চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

চাল চালাচালিতে ‘সাগরচুরি’
চাল চালাচালিতে ‘সাগরচুরি’

৮ মার্চ, ২০২০ | ২:১২ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

চাল চালাচালিতে ‘সাগরচুরি’

চাল সংগ্রহ, খাদ্য ঘাটতি পূরণ, ডিও’র অনুকূলে গুদাম থেকে চাল সরবরাহ নিয়ে যেন ‘সাগরচুরি’ চলছে হালিশহর খাদ্য গুদামে। গুদাম ম্যানেজারের যোগসাজশে একটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে কুরে কুরে খাচ্ছে খাদ্য বিভাগকে।

প্রত্যেক আমন ও বোরো মৌসুমে সরকার ধান-চাল সংগ্রহ কর্মসূচি নেয়। কৃষকদের কাছ থেকে ধান ও মিলারদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করে সরকার। কিন্তু ধান-চাল সংগ্রহ নিয়ে প্রতিবারই প্রশ্নবিদ্ধ খাদ্য বিভাগ। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ধান ও চাল সংগ্রহ করছে খাদ্য বিভাগ। বিশেষ করে নগরীর হালিশহর ও দেওয়ানহাট খাদ্যগুদামে চলছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। পাহাড়তলী চাল ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সরকারি দুটি গুদামকে কুরে কুরে খাচ্ছে। জানা যায়, চাল সংগ্রহ কর্মসূচিতে কেজিপ্রতি চালের মানভেদে ২ থেকে ৩ টাকা উৎকোচ দিতে হয় খাদ্য কর্মকর্তাদের। কিন্তু হালিশহর খাদ্য গুদামে ক্ষেত্রবিশেষে ৩ টাকার বেশি উৎকোচ দিতে হয়। সরকারি নিয়মানুযায়ী চালের ১৪ শতাংশ আর্দ্রতা (শুষ্ক) নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু হালিশহর খাদ্য গুদামে টাকা বেশি দিলে চিটা চালের মানও ভালো হয়ে যায়। আর টাকা না দিলে ভালো চালও চিটা হয়ে যায়।
একাধিক মিলারের অভিযোগ, বর্তমানে বাজারে চালের দাম বেশি। খাদ্য গুদামে চাল বিক্রিতে উৎকোচও বেশি গুণতে হয়। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পকেট ভরছে খাদ্য কর্মকর্তা ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের।

জানা যায়, নগরীতে ২৬টি মিল মালিকের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করছে খাদ্য বিভাগ। এসব মিল থেকে সরকার ৭৪১ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহ করবে।
চালমিল মালিক সমিতির ফরিদ উদ্দিন আহমদ পূর্বকোণকে বলেন, ‘এবার কড়াকড়ি করায় ভালোমানের চাল দিতে হচ্ছে। এতে অনেক ব্যবসায়ীকে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি গুণতে হবে।’
একাধিক মিলার জানান, সরকারের সঙ্গে চুক্তির সময় চালের বাজারদর ছিল ২২-২৩ টাকা। খাদ্য বিভাগের জন্য তিন টাকা উৎকোচ ধরে চুক্তি করা হয়েছিল। কিন্তু গত মাসের চাল সংগ্রহ কার্যক্রম অঘোষিতভাবে বন্ধ থাকায় চালের দাম বেড়ে যায়। দাম বাড়ার পরও খাদ্য বিভাগকে কেজিপ্রতি তিন টাকা করে উৎকোচ দিতে হচ্ছে।

ডিও বাণিজ্য : সরকারের বিভিন্ন খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির বিপরীতে গুদাম থেকে খাদ্যশস্য সরবরাহ করা হয়। কিন্তু ডিও নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে লুকোচুরি। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির বিপরীতে গুদাম থেকে চাল সরবরাহ করা হয়। ডিও’র বিপরীতে চলে আসছে সাগরচুরি।
একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে ডিও কেনা হচ্ছে ২০-২২ টাকা দরে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, সাংসদ, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন কর্মসূচির ডিও’র বিপরীতে গুদাম থেকে চাল নেওয়া হয়। উৎকোচের অঙ্কের উপর নির্ভর করে গুদাম থেকে চাল সরবরাহ করা হয়।
একাধিক সূত্র জানায়, বিশ্বখাদ্য সংস্থা, প্রকল্পের অনুকূলে চাপাইনবাবগঞ্জ, বগুড়া জেলা থেকে ভালোমানের চাল সংগ্রহ করেছে খাদ্য বিভাগ। যেসব চালের বাজার দর ৪০-৪২ টাকা। ২০-২২ টাকা দরের ডিও নিয়ে উন্নতমানের চাল নিয়ে যায় খাদ্য গুদাম থেকে। খাদ্য বিভাগকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে এসব চাল নিয়ে যায় পাহাড়তলী বাজারের একটি সিন্ডিকেট। ৫ ব্যবসায়ী শুধু হালিশহর সিএসডি খাদ্যগুদাম নয়, দেওয়ানহাট খাদ্যগুদামও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চাল চালাচালিতে খুঁড়ে খাচ্ছে খাদ্য বিভাগকে।

হালিশহর খাদ্যগুদাম ম্যানেজার থোয়াই প্রু মারমা ও গুদাম কর্মচারী নজরুলের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের যোগসাজশে পাহাড়তলী বাজারের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ঘুন পোকার মতো কুরে কুরে খাচ্ছে খাদ্য বিভাগকে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গুদাম ম্যানেজার থোয়াই প্রু মারমা ব্যস্ত রয়েছেন বলে ফোনের লাইন কেটে দেন।
একাধিক সূত্র জানায়, ওই সিন্ডিকেটের যোগসাজশে উপজেলা খাদ্য গুদামও কৌশলে কুরে কুরে খাচ্ছে। উপজেলা থেকে ডিও সংগ্রহ করে হালিশহর ও দেওয়ানহাট খাদ্য গুদাম থেকে চাল সরবরাহ করা হয়। এতে শুধু বরাদ্দের ইনভয়েস আদান-প্রদান করা হয়। কাগজপত্র ঠিক রেখে চাল পাচার হয় খোলা বাজারে। খাদ্য বিভাগ এবং খাদ্য গুদাম কমকর্তাদের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে পাচার হয়ে আসছিল উন্নতমানের চাল।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৭ সালে হালিশহর সিএসডি গুদাম থেকে খোলাবাজারে পাচারকালে বিপুল পরিমাণ চাল জব্দ করেছিল র‌্যাব। এ ঘটনায় ৭ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। মামলায় খাদ্য বিভাগের দুই কর্মকর্তা, পাহাড়তলী-খাতুনগঞ্জের দুই ব্যবসায়ী ও ট্রাকচালকসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
জানা যায়, নওগাঁ, দিনাজপুর, নেত্রকোণা ও আশুগঞ্জের চাল উন্নতমানের। এসব অঞ্চলের চালের কদর বেশি। এ চালের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি থাকে চাল ব্যবসায়ী চক্রের। এসব অঞ্চলের চালের কদর বেশি হওয়ায় পাচারের দরও একটু বেশি হয়।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 208 People

সম্পর্কিত পোস্ট