
বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। দেশের অধিকাংশ মানুষ প্রথম চিকিৎসাসেবা পায় এই হাসপাতালগুলো থেকেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অধিকাংশ উপজেলা হাসপাতালে রোগীর চাপ অত্যন্ত বেশি, আর ডাক্তার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে রোগী ও চিকিৎসক-দুজনই একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
সাধারণত একটি ৫০ বেডের উপজেলা হাসপাতালে প্রায় ১০ জন মেডিকেল অফিসার অনুমোদিত থাকে। অনেকের ধারণা, এই সংখ্যক ডাক্তার দিয়ে হাসপাতালটি সহজেই পরিচালনা করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। একটি হাসপাতালকে প্রতিদিন আউটডোর (OPD), ইনডোর (IPD) এবং ২৪ ঘণ্টা জরুরি বিভাগ চালাতে হয়। একইসঙ্গে চিকিৎসকদের প্রশাসনিক সভা, কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স মিটিং, ডকুমেন্টেশন, রেফারাল সমন্বয় এবং নানা ধরনের মেডিকো-লিগ্যাল কাজও করতে হয়।
এছাড়াও বাস্তব জীবনে প্রতিদিন সব ডাক্তার কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। কেউ আর্ন লিভে থাকেন, কেউ অসুস্থতার কারণে ছুটিতে থাকেন, আবার কেউ প্রশিক্ষণ বা সরকারি দায়িত্বে বাইরে থাকেন। নাইট ডিউটি করার পরও একজন ডাক্তারকে পরের দিন বিশ্রাম দিতে হয়। ফলে কাগজে-কলমে ১০ জন ডাক্তার থাকলেও প্রতিদিন কার্যত ৭-৮ জনের বেশি ডিউটিতে থাকেন না।
এখন প্রশ্ন হলো-এই সংখ্যক ডাক্তার দিয়ে একটি ৫০ বেডের হাসপাতাল কীভাবে পরিচালিত হয়?
প্রথমত, আউটডোর বিভাগে রোগীর চাপ অনেক বেশি। চিকিৎসার মান বজায় রাখতে একজন রোগীকে অন্তত ১০ মিনিট সময় দেওয়া উচিত। এই হিসেবে একজন ডাক্তার দিনে সর্বোচ্চ ২২ জন রোগী দেখতে পারেন। যদি আউটডোরে তিনজন ডাক্তার থাকেন, তাহলে প্রতিদিন প্রায় ৬৬ জন রোগী দেখা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে অনেক হাসপাতালে দিনে ২০০-৩০০ জন পর্যন্ত রোগী দেখা হয়। ফলে একজন রোগীর জন্য সময় দাঁড়ায় মাত্র দুই বা তিন মিনিট। এতে রোগীও সন্তুষ্ট হন না, চিকিৎসকরাও মানসম্মত চিকিৎসা দিতে পারেন না।
দ্বিতীয়ত, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ইনডোরে অন্তত দুইজন ডাক্তার দরকার। একইসঙ্গে জরুরি বিভাগ ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হলে দিনে, সন্ধ্যায় এবং রাতে আলাদা ডাক্তার রাখতে হয়। এর পাশাপাশি বড় কোনো জরুরি পরিস্থিতি বা অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে একজন অন-কল বা ব্যাকআপ ডাক্তারও থাকা প্রয়োজন।
এই হিসাব করলে দেখা যায়, একটি ৫০ বেডের হাসপাতাল নিরাপদভাবে চালাতে প্রতিদিন অন্তত ৯ জন ডাক্তার সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হয়। কিন্তু ছুটি, অসুস্থতা, প্রশিক্ষণ এবং নাইট ডিউটির পর বিশ্রামের বিষয়টি বিবেচনা করলে প্রতিদিন ৯ জন ডাক্তার পাওয়া যায় না। তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিকল্পনায় সাধারণত একটি ‘লিভ অ্যাডজাস্টমেন্ট ফ্যাক্টর’ ব্যবহার করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে এটি সাধারণত ১.২৫ থেকে ১.৪ এর মধ্যে ধরা হয়।
যদি দৈনিক প্রয়োজন ৯ জন ডাক্তার ধরা হয় এবং এর সঙ্গে ১.৩৩ ফ্যাক্টর ব্যবহার করা হয়, তাহলে মোট প্রয়োজন দাঁড়ায় প্রায় ১২ জন ডাক্তার। অর্থাৎ একটি ৫০ বেডের উপজেলা হাসপাতালের জন্য ন্যূনতম কার্যকর ডাক্তার সংখ্যা হওয়া উচিত ১২ জন।
তবে জনবল সমস্যার পাশাপাশি উপজেলা হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও একটি বড় বাস্তবতা। অনেক হাসপাতালেই পর্যাপ্ত কনসাল্টেশন রুম নেই। ফলে একাধিক ডাক্তারকে একইকক্ষে বা অস্থায়ী জায়গায় রোগী দেখতে হয়, যা রোগীর গোপনীয়তা ও চিকিৎসার মান-উভয়ের জন্যই সমস্যা তৈরি করে। একইভাবে অনেক হাসপাতালে রোগী ও চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট সুবিধাও নেই।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। বিশেষ করে রাতের সময় নিরাপত্তা পর্যাপ্ত না থাকলে চিকিৎসকদের জন্য কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিছু কিছু হাসপাতালে নারী চিকিৎসকদের জন্য নাইট ডিউটি করা বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়, কারণ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, নিরাপদ বিশ্রাম কক্ষ বা ডিউটি রুমের ব্যবস্থা থাকে না। একটি আধুনিক হাসপাতাল ব্যবস্থায় এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং উপজেলা হাসপাতালের উন্নয়ন বলতে শুধু জনবল বাড়ানোই নয়, বরং অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যাপ্ত কনসাল্টেশন রুম, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট, নিরাপদ ডিউটি রুম এবং কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করতে হলে শুধু হাসপাতালের ভবন নির্মাণ করলেই হবে না; প্রয়োজন বাস্তবসম্মত মানবসম্পদ ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনা। একটি পরিষ্কার জাতীয় নীতিমালার মাধ্যমে উপজেলা হাসপাতালের জন্য যুক্তিসঙ্গত ডাক্তার স্টাফিং স্ট্যান্ডার্ড নির্ধারণ করা জরুরি। ৫০ বেডের হাসপাতালের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১২ জন ডাক্তার এবং উন্নত সেবা কাঠামোর জন্য ১৬-১৭ জন ডাক্তার নিশ্চিত করা গেলে গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন সময় এসেছে উপজেলা হাসপাতালগুলোর মানবসম্পদ, অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও বাস্তবসম্মতভাবে পুনর্বিন্যাস করার-যাতে গ্রামীণ জনগণ তাদের নিকটবর্তী হাসপাতাল থেকেই নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা সেবা পেতে পারেন।
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রæান্সউইক। এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।
পূর্বকোণ/ইবনুর