক সমঝোতার কোনও বাস্তব উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
 
 
পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট