চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তায় এখনই জাতীয় ব্যবস্থা প্রয়োজন

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তায় এখনই জাতীয় ব্যবস্থা প্রয়োজন

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ২:১৮ অপরাহ্ণ

দ্বিতীয় পর্ব। ভারত থেকে আমরা কী শিখতে পারি- ভারতেও চিকিৎসকদের ওপর হামলা দীর্ঘদিনের সমস্যা। সেখানে এখনও সব রাজ্যের জন্য একইধরনের একক কেন্দ্রীয় চিকিৎসক-সুরক্ষা আইন নেই, তবে বিভিন্ন রাজ্য নিজস্ব আইন করেছে। কেরালার আইন এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। কেরালারHealthcare Service Persons and Healthcare Service Institutions (Prevention of Violence and Damage to Property) Amendment Act, ২০২৩ চিকিৎসক ছাড়াও নার্স, প্যারামেডিক্যাল কর্মী, নিরাপত্তাকর্মীসহ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুরক্ষার আওতায় এনেছে। আইনের অধীনে স্বাস্থ্যকর্মীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ক্ষেত্রে অপরাধের ধরন অনুযায়ী কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। গুরুতর শারীরিক আঘাতের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ ভারতীয় রুপি পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। ২০২৬ সালেও কেরালায় হাসপাতালের কর্মীদের হুমকি বা সহিংসতার ঘটনায় এই বিশেষ আইন প্রয়োগ করে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও আদালতে পাঠানোর উদাহরণ দেখা গেছে। শিক্ষাটি পরিষ্কার—হাসপাতালের সহিংসতাকে সাধারণ ‘ঝগড়া’ হিসেবে দেখলে চলবে না।

ব্রিটেনে কী হয়? যুক্তরাজ্যের আইন অঞ্চলভেদে ভিন্ন। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে m Assaults on Emergency Workers (Offences) Act ২০১৮ অনুযায়ী দায়িত্ব পালনরত নির্দিষ্ট emergency worker- এর common assault ev battery-জন্য বিশেষ আইনি ব্যবস্থা রয়েছে, যার আওতায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে frontline health worker-ও অন্তর্ভুক্ত হন। ২৮ জুন ২০২২-এর পর সংঘটিত এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড হতে পারে। গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে আরও গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ আনা যায় এবং ভুক্তভোগী দায়িত্ব পালনরত emergency worker হলে সেটি sentencing-এর সময় aggravating factor হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ব্রিটেনেও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর সহিংসতার সমস্যা শেষ হয়ে যায়নি। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনেও NHS কর্মীদের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক physical aggression-এর ঘটনা উঠে এসেছে। অর্থাৎ আইন থাকলেই সহিংসতা সম্পূর্ণ বন্ধ হয় না। তবে আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর হামলা কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নয়; এটি criminal justice-এর বিষয়। বাংলাদেশেও এই মনোভাব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন : চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিতে প্রশিক্ষিত, মারামারি সামলাতে নয়। কোনো রোগীর স্বজন উত্তেজিত হয়ে হুমকি দিতে শুরু করলে চিকিৎসকের সেখানে দাঁড়িয়ে তর্ক চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি সহিংস হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া উচিত, সহকর্মীদের সতর্ক করা উচিত এবং security team-কে ডাকতে হবে। জন্য চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের conflict recognition, de-escalation Ges workplace violence management বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। নিজেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া দায়িত্ব থেকে পালানো নয়। একজন আহত চিকিৎসক অন্য রোগীদেরও চিকিৎসা দিতে পারবেন না।

যোগাযোগব্যবস্থাও উন্নত করতে হবে : সব সংঘর্ষ যে শুধু অপরাধপ্রবণতা থেকে সৃষ্টি হয়, তা নয়। অনেক সময় দুর্বল যোগাযোগ, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং রোগীর অবস্থা সম্পর্কে পরিবারকে পর্যাপ্ত তথ্য না দেওয়াও ক্ষোভ বাড়াতে পারে। সংকটাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত structured communication থাকা প্রয়োজন। রোগীর অবস্থা খারাপ হলে, চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা থাকলে কিংবা মৃত্যুর আশঙ্কা থাকলে যথাসম্ভব পরিষ্কারভাবে তা পরিবারকে জানাতে হবে। একই সঙ্গে complaint বা grievance system সহজলভ্য করতে হবে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—যোগাযোগের ঘাটতি কখনোই সহিংসতার অজুহাত হতে পারে না।

