চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

সর্বশেষ:

শ্বাসরোধ করে হাসপতাল নয়

সিআরবি কেড়ে নেবেন না

প্রফেসর ড. অনুপম সেন

১৮ আগস্ট, ২০২১ | ৫:০০ পূর্বাহ্ণ

আমার জন্ম চট্টগ্রামে। বড় হয়েছি চট্টগ্রাম শহরেই। চৈতন্যের উন্মেষও ঘটেছে এই শহরে। ছোটবেলা থেকেই দেখছি- চট্টগ্রাম অসাধারণ সুন্দর একটি শহর। ৫০ দশকের প্রথম দিকের কথা- তখন চট্টগ্রাম শহরের প্রায় প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে পুকুর ছিলো। শহরে অনেক মাঠ ছিলো। দিঘি ছিলো। রানীরদিঘি, আসকারদিঘি, লালদিঘিসহ চমৎকার ৭-৮টি দিঘি ছিলো শহরে। প্রায় প্রত্যেকটি রাস্তার দুই পাশে গাছ ছিলো। শহরের পাহাড়গুলো সব অক্ষত ছিলো। ব্রিটিশরা আমাদের শোষণ করেছে। সম্পদ নিয়ে গেছে। কিন্তু উন্নয়নের জন্য প্রকৃতি ধ্বংস করেনি। চট্টগ্রাম শহরের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের কাজটা শুরু হয়েছিলো পাকিস্তান আমলে। পাকিস্তানি শাসকেরা ৬০ দশকের দিকে শহরের কাচারি পাহাড়- যেটাকে পরীর পাহাড় বলা হয়, সে পাহাড়টি কেটে নিউ মার্কেট তৈরি করে। এরপর সেখানে এস্টেট ব্যাংক করা হলো। পোস্ট অফিসের জন্য কিছু অংশ কাটা হলো। পরে বাটালি হিল কেটে ফেলা হলো। এরপর কত পাহাড় যে কাটা হলো!

এখন পুকুরগুলো ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। দিঘিগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। বলতে গেলে চট্টগ্রাম শহরে কোনো খেলার মাঠ নেই। প্রত্যেকটি রাস্তার দুই পাশে গাছ থাকার কথা ভাবাই যায় না। শহরের কোথাও কোনো উন্মুক্ত জায়গা নেই। মানুষ প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারবে এমন কিছু নেই। একটা শহরে যদি উন্মুক্ত জায়গা না থাকে, মাঠ না থাকে, শিশু-কিশোর ও তরুণরা যদি খেলতে না পারে, তাদের কন্ঠের কল-কাকলিতে, শব্দে যদি মাঠ বা উন্মুক্ত স্থান স্পন্দিত না হয় সে শহর তো প্রাণহীন।

আজ থেকে ৩০-৪০ বছর আগে বাংলাদেশ হওয়ার কিছুদিন পর ডিসি হিলে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। ওয়াহিদুল হক সাহেব এটার আয়োজন করেছিলেন। এরপর থেকে ডিসি হিলে নিয়মিত পহেলা বৈশাখ উদযাপন হতো। বসন্ত বরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী, নজরুল জন্মজয়ন্তী উদযাপন করা হতো। বাঙালির কত প্রাণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। তা আজ বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো অনুষ্ঠান হয় না।

ঢাকায় অনেক উন্মুক্ত জায়গা আছে। সেখানে রমনা পার্ক আছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান আছে। চট্টগ্রামে কী এরকম একটি জায়গা আছে? সিআরবি ছাড়া একটিও নেই। যে কারণে এই সিআরবিতেই এখন পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হচ্ছে। বসন্ত উৎসব হচ্ছে। বাঙালির প্রাণের সব উৎসব হচ্ছে। হাসপাতাল নির্মাণের মাধ্যমে চট্টগ্রামবাসীর কাছ থেকে যদি এই সিআরবিও কেড়ে নেওয়া হয়- তাহলে এরচেয়ে বড় দুঃখের ব্যাপার আর কি হতে পারে? বড় অকল্যাণকর কি হতে পারে?

