চট্টগ্রাম রবিবার, ০৭ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ:

ঋণের জামিনদারের দায় প্রসঙ্গে

জিয়া হাবীব আহসান

১০ জুলাই, ২০১৯ | ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ

যিনি ঋণের জামিনদার হবেন ঋণগ্রহিতার অপারগতায় বা ব্যর্থতায় জামিনদারকেই সেই ঋণ শোধ করতে হবে। কেননা আপনি জামিনদার হয়েছেন বলেই ঋণগ্রহীতা ঋণ মঞ্জুরী পেয়েছেন, নইলে পেতেন না। জামিনদারকে এ বিষয়টা পরিস্কারভাবে বুঝতে হবে। তবে জামিনদার বিনিয়োগ গ্রহীতার বা ইড়ৎৎড়বিৎ এর নিকট থেকে আদায়ের শর্তে তা পরিশোধ করতে পারবেন। সুতরাং আইন বলেছে জামিনদার হওয়ার আগে নিজের পকেটে হাত দিয়ে দেখুন ঐ ঋণের টাকা অন্যান্য চার্জসহ পরিশোধে আপনার সামর্থ্য আছে কিনা? সামর্থ্য না থাকার অজুহাতে কিংবা আমি ঋণের কোন অংশ ভোগ করিনি এ অজুহাতে আইন জামিনদারকে কখনো রেহাই দেবে না।
জামিনদার সম্পর্কে আইন বলে- চুক্তি আইন ১৮৭২ সালের ১২৬ ধারার মতে যে ব্যক্তি গ্যারান্টি দেন তাকে জামিনদার বলা হয়। অর্থঋণ আইন ২০০৩ সালের ৬ (৫) ধারার বিধান মতে, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান মূল ঋণগ্রহীতার (চৎরহপরঢ়ধষ ফবনঃড়ৎ) বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করিরার সময়, তৃতীয় পক্ষ বন্ধকদাতা (ঞযরৎফ ঢ়ধৎঃু সড়ৎঃমধমড়ৎ) বা তৃতীয় পক্ষ গ্যারান্টর (ঞযরৎফ ঢ়ধৎঃু মঁধৎধহঃড়ৎ) ঋণের সহিত সংশ্লিষ্ট থাকিলে, উহাদিগকে বিবাদী পক্ষ করিবে; এবং আদালত কর্তৃক প্রদত্ত রায়, আদেশ বা ডিক্রী সকল বিবাদীর বিরুদ্ধে যৌথভাবে ও পৃথক পৃথক ভাবে (ঔড়রহঃষু ধহফ ংবাবৎধষষু) কার্যকর হইবে এবং ডিক্রী জারীর মামলা সকল বিবাদী-দায়িকের বিরুদ্ধে একইসাথে পরিচালিত হইবে, তবে শর্ত থাকে যে, ডিক্রী জারীর মাধ্যমে দাবী আদায় হওয়ার ক্ষেত্রে আদালত প্রথমে মূল ঋণগ্রহীতা-বিবাদীর এবং অতঃপর যথাক্রমে তৃতীয় পক্ষ বন্ধকদাতা (ঞযরৎফ ঢ়ধৎঃু সড়ৎঃমধমড়ৎ) ও তৃতীয় পক্ষ গ্যারান্টর (ঞযরৎফ চধৎঃু মঁধৎধহঃড়ৎ) এর সম্পত্তি যতদূর সম্ভব আকৃষ্ট করিবে, আরো শর্ত থাকে যে, বাদীর অনুকূলে প্রদত্ত ডিক্রীর দাবী তৃতীয় পক্ষ বন্ধকদাতা (ঞযরৎফ ঢ়ধৎঃু সড়ৎঃমধমড়ৎ) অথবা তৃতীয় পক্ষ গ্যারান্টার (ঞযরৎফ ঢ়ধৎঃু মঁধৎধহঃড়ৎ) পরিশোধ করিয়া থাকিলে উক্ত ডিক্রী যথাক্রমে তাহাদের অনুকূলে স্থানান্তরিত হইবে এবং তাহারা মূল ঋণগ্রহীতার (চৎরহপরঢ়ধষ ফবনঃড়ৎ) বিরুদ্ধে উহা প্রয়োগ বা জারী করিতে পারিবেন। শর্ত থাকে যে, ডিক্রী জারীর মাধ্যমে দাবী আদায় হওয়ার ক্ষেত্রে আদালত প্রথমে মূল ঋণগ্রহীতা-বিবাদীর এবং অতঃপর যথাক্রমে তৃতীয় পক্ষ বন্ধকদাতা (ঞযরৎফ ঢ়ধৎঃু সড়ৎঃমধমড়ৎ) ও তৃতীয় পক্ষ গ্যারান্টর (ঞযরৎফ চধৎঃু মঁধৎধহঃড়ৎ) এর সম্পত্তি যতদূর সম্ভব আকৃষ্ট করিবে। আরো শর্ত থাকে যে, বাদীর অনুকূলে প্রদত্ত ডিক্রীর দাবী তৃতীয় পক্ষ বন্ধকদাতা (ঞযরৎফ ঢ়ধৎঃু সড়ৎঃমধমড়ৎ) অথবা তৃতীয় পক্ষ গ্যারান্টর (ঞযরৎফ ঢ়ধৎঃু মঁধৎধহঃড়ৎ) পরিশোধ করিয়া থাকিলে উক্ত ডিক্রী যথাক্রমে তাহাদের অনুকূলে স্থানান্তরিত হইবে এবং তাহারা মূল ঋণগ্রহীতার (চৎরহপরঢ়ধষ ফবনঃড়ৎ) বিরুদ্ধে উহা প্রয়োগ বা জারী করিতে পারিবেন।’