কঠোর আইন প্রয়োজন : বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনরত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর ইচ্ছাকৃত হামলাকে সাধারণ মারামারির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা না করে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। হাসপাতালের ভেতরে দায়িত্ব পালনরত স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর হামলার ক্ষেত্রে দ্রুত ঋওজ, দ্রুত তদন্ত এবং গুরুতর ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। হাসপাতালের সম্পত্তি ভাঙচুরের ক্ষেত্রেও ক্ষতিপূরণের বিধান কার্যকর হওয়া উচিত। অপরাধের পর যদি অভিযুক্ত সহজে পার পেয়ে যায়, তাহলে সমাজে একটি বিপজ্জনক ধারণা জন্মায়—চিকিৎসকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার বা মারধর করলেও তেমন কিছু হয় না। এই ধারণা ভাঙতে হবে।

জাতীয় Hospital Safety Policy এখন সময়ের দাবি : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালের জন্য একটি National Hospital Safety and Violence Prevention Policy তৈরি করা প্রয়োজন। এই নীতির মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে থাকতে হবে— কঠোর hospital access control রোগীর দর্শনার্থীর সংখ্যা সীমিত করা; ২৪ ঘণ্টা প্রশিক্ষিত professional hospital security; CCTV Ges Security Control Room; Public Announcement Szstem; Code White বা সমমানের violence-response protocol; panic button I rapid-response team প্রয়োজন হলে দ্রুত পুলিশি সহায়তা; চিকিৎসক ও নার্সদের De escalation training; প্রতিটি সহিংসতার ঘটনা বাধ্যতামূলকভাবে report করা; hospital violence registry তৈরি করা; চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর হামলার দ্রুত তদন্ত ও বিচার; চিকিৎসা-সংক্রান্ত অভিযোগের জন্য স্বাধীন ও সহজ grievance mechanism; এবং হাসপাতালের দৃশ্যমান স্থানে zero-tolerance warning poster বাধ্যতামূলক করা।

ডা. রকিবের মৃত্যু যেন শুধু একটি পুরোনো সংবাদ না হয় : ২০২০ সালে ডা. রকিব খানের মৃত্যু আমাদের ভয়াবহ একটি সতর্কবার্তা দিয়েছিল। তখনই যদি আমরা বিষয়টিকে জাতীয়ভাবে গুরুত্ব দিতাম, আজ হয়তো বাংলাদেশের বড় হাসপাতালগুলোর প্রতিটিতে access control, professional security, panic button ব্যবস্থা থাকত। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনও অনেক ক্ষেত্রে ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া জানায়—ঘটনার আগে প্রতিরোধ করে না। এটি পরিবর্তনের সময় এসেছে। রোগীর অধিকার অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। চিকিৎসায় অবহেলার বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরও নিরাপদ কর্মক্ষেত্রে কাজ করার অধিকার আছে। হাসপাতাল কোনো উন্মুক্ত জনসমাবেশের জায়গা নয়। হাসপাতাল কোনো আদালত নয়। হাসপাতাল কোনো যুদ্ধক্ষেত্রও নয়। হাসপাতাল অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার জায়গা। আর যারা দিন-রাত সেই চিকিৎসা দেন, তাদের সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়—এটি একটি সভ্য ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার মৌলিক দায়িত্ব। ডা. রকিবের মৃত্যুর ছয় বছর পর অন্তত আমাদের এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত— আর কোনো চিকিৎসকের মৃত্যুর পর নয়; পরবর্তী হামলার আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে। (সমাপ্ত)

লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

পূর্বকোণ/আদর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট