চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০

স্মরণ : মৌলভী হাফিজুর রহমান বিএবিটি

৮ এপ্রিল, ২০২০ | ১:০৫ পূর্বাহ্ণ

হুমায়ুন করিম

স্মরণ : মৌলভী হাফিজুর রহমান বিএবিটি

কালশ্রেষ্ঠ এক মহান জ্ঞানতাপস, প্রতিথযশা এক কালজয়ী শিক্ষাগুরু, নিভৃত সত্যসাধক আর বিরল এক আধ্যাত্মিক সিদ্ধ পুরুষ মৌলভী হাফিজুর রহমান বিএবিটি। সেই শৈশবে ঘুম ভাঙ্গার আগে আমার দাদীকে মাঝে মধ্যে দেখতে আসা আমার কিংবদন্তী দাদা (সম্পর্কে আমার দাদীর মামাতো ভাই) যিনি আমাদের হাতে কলম ধরে দিয়ে বলতেন ,লেখ…. তোমার দাদার নাম হযরত মৌলানা ছিদ্দিক আহমেদ, তোমার দাদী নাম সানোয়ারা বেগম তখন বুঝার তেমন বয়স হয়নি আর এই বেলায় এসে মনে হলো এটা অন্য এক আধ্যাত্মিক হৃদ্যতা বন্ধন। আমাদের শৈশবের সেই পুণ্যবান দাদা মৌলভী হাফিজুর রহমান বিএবিটি এত পরম যতেœ আমাদের জ্ঞান স্বাক্ষর (ছবক) দিয়েছিলেন, বলতে পাড়ি তা আমাদের ভালো ছাত্র হতে ভিতর থেকে অন্য এক তাড়না সৃষ্টি করেছিলো। তারই ফলশ্রুতিতে আমার বড় ভাই জাতীয় বিশ^বিদ্যালয়ের ১৯৯৮ সনে এম কম পরীক্ষায় সারা বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণীতে নবম এবং চট্টগ্রাম সরকারী সিটি কলেজ ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণী পাওয়া প্রথম ছাত্র। আর আমি চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বিবিএ এমবিএ এমফিল ডিগ্রী লাভ করে এখন ডক্টরেট ডিগ্রী নেওয়ার জন্য গবেষণায় সাধনায় আছি। এই যেন প্রজ্ঞা প্রজ্জলিত এক আলোক রশ্মিপাত আমাদের ভ্রাতৃদ্বয়ের জ্ঞান সৃজনের এই শিক্ষাপথে। আমার দাদী শুধু বলতেন, দাদার কথা মন দিয়ে শোন, আমল কর। হলফ করে বলতে পারি, আমরা কৃতার্থ শ্রদ্ধাষ্পদ মহান মনীষী আামদের দাদা হযরত মৌলভী হাফিজুর রহমান বিএবিটির কাছে। সম্পর্কে দূর নিকটতম ব্যবচ্ছেদে যাই নি কখনো, সারাজীবন মহান শ্রদ্ধা অবনতে দাদা হিসেবে ত াঁকে জেনেছি। তখন ছোট মানুষ ছোট জ্ঞান ভা-ারে এতটুকু বুঝতাম, উনি গ্রামময় এক সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব।
একবার এক মসজিদের ইমাম সাহেব (তথ্যসূত্র: রাউজানের দলইনগর নিবাসী মরহুম মওলানা মাহবুবুর রহমান) নামাজ পড়ানোর সময় হলে উনি নামাজ পড়াতে অনীহা জানালেন। কেননা, উনি পথিমধ্যে দাদাকে দেখেছেন। দাদাজান মসজিদে প্রবেশ করলে ইমাম সাহেব দাদাকে জুমার খুতবা পাঠ করতে অনুরোধ জানান। উনি সবিনয় তা ফিরিয়ে দিলে সবার অনুরোধে যখন বয়ান দিলেন আহা! সব আরবী ফার্সী মসনবী শরীফের নানান শব্দের এক জ্ঞানগর্ব আলোচনা তা কত হৃদয় গ্রাহ্য হয় তা খুতবা নামাজ শেষে সকল মুসল্লীর নাকি আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল এবং বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে তাঁর কথাগুলো রেফারেন্স যোগ্য হত। উচ্চ ইংরেজি শিক্ষিত হয়েও দাদা মৌলভী হাফিজুর রহমান বিএবিটি আরবী, ফার্সী ও উর্দুতে এক বুৎপত্তি কিভাবে অর্জন করেছিলেন তা সত্যিই বিস্ময়কর! স্বগ্রাম মোহাম্মদপুরের ছায়াবীথি অনন্য এক জনপদে জন্মেছিলেন তিনি। এটা উত্তর জনপদে লোকমুখে সমাদৃত হযরত আব্দুল জলীল শাহ (রা.), মৌলভী হাফিজুর রহমান বিএবিটি, ফৌজুল আজীজ মিয়া (তিন মিয়ার মুহাম্মদপুর) জ্ঞান সঞ্চারী পুরোধা পৌরুষের জ্ঞান গৌরবের অবাধ বিচরণে নানান যশমেলায় তাঁরা তাঁদের ঐশি^ক গুণের এতো বেশী স্বাক্ষর রেখেছেন যা তাদের কীর্তি নামার অসীমতায় আামদের অনন্য সুন্দর গ্রাম “মোহাম্মদপুর” কে নাম যশ খ্যাতির সুমহান আর সুউচ্চতার নিয়ে গেছেন যা আজকের সভ্যতায় রেকর্ডপত্রে সম্মানিত এক গৌরব মানদন্ড। মাঝে মাঝে মনে হয়, বিধাতা দু হাতে সমতলে এইসব মনীষীকে এলাকা বেঁধে দিয়েছিলেন পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠীকে আলোকিত করার মহান মানসে। উত্তর চট্টগ্রাম জনপদের আধ্যাত্মিক সাধনার শুদ্ধ মানব হযরত ছৈয়দ গোলামুর রহমান (রহ.) বাবা ভা-ারী কিশোর হাফিজ মিয়া দাদার কপালে নিজ হুক্কার নল (পাইপ) স্পর্শ করিয়ে মারেফাতের দীক্ষা সাধন করান আর বিশ^ অলি হযরত জিয়াউল হক (ক.) হাফিজ মিয়া দাদার সম্মানকে আরো মানে মানোয়ারায় সমুন্নত রাখতে তাঁকে অগ্রসম্মান দিয়ে পাশাপাশি হেঁটে পুরো নানুপুরের মাঠ-ঘাট-সমতলে জানান দিয়েছেন যে, এই সব মানুষ মানে গুণে সদা অগ্রগণ্য তা বুঝতে যাতে কারো কোন সমস্যা না হয়। এমন মহান সাধক জ্ঞান সঞ্চারী, আশৈশব মেধাবী, তীক্ষ্ম উপস্থিত বুদ্ধি, বৈকারনিক বিরচনে আর বহু ভাষার জ্ঞাত অতিভাষায় এতো বেশী সমৃদ্ধ ছিলেন যে স্বগ্রাম থেকে মহকুমা, জেলা আর অবিভক্ত ভারতবর্ষে সকল একাডেমিক পরীক্ষায় অনন্য কৃতিত্ববানদের একজন, যা আমার লিখনের পরিধি এতো বেশী সাড়ম্বর নয় যে যথাযথ মানে আর ুগণে বিবৃত করতে পারবো। এক কথায় যুগশ্রেষ্ঠ, সেই মেধার উপস্থিতি বর্তমানে বিরলই বলা চলে। তিনি চল্লিশের দশকে স্বহস্তে লিখেছেন অইঈ ড়ভ ঊহমষরংয ঞৎধহংষধঃরড়হ ্ ঈড়সঢ়ড়ংরঃরড়হ, ঝবহরড়ৎ ঊংংধুং ্ খবঃঃবৎং নামক দুটো ইংরেজী ব্যাকরণ গ্রন্থ যা পরবর্তীতে অনেক বোদ্ধা লেখকের প্রধান রেফারেন্স হিসেবে গণ্য হয়। কেননা সে জমানায় অবিভক্ত ভারতবর্ষে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ডিস্টিংশনে বি এ ডিগ্রী লাভ করা ছাত্রের জ্ঞান গভীরতা কতটুকু হবে এবং সেই সব মুদ্রিত গ্রন্থ সম্ভারের যে জ্ঞান জৌলুশ তা থেকে অনুমেয় যে ওনার ভাষান্তরের উপর কি পরিমাণ অগাধ পা-িত্য ছিলো। অনেকে আমরা হিসেবে আনতে পারি না সেকালে এতো বিরল মেধাবী শিক্ষাধারক হয়েও কোনো অন্য পেশায় না গিয়ে, বিত্ত বৈভবের মায়ায় না ছুটে কেনো শিক্ষাসেবক হলেন, জীবন যৌবনের সবটুকু প্রহর শ্রমসাধনে তিনি শিক্ষার আলো জ¦ালিয়েছেন উত্তর চট্টলার নানান শিক্ষালয়ে, হয়তো এটাই তাঁর জীবনের পরম লক্ষ্য ছিল।
মৌলভী হাফিজুর রহমান বি এ বিটি যুগশ্রেষ্ঠ কামিল আউলিয়া কেরামের সাহচর্য্যে বেশ সমৃদ্ধ হয়েছিলেন মারেফাতের অনন্য দীক্ষায়। আর এটার এক উৎকৃষ্ট প্রমাণ, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে সে এক অবর্ণনীয় যুদ্ধ দিনের বিভীষিকায় যখন ঘরবাড়ী থেকে পাক হানাদার আর তাদের দোসরদের নিপীড়ন নির্যাতনে ভারতগামী হাজারো শরণার্থী শত মাইল পথ পায়ে হেঁটে নানুপুর স্কুল প্রান্তে যখন আসতো একরাত বা দু রাত আশ্রয়ের জন্য, পরম মমতায় জাতি ধর্ম নির্বিশেষে তিনি আশ্রয় খাদ্য নিজ তদারকিতে সম্পাদন করেছিলেন। একজন শিক্ষক হয়ে তাঁর নিতান্ত কষ্ট সত্ত্বেও হাজারো মানুষকে তিনি যে সেবা দিয়েছিলেন সরাসরি উপকৃত সেই পরিবারগুলো হাজারো স্মৃতি ধারা বর্ণনায় বিশদভাবে তা এখনো স্মরণ করেন।
১৯৭১ সালের ১ জুন। হঠাৎ করে দাদা মৌলভী হাফিজুর রহমান বিএবিটি এক অগ্নিশর্মা রূপ নিয়ে সব শরণার্থীকে জোরপূর্বক ভুজপুরের রাস্তা ধরে রামগড় চলে যাওয়ার জন্য এবং স্কুল হল, মাঠ খালি করার নির্দেশ দিলেন এবং নিজ তদারকিতে স্কুল ঘর, মাঠ পরিষ্কার করেন যা দেখে বোঝার কোন উপায় ছিলো না যে, এখানে কিছু প্রহর আগেও হাজার হাজার শরণার্থী ছিলো। ২ জুন ১৯৭১ ভোরের সূর্য উঁকি দেয়ার অনেক আগেই ক্রোধ, হিংসা আর বাঙালি হত্যার অভিলাসে ট্রাকে ট্রাকে পাক হায়েনারা এসে নানুপুরের চতুর্দিক ঘিরে ফেলে। খান সেনারা হতবাক! প্রাপ্ত তথ্য আর বাস্তবঅবস্থার সাথে কোন মিল নেই। দাদা হাফিজ মিয়ার অলৌকিক ক্যারিশমায় সেদিন নানুপুর স্কুল মাঠ আরেকটি গণকবর হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যায়। আচ্ছা, কোন আধ্যাত্মিক ক্ষমতাবলে তা সম্ভব হলো, তার উত্তর এখনও খুঁজে পাওয়া যায় নি। একালের মতো মোবাইল নেটওয়ার্ক তো সেদিন ছিল না, যুদ্ধ দিনের ভয়াবহতায় এমন মানুষতো ছিল না পাকিদের নীলনকশার আগাম তথ্য দিবে। এমন অলৌকিকতা তাঁরাই দেখাতে পারেন যাঁরা আউলিয়া কামেলদের দীক্ষা নেন, এমন একটি অবাক করা ঘটনায় এতটুকু নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, উনি এলমে মারেফাতের উঁচু স্তরে পৌছে ছিলেন যার মাধ্যমে তা তিনি করতে পেরেছেন, আল্লাহ নিশ্চিতভাবে তা জানেন। নানুপুর গ্রাম, বাজার আর হাজারো শরণার্থী যাঁরা সেদিন মৌলভী হাফিজুর রহমান বিএবিটি’র অলৌকিক ঘটনার স্বাক্ষী ছিলেন এই ব্যাপারে জানাল আমাদের স্বাধীনতার মাহাকাব্যিক ইতিহাসে আরেকটি বিস্ময়কর অধ্যায় সংযোজন হত।
১৯৯৮ সালের ৯ এপ্রিল বাদে জোহর রাউজান উপজেলার মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এমন মহান কীর্তিমানের স্মরণাতীত কালের বৃহত্তম জানাজায় মরহুম মৌলভী হাফিজুর রহমানের বিএবিটির পুত্র লেখক ও প্রাবন্ধিক মুসলেহ উদ্দিন মুহম্মদ বদরুল আবেগঘন কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমার বাবা তেমন কোন সম্পদ রেখে যান নি। তবে তিনি ছিলেন আমরা সন্তানদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।’
আমি বলব, এই সম্পদ শুধু একটি পরিবারের ছিল না। এই সম্পদ ছিল সমগ্র দেশ ও জাতির। আজ ৮ এপ্রিল আমার পরম শ্রদ্ধেয় দাদা মরহুম মৌলভী হাফিজুর রহমান বিএবিটি’র ২২তম মৃত্যুবার্ষিকীর এ দিনে তাঁর প্রতি জানাই বিন¤্র শ্রদ্ধা ও কামনা করি বিদেহী আত্মার মাগফেরাত। আমিন।

হুমায়ুন করিম প্রভাষক, নোয়াপাড়া বিশ^বিদ্যালয় কলেজ, রাউজান।

The Post Viewed By: 90 People

সম্পর্কিত পোস্ট