বাংলাদেশ সংবিধানের ১০৭ অনুচ্ছেদে গ্যারান্টির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে যে, “গ্যারান্টি বলতে কোন উদ্যোগের মুনাফা নির্ধারিত পরিমাপের অপেক্ষা কম হলে তার জন্য অর্থ প্রদান করিবার বাধ্যবাধকতা যাহা এই সংবিধান প্রবর্তনের পূর্বে গৃহীত হয়েছে।” আইনে জামিনদারের পক্ষে শুধু এতটুকু অধিকার বিদ্যামান যে, তিনি প্রদত্ত অর্থ ঋণগ্রহীতার নিকট থেকে আদায় করতে পারবেন। থার্ড পার্টি মর্টগেজর ও গ্যারান্টরকে অর্থঋণ মামলায় বিবাদী কেন করতে হয়? কেন চার্জ ডকুমেন্ট বা জামিন নামায় জামিনদারের স্বাক্ষর ছবি ইত্যাদি কেন জমা নেয়া হয় তা জামিনদারকে বুঝতে হবে। মনে রাখতে হবে এটা কোন ভড়ৎসধষরঃু নয়।
জামিনদারকে বুঝতে হবে ঋণগ্রহীতার ব্যর্থতায় তাকেই ঐ পাওনা শোধ করতে হবে। আমি বিনিয়োগ বা ঋণ ভোগ করিনি একথা বলে জামিনদারের পার পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। বিনিয়োগকারী সংস্থাকেও দেখতে হবে জামিনদারের আর্থিক ক্ষমতা কতটুকু। শুধুমাত্র নিয়মের খাতিরে জামিনদার করলে ঐ টাকা আদায় হবে না। জামিনদারকে কষ্ট দেয়া হবে এবং এতে ব্যাংকের সময় ও জনগণের অর্থের অপচয় হবে মাত্র। ব্যাংক এজন্য এখন ংঢ়ড়ঁংব মঁধৎধহঃড়ৎ ংুংঃবস চালু করেছে। ফলে দেখা যায় স্বামীর সাথে স্ত্রী এবং স্ত্রী এর সাথে স্বামীকেও কোর্টে হাজির হতে হবে।
জামিনদারের বিশেষ অধিকার সম্পর্কে বিশিষ্ট আইনজীবী শামিমা ফেরদৌস মিলির অভিমত হলো, জামিনদারের সম্পত্তি আকৃষ্ট করার আগে অবশ্য মূল ঋণগ্রহীতার বন্ধককৃত সম্পত্তি ছাড়াও অন্যান্য সম্পত্তি বিজ্ঞ আদালতের নোটিশে আনার জন্য ডিক্রিদারকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ অর্থ ঋণ আইন ২০০৩ এর ১২(৩) ধারায় বলা হয়েছে “বন্ধকী সম্পত্তি” কিন্তু ৩৩ ধারায় বলা হয়েছে ‘সম্পত্তি’। সেক্ষেত্রে প্রথমে মূল ঋণ গ্রহীতার সকল সম্পত্তি ঋণের বিপরীতে সমন্বয়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেই জামিনদারকে ঋণের জন্য বাধ্য করা হবে। একইভাবে গ্রেফতারী পরোয়ানা কিংবা দেওয়ানী কারাবাসের ক্ষেত্রেও প্রথমে মূল ঋণ গ্রহীতাকে গ্রেফতার করে তার সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে দেনা সমন্বয় করতে হবে। সেক্ষেত্রে সম্পূর্ণ সমন্বয় করতে ব্যর্থ হলেই জামিনদারকে দেনা সমন্বয়ের জন্য বাধ্য করা হবে। এ বিষয়ে মহামান্য হাইকোর্টের এ.বি.এম লিটন বনাম বাংলাদেশ গং মামলাটির রায় প্রণিধানযোগ্য (৬৬ ডিএলআর পৃষ্ঠা ২০৭)।
উপরের আলোচনা থেকে একথাই সুস্পষ্ট যে একটি ঋণ বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জামিনদারের দায় দায়িত্ব রয়েছে। বিনিয়োগ গ্রহীতার ব্যর্থতায় তাকেই উক্ত ঋণ পরিশোধ করতে হবে। উপসংহারে এক কথায় বলা যায় জামিনদার ঋণের জন্য ঋণগ্রহীতার সমান দায়ী।

লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, মানবাধিকার ও সুশাসনকর্মী।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট