ঢাকার বারিধারায় গাড়িচাপায় ফুটপাতে বসে থাকা নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান মিমের (২৪) নিহতের মামলায় ১৭ বছরের সেই কিশোরের জামিনের আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন আদালত।
ঢাকার শিশু আদালত-৮ এর বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদির আদালত শুনানি নিয়ে জামিন নামঞ্জুরের আদেশ দেন।
বিচারক বলেন, ‘এ ঘটনায় সে দ্রুততম সময়ে বের হয়ে গেছে সমাজের জন্য নেগেটিভ ম্যাসেজ যাবে। আর শিশুদের জন্য এটা পজিটিভ ম্যাসেজ হবে।’
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন মামুন কিশোরের জামিন নামঞ্জুরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এর আগে ২২ সেপ্টেম্বর বিকাল ৫টার দিকে ঢাকার বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চাপা দেয় ২৪ বছর বয়সি মেহেদী হাসান মিমকে। পরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন গাড়িটির চালকের আসনে থাকা এক কিশোরকে আটক করে পুলিশে দেয়। তবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ওই রাতেই তাকে চাচার জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
মেহেদীর মৃত্যুর ঘটনায় তার ভাই মোক্তাদীর ইসলাম ২৩ সেপ্টেম্বর গুলশান থানায় মামলা করেন। মামলায় গাড়িচালক আকাশ মারককে আসামি করা হলেও চালকের আসনে থাকা ওই কিশোরের নাম ছিল না।
বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার পর ২৩ সেপ্টেম্বর ওই কিশোরকে হেফাজতে নেয় গুলশান থানা পুলিশ। ২৪ তাকে আদালতে হাজির করে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার এসআই আরেফীন ইসলাম।
ওইদিন আদালত তাকে ওই কিশোরকে গাজীপুরের টঙ্গী কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর আদেশ দেন। ওইদিন কিশোরের আইনজীবী আলমগীর হোসেন সাংবাদিকদের জানান, মামলাটি ৯ লাখ টাকায় আপস হয়েছে।
তিনি কিশোরের জামিন আবেদন করেন। তবে আদালত না শুনে জামিন শুনানির দিন রাখেন ২৭ সেপ্টেম্বর। ওইদিন কিশোরের পক্ষে তার আইনজীবী ঢাকা বারের সাবেক সভাপতি মো. গোলাম মোস্তফা খান, আলমগীর হোসেনসহ একাধিক আইনজীবী শুনানিতে অংশ নেন। ওইদিন শুনানি নিয়ে আদালত আরও শুনতে চান জানিয়ে পরবর্তী শুনানির দিন রাখেন রবিবার।
আজ জামিন শুনানিতে অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা খান বলেন, ‘তার বিরুদ্ধে একটায় কথা, সে চালকের সাথে ছিল। এ ছাড়া আর কিছু নেই। মামলার রায়ে তার সাজা হতো বা অর্থদণ্ড হতো। আমরা বাদীপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তাদের সঙ্গে আমরা আপস করে তাদের পাসে দাঁড়িয়েছি। সে কারণে তারা আজ আদালতে আসছে। আমাদের পদক্ষেপে তারা সন্তুষ্ট। ছেলেকে তারা ফিরে পাবেন না। এই কিশোরকে সাজা দিলেও তাদের ছেলে ফিরে আসবে না। আমরা তার জামিন প্রার্থনা করছি।’
এ সময় বিচারক বলেন, ‘মামলা জামিনযোগ্য বা জামিন অযোগ্য কনসিডারের মধ্যে থাকবে না। জামিন পেলে তার কী মঙ্গল হবে। আর জামিন না পেলে অমঙ্গলের কী হবে?
ওই কিশোর কতদিন আটক জানতে চান বিচারক। গোলাম মোস্তফা খান বলেন, ‘১২ দিন।’
এ সময় বিচারক রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য শুনতে চান। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন মামুন বলেন, ‘এটা একটা চাঞ্চল্যকর মামলা। গত ২২ সেপ্টেম্বর মেহেদী হাসান নামে এক যুবক গুলশান এলাকায় রাস্তার পাশে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এই কিশোর বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে তাকে চাপা দেয়। মর্মান্তিক ঘটনা। তার ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই।’
কিশোরদের কি ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকে? রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর কাছে জানতে চান বিচারক।
তখন শরীফ মামুন বলেন, ‘ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকে না। তবে অনুমোদনের একটা বিষয় থাকে।’
এ সময় বিচারক আসামিপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, ‘এ পর্যায়ে জামিন হলে কী ম্যাসেজ যাবে? পজিটিভ অর নেগেটিভ?
তখন গোলাম মোস্তফা খান বলেন, ‘পজিটিভ বার্তা যাবে। কারণ তারা আইন অনুযায়ী কাজ করেছে। আর অ্যাক্সিডেন্ট সে করেছে বিষয়টা এমন না। অ্যাক্সিডেন্ট তো সে করেনি?
তখন বিচারক জানতে চান, ড্রাইভার কোথায় ছিল?
গোলাম মোস্তফা খান বলেন, ‘গাড়িতে। সিসিটিভি ফুটেজ আছে। অ্যাক্সিডেন্ট করলে গাড়ি থেকে কীভাবে নামবে। সে ডান পাস দিয়ে নেমেছে।’
তখন বিচারক বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ড্রাইভারের সিট থেকে বের হচ্ছে। পুলিশ বলছে, ঘটনায় জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। সে যদি এখনি জামিন পায়, তাহলে সমাজে ম্যাসেজ যাবে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটানোর পরও জামিন পাওয়া যায়। শিশু/কিশোররা মনে করবে, এটা করেও দ্রুততম সময়ে জামিন পাওয়া যায়। ১২ দিন কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে। আর কিছুদিন থাক। দেখা যাক তার ভেতর আত্মোপলব্ধি আসে কি না। পজিটিভ কিছু আসে কি না। শিশু/কিশোরদের জন্য এটা একটা ম্যাসেজ যাক। আর তাকে জামিন দিলে দ্রুততম সময়ে বের হয়ে গেলে সমাজের জন্য নেগেটিভ ম্যাসেজ যাবে। আর শিশুদের জন্য এটা পজিটিভ ম্যাসেজ হবে।’
পরে আদালত তার জামিন নামঞ্জুরের আদেশ দেন।
পূর্বকোণ/এএইচ

