সিআরবি এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। এখানে কয়েক হাজার গাছ আছে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে, পাহাড় ঘিরে এই সিআরবিতে শতবর্ষী গাছ এমনকি ২০০-৩০০ বছরের পুরনো গাছ আছে। আছে ১৬০-১৭০ প্রজাতির গাছ। এরমধ্যে ৭-৮ প্রজাতির গাছ আছে যেগুলো বিলুপ্তির পথে। অনেক পশুপাখির বিশেষত পাখির আবাসস্থল এই সিআরবি। শহরের মধ্যে প্রকৃত সবুজের আধার সিআরবি। মানুষের বিশুদ্ধ অক্সিজেন নেওয়ার কেন্দ্র সিআরবি। তাই সিআরবিকে চট্টগ্রামের ফুসফুস বলা হচ্ছে।

চট্টগ্রামে হাসপাতাল করতে চাইলে করা যেতে পারে। কিন্তু সিআরবিতে হাসপাতাল করতে হবে কেনো? ৫০০ শয্যার হাসপাতাল, ১০০ ছাত্রের মেডিকেল কলেজ, ৫০ ছাত্রীর নার্সিং ইনস্টিটিউট করতে হলে অনেকগুলো অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এসব করার জন্য সিআরবি থেকে যদি ৬ একর জায়গা নিয়ে নেওয়া হয়- এখানের আর কোনো কিছু অবশিষ্ট থাকবে? চট্টগ্রামের ফুসফুসের উপর এই করাত কার জন্য? কিছু ধনী লোকের চিকিৎসায় হাসপাতাল তৈরির জন্য?

আমরা জানি ইউনাইটেডসহ ঢাকা ও চট্টগ্রামে অনেকগুলো হাসপাতাল আছে- যেখানে একদিনের জন্য হাজার হাজার টাকা নেওয়া হয়। এসব হাসপাতাল সাধারণ মানুষের জন্য নয়। হাসপাতাল যদি করতেই হয়- সিআরবি বাদ দিয়ে অন্য জায়গায় তো করা যায়। রেলওয়ের তো প্রচুর জমি আছে। রেলওয়ের বক্ষব্যাধি হাসপাতাল বা বিজিএমইএ’র পাশের জমিতে হাসপাতাল করা যায়। সেসব স্থানে না করে কেনো সিআরবিতে করা হচ্ছে?

সাগর-পাহাড় ঘেরা চট্টগ্রাম একটি অসাধারণ শহর। কিন্তু এর সব পাহাড় এখন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম শহরের সৌন্দর্যের শেষ নিদর্শন বলা যায়- সিআরবি এলাকাকে। এটি কেনো ধ্বংস করতে হবে? এটি কারা ধ্বংস করতে চায়? যদি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বা রেল মন্ত্রণালয় এটি ধ্বংস করতে চান- তাহলে বলবো তারা সত্যিকার অর্থে চট্টগ্রামের উন্নয়ন চান না। চট্টগ্রামের কল্যাণ চান না। সিআরবিতে হাসপাতাল করা মানে চট্টগ্রামকে বিনষ্ট করারই চেষ্টা। চট্টগ্রামবাসীর সঙ্গে শত্রুতা করা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে মহোত্তম ঘটনা স্বাধীনতা যুদ্ধ। এই যুদ্ধে দেশের জন্য প্রাণ দেন আমার ছাত্র ও চাকসুর প্রথম নির্বাচিত জিএস আব্দুর রব। তাকে এই সিআরবিতে সমাহিত করা হয়েছে। আরো ১১ জন শহীদের সমাধি আছে এখানে। শহীদদের সমাধির উপর হাসপাতাল করা হলে তাদের পবিত্র স্মৃতির প্রতি চরম অবমাননা করা হবে।

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু যে সংবিধান জাতিকে উপহার দিয়েছেন- সেই সংবিধান অনুযায়ী কালচার, হেরিটেজ এবং পরিবেশ রক্ষা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। সিআরবি আমাদের কালচারাল হেরিটেজের অংশ। যদি এখানে হাসপাতাল করা হয়- তাহলে সংবিধান লঙ্ঘন করা হবে। এই অধিকার তো কারো নেই।

একুশে পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ ও

উপাচার্য, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট