
ফেসবুকজুড়ে একটিই স্ট্যাটাস। সেটিও দিয়েছিল একমাস আগে, মার্চের ১৪ তারিখে। রমজানের বিকেল, ইফতারের আগ মুহূর্তের সেই নরম আলো-আঁধারিতে আবদুল ওয়াদুদ সায়েম লিখেছিলেন কয়েকটি লাইন। ‘আমি ক্ষমা প্রার্থী’-শিরোনামের সেই সংক্ষিপ্ত লেখায় তিনি বলেছিলেন, ‘কোনোদিন যদি আমার কোনো কথায় কেউ ব্যথা পেয়ে থাকেন কিংবা কাঁদেন, বিনীতভাবে সবাই ক্ষমা করে দেবেন।’ এ যেন কোনো সাধারণ স্ট্যাটাস ছিল না-ছিল বিদায়ের ভাষা, অজান্তে রেখে যাওয়া শেষ দরখাস্ত!
২১ বছরের এক তরুণ, যার সামনে তখনও পুরো জীবন পড়ে থাকার কথা, সে কেন হঠাৎ এমন ক্ষমা চেয়ে নিলো সবার কাছে? মৃত্যু কি তবে আগেভাগেই তার দরজায় কড়া নাড়ছিল? নাকি অন্তরের গভীরে জেগে উঠেছিল কোনো অজানা পূর্বাভাস? ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে (এসএসএমসি) ভর্তি হয়েছিলেন সায়েম। আর কদিন পরেই শুরু হতো তার সেই স্বপ্নের দৌড়। কিন্তু তার আগেই সব শেষ। ওই স্ট্যাটাসটি দেওয়ার ঠিক একমাস পর গত বৃহস্পতিবারের সন্ধ্যায়, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে লামার মাতামুহুরী নদীর জলে ডুবে মারা গিয়েছেন এই তরুণ। এরপর সায়েমের সেই স্ট্যাটাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। সেটির নিচে একে একে জমছে মানুষের শোক, বিস্ময় আর না বলা অনেক প্রশ্ন।
ফারহান মোহাম্মদ ফাহিম সিকদার নামের একজন লিখেছেন, ‘মানুষ মৃত্যুকে এভাবেও চিনে। কৌত‚হলী হয়ে সায়েমের প্রোফাইলে ঢুকলাম। দেখলাম একটি পোস্ট ছাড়া কোনো পোস্ট নেই। সেটিও কিনা মৃত্যুর আগমনী বার্তা।’
আব্দুল আহাদ নামের আরেক তরুণের কণ্ঠে উঠে আসে কঠিন সত্য-‘জীবন কতটা অনিশ্চিত তাই না? পরপর দুবছর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দিলাম, আল্লাহ্ তায়ালা ভাগ্যে রাখেননি। আর এই ছেলেটি স্বপ্ন দেখলো, স্বপ্নের পেছনে ছুটলো, স্বপ্ন পূরণ হলো, কিন্তু স্বপ্নকে ছুয়ে দেখার আগেই আল্লাহ তায়ালার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেল। আসলে সবই মিথ্যা, মৃত্যুই আসল।’
আবদুল ওয়াদুদ সায়েম বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। ছোটকাল থেকেই তিনি যেমন মেধাবী, তেমন ছিলেন শান্ত-ন¤্র। তার বাবা মোহাম্মদ ছায়েফ উল্লাহ চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের শারীরিক শিক্ষা বিভাগে কর্মরত আছেন। ছেলে যেদিন পানিতে ডুবে যায়, তখন তিনি ছিলেন কলেজে পরীক্ষার হলে। হঠাৎ খবর পেয়ে ছুটে যান লামার পথে-সড়ক, নদী পেরিয়ে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হয়ে যায় সন্ধ্যা। পরে অন্যদের সঙ্গে ছেলের খোঁজে নৌকা নিয়ে নিজেও উদ্ধারে নামেন নদীতে। শেষ পর্যন্ত ডুবুরিরা তুলে আনে-তার সন্তানের নিথর দেহ।
গতকাল শুক্রবার সকালে গ্রামের বাড়ি সীতাকুণ্ডের মহানগর এলাকায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় সায়েমকে। বিদায়বেলায় বড় আদরের ধনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন মোহাম্মদ ছায়েফ উল্লাহ। অস্ফুট স্বরে শুধু বলছিলেন, ‘আমার বাপ আর নাইরে। বাপ, মরে যাবি বলেই কি এত সুন্দর জায়গা খুঁজে নিলি বাপ। জীবনে তো কারও ক্ষতি করিনি, আল্লাহ এত বড় শাস্তি দিলে কেন?’
চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রভাষক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সায়েমের বাবার সহকর্মী। একই স্টাফ কোয়ার্টারে দুজনের বাসা। সে হিসেবে সায়েমকে বহুদিন ধরেই চেনেন এই শিক্ষক। স্মৃতিচারণ করে মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘ও এতটা ভালো আর মেধাবী ছেলে ছিল, অকল্পনীয়। বুধবার মাগরিবের নামাজের সময়ও তার সঙ্গে মসজিদে দেখা হলো। পরদিন মাগরিব হতে হতেই-এমন একটা সম্ভাবনামী ছেলে মারা যাবে ভাবতেই পারছি না। বাবা-মা আর নিজের স্বপ্ন ছুঁয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেল। ২৫ এপ্রিল তার ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ক্লাসে সায়েম আর কোনোদিন থাকবে না।’
এই শিক্ষক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘ইদানিং ফেসবুকে কিছু জায়গা ভাইরাল হচ্ছে, সেখানে কিছু কটেজও গড়ে উঠছে। কিন্তু নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই নেই। তরুণেরা গিয়ে সেখানে একের পর এক প্রাণ দিচ্ছে। কিন্তু কটেজ মালিকগুলোর কোনো শাস্তি হচ্ছে না।’
তবে সব প্রশ্ন ছাপিয়ে বারবার ফিরে আসছে সায়েমের সেই স্ট্যাটাস। একটি ক্ষমা প্রার্থনা, যেটি এখন হয়ে উঠেছে চিরবিদায়ের দলিল। মার্চে যে ক্ষমা চেয়েছিল, এপ্রিলে সে চলে গেল। আর সবার জন্য রেখে গেলো-টাইমলাইন ভরা একরাশ নীরবতা আর বুকভরা হাহাকার।