
রক্তক্ষরণজনিত বংশগত রোগ হিমোলিয়ায় আক্রান্ত বিশ্বের বড় একটি অংশ এখনও চিকিৎসার বাইরে। কারণ, তারা জানেই না যে তারা এই রোগে ভুগছেন। এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব হিমোফিলিয়া দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘রোগ নির্ণয়: যতেœর প্রথম পদক্ষেপ’।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমোফিলিয়া শনাক্ত না হলে চিকিৎসা শুরুই করা যায় না। ফলে রোগটি ধীরে ধীরে জটিল রূপ নেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী অক্ষমতা কিংবা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হিমোফিলিয়ায় আক্রান্তদের প্রায় ৭৫ শতাংশ এখনও শনাক্ত হয়নি। অর্থাৎ, প্রতি চারজন রোগীর মধ্যে তিনজনই জানেন না তাদের রোগ সম্পর্কে। অঞ্চলভেদে এই অবস্থা আরও প্রকট। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মাত্র ১৯ শতাংশ রোগী রোগ নির্ণয়ের আওতায় এসেছে, যেখানে ইউরোপ ও পশ্চিমা দেশগুলোতে তা প্রায় ৮৫ শতাংশ।
চিকিৎসকরা জানান, হিমোফিলিয়ার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো রক্ত জমাট বাঁধতে দেরি হওয়া। তবে সব সময় দৃশ্যমান রক্তপাত না হওয়ায় অনেক রোগী দীর্ঘদিন শনাক্তহীন থাকেন। বিশেষ করে শরীরের ভেতরে (জয়েন্ট বা মাংসপেশিতে) রক্তক্ষরণ হলে তা সহজে ধরা পড়ে না। এছাড়া দেশে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা, বিশেষায়িত ল্যাবের স্বল্পতা, সচেতনতার অভাব এবং গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতাও রোগ নির্ণয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
চমেক হাসপাতালের রক্তরোগ বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান ও রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. গোলাম রাব্বানী বলেন, হিমোফিলিয়া রোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সময়মতো রোগ নির্ণয়। অনেক রোগী সামান্য রক্তপাতকে গুরুত্ব দেন না বা বুঝতে পারেন না এটি একটি জটিল রোগের লক্ষণ। ফলে তারা অনেক দেরিতে চিকিৎসকের কাছে আসেন। অথচ শুরুতেই রোগ শনাক্ত করা গেলে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, দেশে এখনও পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা ও সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে অনেক রোগী শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সহজলভ্য রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমোফিলিয়া পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য না হলেও সময়মতো শনাক্ত করে সঠিক চিকিৎসা দিলে রোগীরা প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। কিন্তু স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে এখনও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘প্রয়োজনভিত্তিক চিকিৎসা’ চালু রয়েছে। অর্থাৎ রক্তক্ষরণ হলে তবেই চিকিৎসা নেওয়া হয়। এতে জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ। জন্মের পরপরই বা শৈশবে রোগ শনাক্ত না হলে ধীরে ধীরে জয়েন্ট ক্ষতি, অক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা দেখা দিতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি, সহজলভ্য পরীক্ষা এবং সমতাভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে হিমোফিলিয়া রোগীদের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব।
রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের ভাবনা
নিজস্ব প্রতিবেদক
উন্নত বিশ্বে ব্যয়বহুল প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা গ্রহণ করলেও বাংলাদেশের মত দেশে- যেখানে দরিদ্র রোগী ও স্বল্প সরকারি বাজেটে কার্যকরভাবে চিকিৎসা সম্ভব কিনা সেটি ভাবনার বিষয় বলে জানিয়েছেন রক্তরোগ
ডা. গোলাম রাব্বানী
বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. গোলাম রাব্বানী। তিনি বলেন, কেননা প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা পদ্ধতির জন্য একজন প্রাপ্ত বয়স্ক রোগীর আনুমানিক মাসিক ব্যয় প্রায় ৫ লাখ টাকা। যা কমপক্ষে ৬ মাস পর্যন্ত এ ব্যয় বহন করতে হয়। সেক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ব্যয়ের বিপরীতে প্রয়োজন ভিত্তিক আদর্শ সিএফসি বা ফ্যাক্টর ইনজেকশন চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যহত হলে সত্যিকারভাবেই সাধারণ রোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অধিকন্তু আমাদের দেশে ফ্যাক্টর ইনজেকশনের প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান না থাকায় এটিও সুলভ ও সহজলভ্য নয়। কীভাবে আদর্শ ফ্যাক্টর চিকিৎসা সুলভ ও সহজলভ্য করা যায় সেদিকে আমাদের সংশ্লিষ্ট সকলের মনোনিবেশ করা উচিত। কেননা আমরা শুধু হিমোফিলিয়ার চিকিৎসায় বর্তমানে প্রায় অপ্রচলিত চিকিৎসা রক্ত বা রক্তাংশ প্লাজমার উপর নির্ভরশীল। তাই প্রাথমিক চিকিৎসা পদ্ধতির জন্য রোগীর পকেট কিংবা সরকারি বাজেটের বিনিয়োগের বিনিময়ে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ব্যয় আমাদের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। এটির সার্বজনীন ব্যবহার আমাদের জন্য সূদুর পরাহত ভাবনা। তবে ঝুঁকিপূর্ণ রোগী ও ছোট শিশুদের জন্য এটি পাইলটিং করে শুরু করা যেতে পারে।
পূর্বকোণ/ইবনুর